গাড়িতে যেতে যেতে তার কর্মজীবনের ছোটখাটো ঘটনার কথা বলতে লাগল। কিন্তু সে দেখল সে একাই কথা বলে যাচ্ছে, ভেসপার কেমন যেন অন্যমনস্ক। বারে বারে গাড়ির আয়নার উঁকি দিচ্ছে। বন্ড বুঝতে পারল না আয়নায় কি দেখছে। কারণ পেছনে তাকিয়ে তার কিছুই চোখে পড়েনি।
মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। আতঙ্কে সে চিৎকার করে উঠল কালো গাড়ি। প্রায় চারশগজ দূরে একটা গাড়ি আসছে। বন্ড ভেসপারের কান্ড দেখে খুব জোরে হেসে ফেলল। ভেসপার রাস্তাটা আমাদের একার নয়। আমাদের ফলো করে কার কি লাভ? একজন নির্দোষ লোককে দেখে তুমি অযথা ভয় পাচ্ছ। তোমার মত মেয়ের এটা শোভা পায় না।
ভেসপারের এই ভয়ার্ত ভাব দেখে বন্ডের সত্যিই খারাপ লাগছিল। সে এখনও মারাত্মক অভিজ্ঞতার তার মন থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারেনি। ভেসপারকে একটু শান্ত করতে বন্ড ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল বড় রাস্তার ধার করে গাড়ি দাঁড় করাতে।
গাড়ির আয়নার তারা চোখ রেখে বসে রইল। নানারকম মেঠো শব্দ অতিক্রম করে গোঁ গোঁ শব্দ ক্রমশ এগিয়ে আসতে থাকল। ভেসপার বন্ডের হাত চেপে ধরল। গাড়িটা যে বেগে আসছিল, সেই বেগেই পাশ কাটিয়ে চলে গেল। তাদের পাশ দিয়ে যাবার সময় লোকটা এপাশে মুখ ফিরিয়ে ছিল, কিন্তু লোকটির দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল একটি সাইনবোর্ডে। ওরা যেখানে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে ঝোঁপের গায়ে জ্বলজ্বলে অক্ষরে একটি রেস্টুরেন্টের নাম লেখা।
শব্দ মিলিয়ে গেল। ভেসপারের মুখ তখনও বিবর্ণ। সে বলে উঠল ওরা জেনে গেল আমাদের বাস। বন্ড অধৈর্য হয়ে তাকে থামাবার চেষ্টা করল। তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনতে চাইল।
অবশেষে তারা এসে গেল। বালিয়াড়ি পেরিয়ে পাইন গাছের মধ্যে সাধাসিধে ছোট্ট একটা হোটেল। ছোট দোতলা বাড়ি, জানলায় লাল হঁটের রঙের ঝালরের মত। উপসাগরের নীল পানি ঢুকে এসেছে, তটে সোনালি বালি। বন্ডের খুব পছন্দ হয় জায়গাটা। এখানে পৃথিবীর কোন কোলাহল এসে পৌঁছবে না। সকাল সন্ধ্যে পর্যন্ত নিরুদ্বিগ্ন শান্ত জীবন। এই জায়গাটা আরো সুন্দর হয়ে উঠেছে ভেসপারের সান্নিধ্য পেয়ে।
গাড়ি থামতেই প্রোপাইটার ও তার স্ত্রী বেরিয়ে এলেন। এদের দেখে বন্ডের মনে হল এরা নিঃসন্তান ও অতিথিদের অপত্যস্নেহে সেবা করে। অর্থ উপার্জনের জন্য এদের যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়। শীতকালে এই জনহীন হোটেলে সমুদ্রের গর্জন আর পাইন গাছের মর্মর শব্দই তখন একমাত্র সঙ্গী হয়ে ওঠে দুজনার।
ভেসপারের ঘরটা ডবল রুমের। পাশের ঘরটা বন্ডের। এই ঘর দুটো বাড়ির একেবারে কোণের ঘর। ঘরে জানলা দিয়ে সমুদ্র দেখা যায়। ঘর দুটির মাঝখানে রয়েছে ঝকঝকে পরিষ্কার বাথরুম।
ইংরেজরা এখানে এই সময় ছুটি কাটাতে আসেন। কিন্তু যারা আসে তারা শনিবার রয়্যালে কাটায়, তারপর সর্বস্ব খুইয়ে বাড়ি ফিরে যায়। আগেকার মত কি আর সেই দিন আছে। সবসময়ই মনে হয় একালের চেয়ে সেকালই ভাল ছিল।
বন্ড তার কথার সম্পূর্ণরূপে সমর্থন জানাল।
.
বাসনার স্রোত
ভেসপারের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল প্রোপাইটার চলে যেতেই ভেসপারকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে ঢোকে বন্ড। জ্বলজ্বল করছে দুটি চোখ। বন্ডের বাহুতে তার হাত। আর একটু কাছে এগিয়ে আসতেই ভেসপারকে বুকে টেনে নেয়। আবেগের স্রোতে তারা ভেসে চলল।
ভেসপারের মুখে কোন কথা নেই। আবেগে তার কথা বলার শক্তি একেবারে অন্তর্হিত। পরস্পর পরস্পরের দিকে চেয়ে রইল। তখনও তাদের শিরায় শিরায় প্রবাহিত হয়ে চলেছে বাসনার-কামনার এক স্রোত।
কিছুক্ষণ পরে বন্ডের হাত ছাড়িয়ে সে জানলার কাছে এসে দাঁড়াল। বন্ডও তার পাশে এসে দাঁড়াল ও ওর হাতের ওপর চাপ দিল কিন্তু ততক্ষণে দৃষ্টি তার জানালার বাইরে চলে গেছে। ভেসপার বন্ডের সঙ্গে এল না। তাকে পোষাক ছাড়তে হবে। অগত্যা বন্ডকে একাই যেতে হবে। দরজার কাছ পর্যন্ত গিয়ে বন্ডের মনে হল ভেসপার কাঁদছে।
নিজের ঘরে গিয়ে বিছানার ওপর বসল সে। প্রবল বাসনার আবেগে আজ তার শরীর ও মন দুই অবসন্ন। কিন্তু সমুদ্রে গোসলের লোভ সামলান দায়।
চামড়ার চটি পায়ে সে হেঁটে চলল বিচের দিকে। বাড়ির সমানের দিক দিয়ে যাবার সময় ভেসপারের কথা খুব মনে হচ্ছিল। পানির ধার দিয়ে হাঁটতে লাগল। পায়ের তলায় আগুন রঙের বালি। হোটেল থেকে অনেক পথ সে চলে এসেছে। এখান থেকে বাড়িটা চোখে পড়ে না। পানির মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এই স্নিগ্ধ মনোরম অনুভূতির কোন বিকল্প নেই। খোলা আকাশের তলায় শুয়ে থাকতে থাকতে ভেসপারের মুখটা মনের পাতায় ভেসে উঠল। ভেসপারের প্রতি যে তার কি মনোভাব সে আজও বুঝে উঠতে পারল না। নিজের কাজে অস্বীকার করার কিছু নেই, সে তার নিজের শরীরের পটুত্ব সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হতে চাইছিল। কয়েকদিন একত্রে বাস করা, তারপরে লন্ডনে তার সঙ্গে মুখোমুখি হওয়া। এরপর বিচ্ছেদ তো আছেই।
কিন্তু কেন জানি না গত সপ্তাহে ভেসপারের সঙ্গে তার সম্পর্ক আশ্চর্য রকম বদলে গেছে। তার সঙ্গে ব্যবহার বন্ধুর মত হলেও তার মধ্যে এমন কোন রহস্য আছে যাতে বন্ডের আকর্ষণ ক্রমেই তীব্রতর হয়ে উঠছে। কিন্তু ভেসপারের মনের নাগালে সে আজও পৌঁছতে পারেনি। তারা যতদিন একসঙ্গে থাকুক না কেন, বন্ড তার মনের গোপন দ্বার কখনই খুলবে না।
