দুদিন পর বন্ডের জ্ঞান ফিরল। আচ্ছন্ন চেতনার মধ্যে অসংখ্য স্বপ্নের ভিড় জমা হচ্ছে কিন্তু সবগুলোই অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে আছে সে, এত দুর্বল যে নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই। তার চারপাশে লোকজনের চলাফেরা সে টের পাচ্ছিল কিন্তু জাগ্রত জগতে প্রবেশ করার কল্পিত বাসনা তার ছিল না। অন্ধকারেই ফিরে যেতে চায়।
তৃতীয় দিন সকালে মারাত্মক দুঃস্বপ্ন দেখে বিছানায় জেগে উঠল বন্ড। সর্বশরীর কাঁপছে। ঘামে জামাকাপড় ভিজে গেছে। কপালে কার হাতের স্পর্শ পেল। এই স্পর্শ সে স্বপ্নের মধ্যেও পেয়েছে। ছুঁড়ে ফেলে দিতে চেয়েছে হাতটা। পারেনি, কারণ হাত দুটো বিছানার সঙ্গে আঁটা। রাগের চোটে তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল অশ্রাব্য গালি। এটুকু বলেই সে হাঁফাতে লাগল। নিজের এই অসহায় অবস্থা দেখে তার চোখ বেয়ে পানি পড়তে লাগল। কপালে আবার সেই হাতের স্পর্শ পেল। দুচোখে ঘুম নেমে এল। কয়েক ঘণ্টা বাদে ঘুম ভাঙল। ভয়ের পরিবর্তে শরীরে এখন সে আরাম বোধ করল। ঘরে রোদ এসে পড়েছে, দূর থেকে তটে পানি আছড়ানোর শব্দ ভেসে এল। একটু মাথা নাড়তেই কাপড়ের শব্দ তুলে সুন্দরী নার্স পাশে এসে দাঁড়াল। হাসি মুখে বন্ডের নাড়ি দেখল।
আপনার জ্ঞান ফিরে আসায় আমরা একটু স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছি। আপনি এখন রয়্যালের একটা নার্সিংহোমে। আপনার দেখাশোনার জন্য ইংল্যান্ড থেকে এই কারণেই আমার আসা। আমরা দুজন এসেছি। আপনি যে সেই অজ্ঞান অবস্থায় এখানে এসেছিলেন, তার পরে আর জ্ঞান ফেরেনি। আমার নামটাই বলা হয়নি গিবসন।
চোখ বন্ধ করল বন্ড। সর্বাঙ্গে ব্যথা। দেহের মাঝখানটা অসাড় হয়ে গেছে। সব জায়গায় ব্যান্ডেজ, গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, শরীরের অবস্থাটা যে কেমন এখন সে বুঝতে পারল। দরজা খুলে ডাক্তার এলেন, সঙ্গে ম্যাথিস। ম্যাথিসকে দেখে বন্ডের মন খুশিতে ভরে উঠল। তার অনেক কিছু জানার আছে।
ডাক্তারটি ফরাসী, দোয়াজিয়েম বুরোতে আছেন। বন্ডের চিকিৎসার জন্য তাকে এখানে আনা হয়েছে। আপনি বেশি কথা বলবেন না। ম্যাথিসের সঙ্গে দু-একমিনিট কথা বলবেন। ডাক্তার বললেন, এক চাষী আপনার গাড়ীটা দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। ম্যাথিস খবর পেয়ে ওটা আপনার গাড়ী শোনা মাত্র ভিলাতে লোকজন নিয়ে উপস্থিত হন। সেখানে গিয়ে শিফ ও আপনাকে পান। আপনার বান্ধবী সুস্থই ছিলেন। ওরা ওর গায়ে হাত দেয়নি। এখন তিনি ওনার হোটেলেই আছেন। ওপরওয়ালাদের নির্দেশ আছে আপনি সেরে না ওঠা পর্যন্ত ও আপনার সঙ্গেই থাকবে। শিফের রক্ষীদুটোও আর বেঁচে নেই। মুখ দেখে মনে হয় হত্যাকারীকে দেখার সুযোগ ওরা পায়নি। আপনি নিশ্চয়ই হত্যাকারীকে দেখেছেন। বন্ড ঘাড় নাড়ল।
আপনার আঘাত গুরুতর হলেও প্রাণের আশংকা নেই। রক্তক্ষরণ হয়েছে প্রচুর। আপনার এখন বিশ্রামের প্রয়োজন। কিছু দিনের মধ্যেই আপনি শরীরের সব রকম ক্ষমতাই ফিরে পাবেন। আপনার মনের জোর খুব বেশি। আপনার বেঁচে থাকাটাই এক আশ্চর্যজনক ব্যাপার। ম্যাথিসকে সতর্ক করে দিয়ে এক গাল হেসে ঘর ছেড়ে চলে গেলেন ডাক্তার।
ম্যাথিস থপ করে ডাক্তারের চেয়ারে বসে পড়ল। ডাক্তারকে বন্ডের বেশ মনে ধরেছে। বন্ড, প্যারিস আর লন্ডন তোমার সব খবর জানতে চাইছে। ওয়াশিংটনও পেছিয়ে নেই। এম ফোনে নিজে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। তোমাকে উনি অভিনন্দন জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে বলেছেন ট্রেজারি বিভাগ এখন নিশ্চিন্তবোধ করছে। বন্ড পুলকিত হল। এম নিজে ফোন করেছেন। তাঁর সে অস্তিত্ব সেটাইতো স্বীকার করা হয় না। ঐ গোপন প্রতিষ্ঠানেও খুব হৈ চৈ পড়ে গেছে-ঘরে বসেই সে-টের পেল। আচ্ছা বন্ড, তাহলে ল্যশিফকে কে হত্যা করল? স্মার্শ। শিফের হত্যা ঘটনাটা বন্ড ম্যাথিসকে বলল। কিন্তু দৃশ্যগুলো সামনে আসতেই বন্ড নিজেকে সামলাতে পারল না। শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হল। ম্যাথিস শর্ট হ্যাঁন্ডের নোট থামিয়ে দিল। এই ব্যবহারের জন্য সে ক্ষমা চাইল। সব ভাল ভাবে শেষ হয়েছে। আমরা এই প্রচার করেছি যে শিফ তার দুই সহকর্মীকে খুন করে নিজে আত্মহত্যা করেছে। কারণ ইউনিয়নের টাকা নষ্ট করে জবাবদিহি করার মুখ তার ছিল না। ম্যাথিসের কথায় বন্ডের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
একটা রহস্য কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। উত্তরটা শুনেই আমি প্রস্থান করব। যার জন্য এত ঝামেলা সেই চেকটা উধাও হল কোথায়?
দরজার বাইরে একটা নাম্বার প্লেট আছে। লিটার চলে যেতেই নাম্বার প্লেটটা খুলে চেকটা তার মধ্যে পাট করে ঢুকিয়ে আবার বন্ধ করে দিয়েছি। এখনো ঐখানেই আছে। তাহলে ম্যাথিস তুমি বল-ইংরেজরা যতই বোকা হোক, চালাক ফরাসীদের তারা বোকা বানাবার ক্ষমতা ধরে।
ডাক্তার আসতেই ম্যাথিস উঠে পড়ল। ম্যাথিস হাত নেড়ে বিদায় জানাল। ডাক্তার তাকে একরকম ঠেলতে ঠেলতেই ঘর থেকে বের করে দিলেন। ক্লান্তিতে বন্ডের চোখ বুজে এল।
.
অমঙ্গলের স্বরূপ
তিনদিন পর বন্ড নিজেকে অনেকটা সুস্থ বোধ করল। ম্যাথিস ওর সঙ্গে দেখা করতে এল। উঠে বসলেও দেহের তলার দিকটা তখনো ঘেরাটোপে আবৃত।
ম্যাথিস বন্ডের দিকে চেকটা এগিয়ে ধরল। কারণ বন্ডের সই দরকার। তোমার সই হয়ে গেলে আমি টাকাটা তোমার অ্যাকাউন্টে জমা করে দেব। স্মার্শের বন্ধুটি কিন্তু একেবারে উধাও। লোকটা ভিলায় গেলে সাইকেল বা পায়ে হেঁটে গেছে নিশ্চয়ই। এই স্মার্শের সম্বন্ধে আমরা বিশেষ কিছুই জানি না। লন্ডনও জানে না। তবে এ বিষয়ে ওয়াশিংটন যা বলছে তা হল রেফিউজিদের কাছে পাওয়া কিছু খবর। এখানে আর তার কি মূল্য আছে?
