শিফ ততক্ষণে আরও একটা সিগারেট ধরাল। সিগারেট মুখে নিয়েই কথা বলতে থাকল। দেখ বন্ড, তুমি নিজে একজন পুরুষ, আমিও তাই। তাই তোমার ওপর আর অন্য অত্যাচার করে কি দরকার। এর ওপর তুমি যদি কোন রকম অবাধ্যতা কর, তুমি মানুষ থাকলেও পৌরুষ তোমাকে ছেড়ে যাবে। ভাবতেই কেমন অবাক লাগে না কি বন্ড? শারীরিক কষ্টের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক কষ্টও যুক্ত হয় কিন্তু এই যন্ত্রণা এত বেদনাদায়ক হয় যে তুমি নিজেই আমাকে অনুরোধ করবে তোমাকে একেবারে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে।
থরথর করে কাঁপছিল বন্ড। গাল শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। অতিকষ্টে শুধু একটু পানি চাইল। শিফ উঠে দাঁড়াল। মুখ খুলে কফি ঢেলে দিল, যাতে দম না বন্ধ হয়। জড়িত স্বরে বন্ড বলে উঠল, টাকা এখন আর কোন কাজে লাগবে? পুলিশ সন্ধান পেয়ে যাবে।
বন্ড এতটাই পরিশ্রান্ত ছিল যে, দেহের ভার রাখতে পারছে না। মাথাটা সামনে ঝুলে পড়ছে বার বার। যতটুকু না সে কাহিল হল তার চেয়ে অনেক বেশি পরিশ্রান্তের নাটক করতে থাকল।
ধূর্ত হাসি সারা মুখে ছড়িয়ে পড়েছে শিফের মুখে। শিফকে এখন ভীষণ হিংস্র মনে হল। শিফ আবার শুরু করল। বন্ড তোমাকে আসল কথাই বলা হয়নি। ক্যাসিনোর খেলার পরে আমাদের মধ্যে কথা হয়েছিল, আরও একবার আমরা মুখোমুখি হব। ইংরেজ রক্ত তোমার শরীরে। তুমি খেলতে রাজি হতে। দুর্ভাগ্য তোমার পিছু ছাড়ত না। তোমার হার হল। রয়্যাল ছেড়ে কোন এক অজানা দেশে পাড়ি দিলে। যাবার আগে লিখে গেলে যাতে চেকটা ভাঙাতে আমার কোন অসুবিধে না হয়। সত্যিই তোমার মত ভদ্রলোক আর হয় না। সব ব্যবস্থা পাকা।
বন্ডের আর কোন ভরসাই রইল না। অজানা দেশ মানে মাটির তলা কিম্বা অতল সমুদ্র। ম্যাথিস বা লিটারের এখানে আসার কোন সম্ভাবনাই নেই। তবে যত দেরি হবে শিফের ধরা পড়ার সম্ভাবনা তত বেশি। এখন হয়ত গাড়িটা কারোর চোখে পড়েছে। অসংহ্য অত্যাচার সহ্য করা যাবে যদি শিফের মত লোক ধরা পড়ে। রাগে উন্মত্ত হয়ে শিফ আবার মার শুরু করল। মুখ থেকে বেরাতে লাগল নিষ্ঠুর জান্তব আওয়াজ।
শিফ নিস্পন্দ দেহটার কাছে দাঁড়াল। সমস্ত দেহ রক্তশূন্য। চামড়াটা এখনও অল্প অল্প কাঁপছে। এক গ্লাস কফি বন্ডের মুখে আর মাথায় ঢেলে দিল। চেয়ারে বসে দেখতে লাগল বন্ডের প্রতিক্রিয়া। চোখ মেলল বন্ড। অনেক হয়েছে। শিফ নিজেও ক্লান্ত বোধ করছিল। মনে মনে ভাবল, মেয়েটাকে তোমার সামনে রেখেই আমি আমার কাজ সারব।
.
পাথুরে চোখ
এবার তৃতীয় ব্যক্তির প্রবেশ। বন্ডের আচ্ছন্ন চেতনায় সব না ঢুকলেও এক ব্যক্তির উপস্থিতি টের পাচ্ছিল। হঠাৎ তার সম্পূর্ণ জ্ঞান ফিরে এল। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে। শিফ আশ্চর্য ভাবে মাথা নাড়ছে। কৌতূহল আর স্তম্ভিত ভাব এখন। উধাও যা আছে সে শুধু ভয়।
বিদেশী উচ্চারণে কে কথা বলছে? তার কথা শুনছে শিফ। বাধ্য ছেলের মত ছুরিটা নামিয়ে রাখল। শিফের মুখ দেখে বন্ড প্রাণপণে বোঝার চেষ্টা করল, কি ঘটছে, কিন্তু সে মুখ আতঙ্কে ভরপুর। ঠোঁট কাঁপছে থরথর করে, মুখ দিয়ে একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার বেরিয়ে এল। মনে হল কেউ শিফের দিকে রিভলবার ঠেকিয়ে আছে। সে বোধহয় বোঝবার চেষ্টা করছিল কিন্তু লোকটির মুখ দেখে সে বুঝে নিয়েছে সব চেষ্টাই বৃথা।
তোমার দুটো লোকের কেউ বেঁচে নেই। তুমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছ। তাই তোমার বাঁচার কোন অধিকার নেই। সোভিয়েত আমায় পাঠিয়েছে তোমার কাছে। তাদের নির্দেশ আছে তোমার মৃত্যু যেন যন্ত্রণাদায়ক হয়। কিন্তু সময়ের অভাবে তোমায় আমি গুলি করছি। তুমি যা করেছ তার তুলনায় তোমার কাছে এই পুরস্কার অনেক কম।
তার সমস্ত শরীর অসাড় অবসন্ন। তবু কোনমতে সে শিফের প্রকান্ড মুখের দিকে চেয়ে রইল। চোখ দুটো তার দিকে চেয়ে আছে, মুখের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে লালা। পা দুটো মাটিতে শেষবারের মত ঠুকছে। আর কোন শব্দ নেই। ঘরে যেন এক নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। শুধু টিউব থেকে হাওয়া বেরোবার মত একটা শব্দ। এই শব্দের এত জোর যে চোখের নিমেষে সবশেষ।
একটা হাত রুক্ষভাবে তার থুতনি ধরে আচমকা এক হ্যাঁচকা টান দিল। এবার সে তাকাল। কালো মুখোস। তার মধ্যে জ্বলজ্বল করছে দুটো চোখ। হ্যাট আর বর্ষাতিতে ঢাকা পড়ে গেছে মুখ। আর কিছু দেখার আগেই তার মাথাটা সমিনে করে দেওয়া হল।
বন্ড তোমার কপাল সত্যি ভাল। একদিনে দু-দুবার প্রাণ ফিরে পেয়েছ তুমি। তোমার বসকে বোলো স্মার্শ কাউকে সমীহ করে না। প্রথমবার তুমি ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরেছ, দ্বিতীয়বার ভুল করে তোমাকে মারার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। আমাকে।
আমার পরিচয় রেখে গেলাম। তুমি হয়ত কোনদিন আমাদের বিরুদ্ধে খেলায় নামবে। এই বলে, বন্ডের বাধা ডানহাতটার ওপর ছুরির তিনটে আঁচড় দিল। চতুর্থ আঁচড়ে লেখা শেষ হল। বন্ড এতক্ষণ যে যন্ত্রণা ভোগ করেছে তার কাছে এ যন্ত্রণা কিছুই নয়। হাত দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরতে লাগল। ক্রমেই পদশব্দ মিলিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হয়ে গেল। নিস্তব্ধতা আবার ফিরে এল। সারা মেঝে রক্তে ভেসে যাচ্ছে, সেই রক্তের ওপর রোদ পড়ে দেওয়ালে। গোলাপী রঙের আভা চোখে পড়ছে। এটুকুই মনে আছে বন্ডের। এরপর সে চেয়ারের কোলে ঢলে পড়েছিল।
.
সাদা তাঁবু
