হঠাৎ গাড়ির পেছনের বুট খোলা হল। অন্য লোকটি লোহার শেকল তার মধ্যে পুরে দিল। লোকগুলো ভীষণ চটপটে। এদের কাজের গতি প্রকৃতি দেখলে সত্যি অবাক লাগে। তারপর ভাবল শুধু কি অফিসের? এই ঘটনার জন্য সেও সমান দোষী। সে নিজেকে কেন এত হাল্কাভাবে নিল। সে জানত আজকে খেলার আসরে কি কি হয়েছে? এসব চিহ্ন একত্র করে, অনেক আগে তার সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত ছিল। রোয়া গালান্তে আজকে না গেলেই কি চলছিল না। শত্রুপক্ষ তার থেকে কত চালাক কত বুদ্ধি রাখে। শ্যাম্পেন খেতে খেতে শত্রুপক্ষের কথা একবারও মনে হয়নি। অথচ শত্রুপক্ষ পালটা চাল চেলে দেখিয়ে দিল তাদের আত্মবিশ্বাসের জোর বন্ডের তুলনায় কত বেশি। অন্য লোকটি গাড়িতে উঠে বসতেই শিফ গাড়ি ছেড়ে দিল। সত্তর মাইল বেগে উপকূলের রাস্তা ধরে তাদের গাড়ি ছুটে চলল।
আলো দেখা দিয়েছে। মনে হয় পাঁচটা। ওদের যাওয়া দেখে বন্ডের মনে হল ওরা শিফের ভিলার দিকেই চলেছে।
দু-এক মাইল যাবার পরই একটা বাঁক পড়বে। এখন সমস্ত ব্যাপারটা তার কাছে পানির মত পরিষ্কার হয়ে গেল।
বন্ডের মনে হল, ভেসপারকে এখানে আনার কি দরকার ছিল? ঝামেলা যখন তার সঙ্গে, অকে সঙ্গে নিয়েছে এটাই তো যথেষ্ট। আসলে ভেসপারকে ওরা টোপ হিসেবে ব্যবহার করছে।
মিনিট দশেকের মধ্যে গাড়ি বাঁ দিকে মোড় নিল। ঘাস আর আগাছায় ঢাকা কাঁচা রাস্তা। প্লাস্টার খসা পাচিলঘেরা এক বাড়ি। ঘণ্টার বোতামেও মর্চে ধরেছে, তার ওপর জিংকের অক্ষরে লেখা নিশাচর।
এই বাড়িটার স্থাপত্য কার্যে তেমন বৈশিষ্ট্য নেই। ফ্রান্সে উপকূল অঞ্চলে এই রকম অনেক বাড়ি আছে। সারা বছরই বাড়ি বন্ধ থাকে। শুধুমাত্র গরমে ভাড়া দেবার জন্য বাড়িটার চেহারা একবার বদলান হয়। এজেন্ট থাকে রয়্যালে। পাঁচ বছর অন্তর চুনকাম, তাও কেবল বাইরের দিকটা আর ঘরের দেওয়াল। শীতকালে বৃষ্টি শুরু হবে, রঙ চটে যাবে, মাছি ভনভন করবে সেই সঙ্গে বাড়িটা আবার পোড়ো বাড়িতে পরিণত হবে।
সত্যি ল্য শিফের বুদ্ধিকে তারিফ জানাতেই হয়। কালও যখন এখানে এসেছিল, কয়েক মাইলের মধ্যে বন্ডের কোন খামার পর্যন্ত দৃষ্টিগোচর হয়নি। রোগা লোকটা এক গুঁতো মেরে বন্ডকে গাড়ি থেকে নামাল। গাড়িতে আসতেই তাদের স্বভাবের কিছুটা পরিচয় সে পেয়েছে। তাদের চরিত্র সম্বন্ধেও একটা ধারণা করে নিয়েছে। কিন্তু গাড়ি থেকে নামার। পর এই সব ভেবে বন্ড যেন আরও ঘামতে শুরু করল। এখানে শিফের নির্দেশে তারা বন্ড ও ভেসপারের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালিয়ে যাবে, এতে কোন ভুল নেই। এটা মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক অজানা আতঙ্ক বন্ডকে ঘিরে ধরল।
চাবি খুলে ল্যা-শিফ বাড়ির ভেতর চলে গেল। ভোরের আলোয় ভেসপারকে বড় বেশি অশোভন দেখাচ্ছিল। কর্সিকান লোকটার মুখ বড় খারাপ। অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে করতে ভেসপারকে নিয়ে চলল বাড়ির ভেতর। বন্ড রোগা লোকটার সঙ্গে তাদের পথ অনুসরণ করে চলল।
দরজা আবার বন্ধ হয়ে গেল। ডানদিকে দরজার মুখে দাঁড়িয়ে ল্য-শিফ। সে দেখল ভেসপারকে বারান্দা দিয়ে বাড়ির পেছন দিকটাতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মুহূর্তে মনস্থির করে নিল সে, তার কি করনীয়। উন্মত্তের মত পেছনের লোকটির হাঁটুর কাছে আঘাত হানল। আর্তনাদ করে উঠল সে। একমাত্র অবলম্বন তখন তার পা। এই সম্বলের উপর নির্ভর করে সে বারান্দার দিকে ছুটে চলল। সে কি করতে চলেছে, সে নিজেও জানে না। তবে লোক দুটোকে যে করেই হোক জখম করতে হবে। তার এই চেষ্টা সফল হলে ভেসপারের সঙ্গে একটু কথা বলা যাবে। তাকে এও বলতে হবে যে, সে যেন কোনমতেই নিজেকে ওদের কাছে আত্মসমর্পণ না করে।
গোলমালের শব্দ কানে যেতেই কর্সিকানটা পেছন ফিরল। বন্ডের কাণ্ডখারখানা দেখে অবাক হল। বন্ড ওকে কিছু ভাববার অবকাশ না দিয়েই ডান পা-টা তার দিকে এগিয়ে ধরল। দেওয়ালের গায়ে পিঠ লাগিয়ে কোন মতে নিজেকে বাঁচাল সে। বন্ড যখন দ্বিতীয় আক্রমণ হানতে যাচ্ছে লোকটি তখন আলতো করে বা হাত দিয়ে বন্ডের জুতাটা একটু ঘুরিয়ে দিল। ব্যালান্স না রাখতে পারায় অন্য পা টাও মাটি ছেড়ে উঠে গেল। নিজের ভার আর রাখতে পারল না। সপাটে মেঝের ওপর পড়ল। কতক্ষণ সে এভাবে পড়েছিল তা জানা গেল না। তবে এইটুকুর জন্যই তার ওঠোর ক্ষমতা সে হারিয়ে বসে আছে। রোগা লোকটা এসে তাকে টেনে তুলল। হাতে ধরা পিস্তল। নির্বিকার চিত্তে তার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ নিচু হয়ে পিস্তলের মুখটা দিয়ে তার পায়ে সজোরে মারল। বন্ড যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠল। ভাঙা ভাঙা ফরাসীতে যা বলল তার অর্থ হল, এর পরের বার এ রকম কিছু করলে তোমার বাঁচা মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। মুখের ওপর দরজাটা বন্ধ করে চলে গেল। ভেসপার কর্সিকানটার সঙ্গে আছে। শিফের দিকে চোখ পড়তেই সে দেখল, শিফ গুটি গুটি পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে।
এতক্ষণ পরে তার মুখে কথা শোনা গেল। বন্ডের উদ্দেশ্যে তার বক্তব্য হল তুমি অযথা তোমার বৃথা সময় নষ্ট করছ। লোকটার এই ইংরাজি উচ্চারণ বেশ পরিষ্কার। গলায় কোন আবেগ নেই, নেই উত্তেজনা। নিজেকে শিফের কাছে অত্যন্ত দুর্বল মনে হল। বন্ড আর অযথা কথা বাড়াল। বাধ্য ছেলের মত তাদের অনুসরণ করল। এদের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে বন্ডের কিছু লাভ হয়নি, উল্টে গায়ে আঁচড়ের দাগ পড়েছে। লোকটার পেছন পেছন বন্ড এসে ঘরে ঢুকল। এবার সে সম্পূর্ণরূপে এদের হাতের মুঠোয় চলে এল।
