.
ভেসপার
অষ্টমদিনে বন্ড ভেসপারের মুখোমুখি বসল। কাল নিদ্রা দেবী তার প্রতি একটু প্রসন্ন ছিলেন। আজ নিজেকে অনেক বেশি তরতাজা মনে হচ্ছে।
ভেসপার এর আগে নার্সিংহোমে এসেছে। তাকে ফুল পাঠিয়েছে প্রতিদিন। বন্ড সেই ফুল পাঠিয়ে দিয়েছে ম্যাথিসের মাধ্যমে অন্য এক রোগীর হাতে। এরপর ফুল আসা বন্ধ হয়েছে। সে ভেসপারকে দুঃখ দিতে চায়নি। এই সব মেয়েলি জিনিস তার চরিত্রে নেই। ভেষপারকে এই সব কথাই বুঝিয়ে বলতে হবে। এম-এর কাছে একটা রিপোর্ট পাঠাবে অবশ্য ভেসপারের বোকামির কথা উহ্য রেখে। শুধু শুধু একজনের অন্ন কেড়ে কি লাভ পাবে সে।
হার্মিটেজের বারে দেখা হওয়ার পর থেকেই তার প্রতি বন্ড এক শারীরিক আকর্ষণ অনুভব করে। তাই সে দেখা হবে ভেবেই মনে মনে বিচলিত হচ্ছিল। সে যেমনভাবে চায় তেমনভাবে যদি স্নায়ুর কাছ থেকে না পায়? চিত্তচাঞ্চল্য যদি হিম রূপে আবির্ভূত হয়। কারণ আঘাতের ধাক্কাটা সে কাটিয়ে উঠতে পুরোপুরি পেরেছে কিনা–এই আসল পরীক্ষা এখনও বাকি। কিন্তু লন্ডন থেকে যে কোন দিন এখানে কোন লোকের আবির্ভাব ঘটতে পারে।
ভেসপারকে আজ বড় বেশি রকম সুন্দর দেখাচ্ছে। গত তিক্ত অভিজ্ঞতার কোন ছাপ তার শরীরে দাগ বসাতে পারেনি। চমৎকার বাদামী রঙে তাকে আরো উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।
বন্ড, তোমার এই অবস্থার জন্য আমিই দায়ী। নিজেকে অপরাধী মনে হয়। তুমি যতদিন এখানে আছ আমি রোজ সমুদ্রের কাছে একটা জায়গায় বেড়াতে যেতাম। খাবার আর বই সঙ্গেই নিতাম। ফিরতে ফিরতে বিকেল। বালিয়াড়ির উপর দিয়ে রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলেই সেই ভিলা। এই কথা উচ্চারণ করতেই সে থতমত খেয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গেই বন্ডের চোখে মুখে ফুটে ওঠে এক অজানা আশঙ্কা। সঙ্গে সঙ্গে সে প্রসঙ্গ বদলে ফেলে। বন্ডের মনে ফিরিয়ে আনতে চায় তার হারিয়ে যাওয়া মনের জোর। তোমাকে একদিন সমুদ্রের ঔ সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাব। ডাক্তার বলেছেন, সমুদ্রের চান তোমার পক্ষে ভাল।
ক্ষোভের সঙ্গে বন্ড বলে, আমার সমস্ত শরীর এখনও ক্ষত বিক্ষত। গোসল করা আমার আর হয়েছে। তুমি মজা করে গোসল কর আর সমস্ত দিনের আনন্দ একাই উপভোগ কর। বন্ডের ক্ষুব্ধ গলা শুনে ভেসপার একেবারে ভেঙে পড়ে। সে দুহাতে মুখ ঢাকে। কান্না ভেজা গলায় সে বন্ডের কাছে তার এই কর্মের জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে থাকে।
ব্যান্ডেজ বাধা নিজের হাত। হাতটা সে ভেসপার দিকে এগিয়ে দেয়। দেখ ভেসপার, আমি সেরে উঠলেই তোমার সঙ্গে তোমার ঐ আবিষ্কৃত জায়গায় যাব। চোখের পানি মুছে নিল ভেসপার। স্নেহভরে বন্ড তাকাল। সব শক্ত লোকদের এই এক দুর্বলতা, সহজেই এদের মন ভিজে যায়। খানিকক্ষণ পরে বন্ড তার কাছ থেকে সে দিনের ঘট জানতে চায়। ভেসপার মাথা নীচু করেই তার কাহিনী শুরু করে। হলে এসে কোথাও ম্যাথিসের উপস্থিতি চোখে পড়ল না। বাইরে বেড়িয়ে এলাম। দারোয়ান বলল যে লোকটা চিঠি এনেছে সে গাড়ির মধ্যে বসে। গাড়িটার দিকে এগিয়ে চললাম। ম্যাথিসের সঙ্গে সবে তখন আমার নতুন পরিচয়। ওর ধরন ধারনে আমি অভ্যস্ত নাই। হঠাৎ গাড়ির পেছন থেকে দুটো লোক আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। জায়গাটা অন্ধকার ছিল বলে কিছুই চোখে পড়েনি। কিছু বোঝার আগেই ওরা আমারই স্কার্টটা দিয়ে মাথার ওপর জড়িয়ে দেয়।
দুজনে মিলে আমাকে গাড়ির পেছনের সিটে তুলল। আমি বাধা দেবার চেষ্টা করেছি। আমি কোনমতে একটা হাত খালি করে আমার ব্যাগটা বাইরে ফেলে দিলাম। ভাবলাম তাতে যদি কোন কাজ হয়। বন্ড মনে মনে ভাবছিল, ভেসপার ব্যাগটা না ফেললেও, লোকদুটো ঠিকই ফেলত। কারণ তাদের লক্ষ্য ছিল বন্ড। ভেসপারকে তারা মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগায়। ভেসপার বলতে থাকে, ওরা আমার হাত পা বেঁধে চেয়ারে ফেলে রেখে নিজেরা মদের নেশায়। চুর হয়েছিল। তারপর আমি ঘুমিয়ে পড়ি। স্মার্শের লোকটা যখন এসেছিল তখন আমার মুখটা ফেরান ছিল। তাই আমি তাকে দেখতে পাইনি। নানারকম শব্দের আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙে যায়। হাল্কা পায়ের শব্দ, তারপর দরজা বন্ধ হয়ে গেল। বেশ কয়েক ঘণ্টা পর ম্যাথিস আসে, সঙ্গে পুলিশ।
বন্ড ভেসপারকে আশ্বাস দিয়ে বলে, সৃষ্টিকর্তার অনেক কৃপা যে ওরা তোমার কোন ক্ষতি করেনি। আমার ক্ষেত্রে অত্যাচার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। একবার তো হাওয়ার অভাবে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। জ্ঞান ফিরতে দেখলাম, ওরা মুখের সামনে ছোট একটা গর্ত করেছে। আমাকে শেষ করেই ওরা তোমার গায়ে হাত দিল। তোমার কোন দোষ নেই। ঐরকম একটা চিঠি পেলে, তুমি কেন, যে কেউ এই ফাঁদে পা দিত।
পানিতে ভরা চোখ কৃতজ্ঞতায় ভরপুর। তুমি আমাকে মাপ করেছ এটাই আমার কাছে সব থেকে বড় পাওয়া। আমি এর বদলে প্রতিদান দেব। তোমার কাছে আমি সবদিক থেকে ঋণী। ভেসপার যাবার আগে গভীরভাবে বন্ডের দিকে তাকাল। বন্ডের চোখের পলক পড়ছে না। আস্তে আস্তে ভেসপার চলে গেল। বন্ড কান পেতে রইল, যতক্ষণ ভেসপারের পদধ্বনি শোনা যায়।
.
কালোগাড়ি
বন্ড ক্রমেই সুস্থ হয়ে উঠতে লাগল। প্রথমে তাকে দাঁড়ান, তারপরে বসার অনুমতি। এখন তাকে হেঁটে চলার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি চালাবার অনুমতি দেওয়া হল।
নার্সিংহোমের এই একঘেয়ে জীবনে ভেসপার উপস্থিত হত একঝলক বসন্তের হাওয়া সঙ্গে নিয়ে। খুব সহজে এরা নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করত। তারা কথা বলত বন্ধুর মত, আবেগের আতিশয্য থাকলেও কখনো কেউ বাইরে তা প্রকাশ করত না। দুজনেই মনে রাখত, ভেসপার তার কথা রাখবে। নিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে মুক্তি পেয়ে আজ সে এতদিনবাদে মুক্তো বাতাস পেতে ছুটে চলেছে সমুদ্রের দিকে। তারা কোথায় যাচ্ছে ভেসপার তার কাছে গোপন রেখেছে। রয়্যালে নয়, শহর থেকে দূরে কোথায়ও সে থাকতে চেয়েছে। নিজেকে তার হাতে নিশ্চিন্তে সমর্পণ করে দিয়েছে বন্ড। সে যেখানেই যাবে বন্ডও সেখানেই যাবে।
