বন্ড ভেসপারকে বোঝাতে লাগল, এটা হোটেল। এখানে নানা ধরনের লোক আসতে পারে। কজনের গতিবিধির ওপর তুমি নজর দেবে। মনে হল না কথাগুলো ভেসপারের কানে গেছে। রক্তশূন্য মুখে দুহাতে টেবিলের ধারটা চেপে বসে আছে।
আগন্তুক বুঝতে পেরেছে যে কেউ তাকে লক্ষ্য করছে। নির্বিকারভাবে সে তার খাওয়া শেষ করে বিল মিটিয়ে বিদায় নিল গাড়ির শব্দ শুনল বন্ড-ক্রমে রয়্যালের দিকে চলে গেল শব্দটা।
বন্ড প্রোপাইটারের কাছে আগন্তুকের ব্যাপারে জানতে চাইলে সে লোকটির ব্যাপারে কোন রেখাপাত করতে পারল না। বন্ডের মত লোকটি তার কাছেও সম্পূর্ণ অচেনা।
.
শুভরাত্রি
পরের দুটো দিন ঐ একইভাবে কাটল। চতুর্থ দিন ভোরবেলা ভেসপার রয়্যালে চলে গেল, আবার ফিরে এল। ওকে নিতে একটা ট্যাক্সি এসেছিল।
সে দিন রাতে ভেসপার চেষ্টা করল ফুর্তির ভাব মুখে ফোঁটাতে। প্রচুর পরিমাণে মদ্যপান করল সে। খাবার পর বন্ডকে নিজের ঘরে নিয়ে এল–প্রেমনিবেদনের উদ্দেশ্যে। দৈহিকভাবে সাড়া পেলেও ভেসপারের আকুল কান্নার কোন অর্থই খুঁজে পেল না সে।
রবিবার দিন সেই কালো তাঞ্জি পরা লোকটার আগমণ ঘটল। লোকটার সম্বন্ধে বন্ড ভেসপারকে বলেছিল কিন্তু সে ফিরে আসছে এই ব্যাপারটা শুধু লুকিয়েছিল। অনর্থক দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে ভেসপারকে সে অসুস্থ করতে চায়নি।
প্যারিসে ম্যাথিসকে ফোন করে সে ঐ কালো গাড়িটা সম্বন্ধে খোঁজ খবর নিয়েছে। দু-সপ্তাহ আগে এই গাড়িটা ভাড়া নেওয়া হয় এক নামী কোম্পানি থেকে। লোকটা সুইস। নাম অ্যাডলফ গেটলার।
সুইস পুলিশের কাছে সন্ধান নিয়ে জানা যায়, ঐ নামে ব্যাংকে একটা অ্যাকাউন্ট আছে। তবে সেটা বড় একটা ব্যবহার হয় না। তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকলে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করা যেত কিন্তু সে রকম কিছু ছিল না। বলেই আর কিছু জানা যায়নি। এবার লোকটাকে দেখা মাত্র সে সোজা খাওয়া ছেড়ে উঠে পড়ে। বন্ড খাওয়া শেষ। হতেই ভেসপারের ঘরে এসে উপস্থিত হয়। বন্ড তাকে জোর করে খাটে বসাল। কাঠের পুতুলের মত ঠাণ্ডা মুখে বসে। রইল সে। বন্ড ওর পাশেই বসল। ভেসপারের ঠাণ্ডা হাত দুটো নিজের হাতে তুলে নিল। দেখ ভেসপার, এইভাবে কতদিন চলতে পারে? তুমি নিজেও কষ্ট পাচ্ছ, আমাকেও কষ্ট দিচ্ছ। তার চেয়ে আমাদের ছাড়া ছাড়ি হওয়াই ভাল। তবে তুমি যদি চাও এখনও সময় থাকতে থাকতে আমাকে সমস্ত কথা খুলে বল। যেন প্রথমদিন সকালে আমি তোমার কাছে এসেছিলাম বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। যা হয়েছে সব অতীত মনে করে ভুলে যাও। ভেসপারের চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। বন্ডের বুকে মাথা রেখে সে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগল। শান্ত গলায় সে বলল, আমি একটু ভাববার জন্য সময় চাই। আমি একটু ভেবে দেখি আমাদের পক্ষে কোন্টা ভাল। তবে তুমি বিশ্বাস কর আমি এমন বিপদে, বলতে বলতেই সে ভয়ার্ত শিশুর মত বন্ডকে আঁকড়ে ধরে রইল। খুব উত্তেজিত গলায় সে বলে উঠল কাল সকালের মধ্যে বন্ডকে সে সব কথা খুলে বলবে। এমনভাবে তার মুখের দিকে চেয়ে রইল, মনে হল এই প্রথম তাকে দেখছে সে। তার নীল চোখে টলটল করছে পানি। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বন্ড নিজের ঘরে ফিরে এল।
.
রক্তাক্ত হৃদয়
একটা চিঠি হাতে সকালবেলায় প্রোপাইটার বন্ডের ঘরে এসে দাঁড়াল। তার হাবভাব দেখে এক অজানা আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে ওঠে। সে ম্যাডাম বলে থেমে যায়। সে বাথরুমের দরজার কাছে এসে দেখে দরজা বন্ধ। নিজের ঘরে ফিরে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে বারান্দায়।
খোলা দরজা। সারা ঘরে রোদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। চাদরের উপরে কেবল তার কালো চুল, চাদরের নিচে শয়ান দেহ। বন্ড চাদরটা সরিয়ে দিল। অনেকদিন পরে ভেসপার আজ ঘুমুছে। যেমন দেখতে তেমনি আছে, শুধু নিঃস্পন্দ দেহ আর নাড়ি স্তব্ধ।
প্রোপাইটার এসে বন্ডের কাঁধে হাত রাখুল। নিজেকে এক ঝাঁকুনি দিয়ে বন্ড উঠে দাঁড়াল। তার হাত থেকে চিঠিটা নিল। বন্ড ঘরের দিকে এগিয়ে চলল, খামটা উল্টেপাল্টে দেখল সে, কয়েক ঘণ্টা আগেই জিভ দিয়ে ভিজিয়ে এই খাম বন্ধ করা হয়েছে।
চিঠিটা পড়তে শুরু করল—
বন্ড আমি তোমায় সমস্ত মন প্রাণ দিয়ে ভালবেসেছি। তুমি যখন চিঠিটা পড়বে তখনও তোমার মনে আমার স্থান আছে কিন্তু পড়ার শেষে তার কোন চিহ্নই থাকবে না। আমাদের ভালবাসা থাকাকালীন তোমার থেকে আমি বিদায় নিচ্ছি।
আমি এম ডাবলিউ ডির এজেন্ট। ডবল এজেন্ট, রাশিয়ানদের হয়ে আমি কাজ করছি। যুদ্ধের এক বছর পর থেকে আমি ওদের সঙ্গে যুক্ত। আর এ এফ এর একজন পোল্যান্ড বাসীর সঙ্গে আমার মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তার দুটো ডি.এম. ও ছিল। যুদ্ধের পর M তাকে ট্রেনিং দিয়ে আবার পোল্যান্ডে ফেরত পাঠান। ওরা ধরে ফেলে। যন্ত্রণা দিয়ে ওরা ওর সম্বন্ধে এবং আমার সম্বন্ধে নানারকম খবর সংগ্রহ করে। তারা শর্ত রাখল, আমি তাদের হয়ে কাজ করলে ওরা আমার প্রেমিককে নবজীবন দান করবে। সে এসবের কিছুই জানত না। শুধু চিঠি লেখার অনুমতি মিলেছিল। চিঠি আসত প্রত্যেক মাসের পনের তারিখে। আমার ফেরার সব পথ বন্ধ। পনের তারিখের মধ্যে যদি চিঠি না পৌঁছত তবে বুঝে নিতে হবে তার জন্য তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। তাই আমিও কাজ ছাড়তে পারলাম না। তবে আমি ওদের কম খবর দিতাম। তুমি এলে। আমি ওদের বলতাম, রয়্যালে তোমার কি ভূমিকা। তবে তুমি আসার আগেই ওরা তোমার সম্বন্ধে সব জানতে পারে। শিফের জন্যই তোমার আগমন কিন্তু কাজটা কি তা বলিনি।
