বন্ড বলল, লোকটা বার্লিনে এসেছিল। সেখান থেকে ইউরোপে চলে গেছে। কারণ ইউরোপ যাবার অনেক পথই খোলা। এতদিনে আমার সম্বন্ধে ওদের কাছে একটা ফাইল তৈরি হয়ে গেছে। আমার হাতে ওরা একটা অক্ষর লিখে ওদের বাহাদুরি প্রমাণ করতে চেয়েছে।
বন্ডের কথায় ম্যাথিস একটু অবাকই হয়ে যায়। কারণ, সে জানতো কাটাটা উল্টে এম-এর মত। ডাক্তারের ভাষায় যার কোন মূল্যই দেওয়া যায় না।
বন্ড বলল, উল্টে এম এই অক্ষরটি রাশিয়ান বর্ণমালার একটি অক্ষর। স্মার্শ কথাটির আদ্যাক্ষর। এই কথার পুরো অর্থ হল বিশ্বাসঘাতকদের মৃত্যুবরণ। আমাকে ওরা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করে ছিল। এতে অবশ্য আমার কাছে কিছু আসে যায় না। কারণ আমি স্থির করেছি, আর নয় অনেক হয়েছে আমি চাকরি ছেড়ে দেব।
ম্যাথিস বন্ডের কথা শুনে একেবারে থ হয়ে যায়। বন্ড বলছে কি? যাকে নিয়ে এত হৈ চৈ-তার মুখে কিনা এই কথা। সত্যি আশ্চর্য এই জগত সংসার। তোমার হঠাৎ এ ব্যাপারে মনে এত অনীহা জন্ম নিল কেন?
দেখো ম্যাথিস শিফ যখন আমাকে ভীষণ যন্ত্রণা দিচ্ছিল, তখন আমার মনে হয়েছিল বেঁচে থাকার সুখই আলাদা। কারণ, মরতে আমি চাই না। শিফ আমার উদ্দেশ্যে বলেছিল আমার রেড ইন্ডিয়ান রেড ইন্ডিয়ান খেলার কি দরকার, খুব ভুল বলেনি। বয়স যখন আমরা তরুণ থাকি তখন কোনটা মন্দ–কোনটা ভাল সহজেই অনুমান করা যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপারটা ক্রমেই জটিল রূপ নেয়। আমি দুটো দুষ্ট লোককে প্রাণে মেরেছি। প্রথমটা নিউ ইয়র্কের। এক জাপানী ভদ্রলোক আমাদের সংকেতগুলো পড়ে ফেলেছিল। আমি ঠিক পাশের উঁচু বাড়িটার চল্লিশ তলায় একটা ঘর নিলাম। সেখানে থেকে ওর কাজের প্রতি দৃষ্টি রাখতে সুবিধে হচ্ছিল। দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে লাগলাম। প্ল্যান করে, জানলার কাঁচে একটা ফুটো করতে গেলাম, তবে গুলিটা ছিটকে গেল। জাপানিটা হাঁ করে জানলার কাছে আসতেই গুলিটা সোজা ওর মুখে ঢুকে যায়।
চমৎকারভাবে কাজটা শেষ করলাম। শব্দ নেই, নেই ঝামেলা। একেবারে নিখুঁত কাজ। পরের বারের খুনটা স্টকহলমে। নরওয়ে ভিয়েনাকে খুন করার আদেশ দিল। আমাদের হয়ে কাজ করার পরিবর্তে জার্মানদের সব খবর পৌঁছে দিচ্ছিল। ওর জন্য আমাদের দুজন লোককে মৃত্যু বরণ করতে হয়। এই লোককেও ঐ দুজনের মতই মৃত্যুর কোলে ঢুলে পড়তে হল।
এই কাজের জন্য সার্ভিসে আমি ডাবল জিরো নম্বর লাভ করলাম। ভাবলাম কত বীরত্বপূর্ণ কাজ যায় ফল স্বরূপ এই পুরস্কার। আমার খুব নাম ডাক হল। শুধু কাজ, মানে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা।
এই গল্প শুনতে ভালই লাগে। জিরো দুজন শয়তানকে খুন করেছে। কিন্তু হিরো শিফ যখন শয়তান বন্ডের কাছে এগিয়ে এল তখনই সমস্ত ব্যাপারটা ওলোট পালট হয়ে গেল। ওখান থেকে গন্ডগোলের সূত্রপাত। ম্যাথিসকে থামিয়ে বন্ড বলতে লাগল, এখানে দেশপ্রেম বলে একটা ব্যাপার কাজ করে। আমার দেশ যা করবে তাই আমায় মেনে নিতে হবে। আজ আমরা কমিউনিজমের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছি কিন্তু পঞ্চাশ বছর আগেও আমাদের আজকেরই এই কনজারভেটিজমকেই বলা হত কমিউনিজম। ইতিহাসের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবে–আজকের হিরো কালকে শয়তানরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে।
বন্ড তোমার কথা মেনে নিলে শিফকে তোমার বিরুদ্ধে এই কাণ্ড করেও শয়তান বলে চিহ্নিত করা যায় না। স্মার্শ ও যারা ইউরোপে ইচ্ছে মত ঘুরে বেড়াচ্ছে, কাউকে দেখে তার যখন মনে হচ্ছে সে ওদের শত্রু, তারই সে প্রাণ নিয়ে নিচ্ছে। বন্ড, তোমার মনে এই সব অদ্ভুত অদ্ভুত ব্যাপার আসতে থাকলে তুমি একদিন সত্যি সত্যি এক অ্যানার্কিস্টে পরিণত হবে।
বন্ড মৃদু হাসল। তাই যদি হয়, শিফের কথাতেই আসা যাক। শিফ আমার সঙ্গে চরম নিষ্ঠুরতা করেছে। আমার হাত থেকে ও কোনমতেই নিষ্কৃতি পেতে পারে না। একদিন না একদিন আমি তাকে খুঁজে বার করতাম। আমি যদি তাকে হত্যা করতাম তার কারণ থাকত তার ওপর আমার ব্যক্তিগত আক্রোশ। এখানে কোন নৈতিক-কারণ বা দেশের স্বার্থ জড়িত নয়।
ম্যাথিস বন্ডের কথায় হেসে উঠল। সে বলল, বলে যাও তোমার কথার মধ্যে এমন কিছু আছে হয়ত যার জন্য আমি নিজেও উত্তেজিত হয়ে পড়ছি। বন্ড ম্যাথিসের এই বিদ্রূপ আঁচ করতে পারল। কিন্তু না শোনার ভান করে আবার আগের কথায় ফিরে এল। ভাল বা মন্দ বোঝার জন্য আমরা আমাদের মনের মধ্যে দুটো জিনিস স্থাপন করেছি। একজন সৃষ্টিকর্তা আর অপর একজন শয়তান। আমি নিজে বুঝতে পারছি না কোন দল আমার কাছে প্রযোজ্য। অসৎ আচরণ থেকেও মহৎ জীবনযাপন করা যায়। এর চাক্ষুস দৃষ্টান্ত স্বয়ং শিফ। শয়তানীর মাপকাঠি না থাকলে ভালত্বের বিচার কখনই সম্ভব নয়। তার সঙ্গে পরিচিত হয়ে আমি লাভবানই হয়েছি।
ম্যাথিস হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়াল। কে ভাল বা কেন মন্দ এই পাপপুণ্যের প্রভেদ একমাত্র অভিজ্ঞতা থেকে হওয়াই সম্ভব। তুমি স্বীকার করেছ–শিফকে কাছে পেলে তুমি কিছুতেই তাকে ছেড়ে দিতে না। লন্ডনে ফিরে যাও। সেখানে অনেক শিফের সন্ধান পাবে তুমি, যারা তোমাকে, তোমার বন্ধুকে তোমার দেশকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়ে আছে। পারবে তুমি সেখানে নিজেকে সংযত রাখতে? তুমি তোমার পরিবারের নিরাপত্তার জন্যই এদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার তুলবে। ধারণা নিয়ে আমরা পথ চলতে পারি না। মানুষদের সঙ্গেই আমাদের বাস। তোমার মত চমৎকার। মেশিন যদি মানুষের দ্বারস্থ হয়–শুধু, আমি কেন? সবার মনই সমান ব্যথা অনুভব করবে। হাত নেড়ে আজকের মত বিদায় নিল সে।
