বেন্টলির স্পিডোমিটারের কাটা ১১০ মাইল অতিক্রম করে ১২০ মাইলকে ধরে ফেলল।
বন্ড ভাবল ওরা মিত্রোতে গেছে। মিত্রের বেশি ভার নেবার ক্ষমতা নেই। ওর স্পীড বড়জোর আশি ছুঁতে পারে। এই ভেবে বন্ড গাড়ির গতি অনেক কমিয়ে দিল। স্পিড় সত্তরে নামিয়ে আনল। হেড লাইটের পরিবর্তে ফগ লাইট জ্বালল। তখনই চোখে পড়ল মাইল দুয়েক আগে আরও একটা গাড়ি। তার গাড়ির চোখ ধাঁধান আলোয় গাড়িটা চোখে পড়েনি। .৪৫ ব্যারাল কস্ট আর্মি স্পেশালটা কোলের ওপর নিয়ে বসল। একশ গজ দূরে থাকতে থাকতেই গাড়ির টায়ার বা পেট্রল ট্যাঙ্ক অবশ্যই ফুটো করতে পারবে সে।
এবার বন্ড মনে যেন এক অদ্ভুত আবেগ অনুভব করল। গাড়ির স্পিড আরো বাড়িয়ে দিল। শত্রুপক্ষের কাছাকাছি আসতে পেরে সে অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করছিল। এখন ভেসপারের প্রাণের আশঙ্কা আর নেই।
সামনে মিত্রো গাড়িতে তিনজন লোক আর ভেসপার। গাড়ির চালক শিফ নিজে। হালকা হাতে স্টিয়ারিং কন্ট্রোল করে আছে। পাশে ছড়ি হাতে লোকটা। গাড়ির মেঝেতে একটা লেভার বাঁ হাতে শক্ত করে ধরে আছে। পিছনের সিটে গা এলিয়ে পড়ে আছে লম্বা লোকটা–যার হাতে অস্ত্র ছিল। একেবারে উদাসীনভাব, উৎসাহহীন দুটি চোখ। বা হাত রাখা আছে ভেশপারের উরুর ওপর। ভেসপারের কালো স্কার্ট দিয়ে তাকে বস্তার মত বাধা হয়েছে। মুখের কাছে একটি ছোট ফুটো–নিঃশ্বাস নেবার জন্য। নগ্ন পা। তার শরীরে আর কোন বন্ধন নেই। নিঃসাড় হয়ে পড়ে আছে তার দেহ। শুধু গাড়ির তালে তালে তার শরীর ঈষৎ দুলে উঠছে।
শিফের দৃষ্টি যেমন রাস্তার দিকেও আছে তেমনি আধখানা নজর বন্ডের গাড়ির আলোর দিকেও আছে। দুটো গাড়ির মধ্যে দুরত্ব ক্রমেই কমতে থাকল। এখন এক মাইলে এসে দাঁড়িয়েছে। তার গাড়ির স্পীড এখন ষাট মাইল।
শিফের চোখে পড়ল কয়েকশ গজ দূরেই একটা কাঁচা রাস্তা। গাড়ির গতি সে তিরিশ মাইলে নামাল। বন্ডের গাড়ির হেডলাইটে মোড়টা একবারে আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল। শিফের আদেশে লোকটা লেভার ধরে একটা টান দিল। গাড়ির পেছনের মাল রাখার জায়গা থেকে কি সব পড়ার শব্দ। যেন গাড়ি থেকে ঝন ঝন করে অনেকগুলো লোহার চেন পড়ে গেল। লোকটা লেভারটা নামিয়ে দিল। ঝন ঝন শব্দটা আর শোনা গেল না।
বন্ডের গাড়ি মোড় নিয়েছে। শিফও আলোটা কমিয়ে মোড় নিল। গাড়ি থামিয়ে তারা তিন জনেই নীচু একটা ঝোঁপের মধ্যে গিয়ে আশ্রয় নিল। তিন জনের হাতেই ধরা আছে রিভলভার।
বেন্টলির আলো ছুটন্ত ট্রেনের মত তাদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
.
গা শিউরে ওঠে
প্রচণ্ড বেগে গাড়ি ছুটছে। রাস্তার ঈষৎ বক্ৰপিঠের ওপর দিয়ে তার এই বাহনকে নিয়ে চলেছে বন্ড। খুব সাবধানে এগোচ্ছে। কারণ এই দিকের রাস্তা-ঘাট তার কাছে অজানা। সে শিফের গাড়ির কাছাকাছি চলে এল। মোড়ের কাছে এসে গাড়ির আলো দেখতে পেল না। সে ভাবল ওদের ড্রাইভার ছোট রাস্তা ধরেই পালিয়েছে। এই সব ভাবতে ভাবতেই ব্রেক কষল।
রাস্তার ডানদিকে ঝোঁপের ঝাড় চোখে পড়ল। হঠাৎ স্টিয়ারিঙের অন্য দিকে চাকার আর স্টিলের কাঁটা ঝলকে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটা তার ওপর উঠে গেল। প্রাণপণে ব্রেকের ওপর পা দিল সে। স্টিয়ারিং সোজা রেখে দিল। কিন্তু এক সেকেন্ড, তার পরেই চাকা থেকে রাবার বেরিয়ে চাকার ধারটা রাস্তায় ঘষে গেল, গাড়িটা ছিটকে গিয়ে পড়ল। গাড়িটা আস্তে আস্তে উপরে উঠে গেল। চাকাগুলো শূন্যে বোঁ বোঁ শব্দে ঘুরতে লাগল। অবশেষে গাড়িটা উল্টে গেল। ঝনঝন করে কাঁচ ভেঙে গেল। চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
ঝোঁপের আড়াল থেকে শিফ ও তার অনুচরেরা এই সবই দেখল। পা টিপে টিপে তারা বেরিয়ে এল। শিফ লোক দুটোকে নির্দেশ দিল বন্ডকে গাড়ি থেকে উদ্ধার করার জন্য। পিস্তলের কথা না ভেবে ওর দিকে নজর দাও। সকাল হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি কর। ভিড় হওয়ার আগে কাজ শেষ করতে হবে। সাবধানে বার কর, তোমাদের হাতের চাপে বন্ডের মৃত্যু না হয়–বন্ডকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের কাছে খুব প্রয়োজন। লোক দুটো প্রভুর আদেশ পালন করল। তারা গাড়ির ছাদ ফুটো করে বন্ডের অচৈতন্য দেহটাকে বাইরে নিয়ে এল। রাস্তার ওপর শুইয়ে দিল।
তেল ও ঘামে লোক দুটোর অবস্থা তখন করুণ। বন্ডের বুকে হাত দিয়ে দেখল বেঁচে আছে কিনা। তারপর তার গালে একের পর একচড় মারতে লাগল। বন্ডের দেহটা একটুর জন্য নড়ে উঠল। শিফের কথায় তারা বন্ডের অচৈতন্য দেহটা মিত্রোতে নিয়ে এসে তুলল। বন্ডের হাত দুটো শক্ত তার দিয়ে বেঁধে দিল। বন্ডের কাছে যা যা ছিল তা বের করে শিফের হাতে দিয়ে দিল। শিফ একবারের জন্যও তাকিয়ে দেখল না কি কি আছে। যে অবস্থায় ছিল সেগুলো পকেটে ভরে নিল।
তারের শক্ত বাঁধন হাতে কেটে বসতেই বন্ডের জ্ঞান ফিরে এল। সারাদেহ অবশ্য, ভীষণ যন্ত্রণা। সে বুঝতে পারল তার হাত পা কিছু ভাঙেনি। পালাবার নামও করল না সে। নিজেকে সে ওদের হাতে সঁপে দিল। বিনা বাধায় গাড়ির পেছনের সিটে গিয়ে ঢুকল।
মানসিক ক্লান্তি আর অবসাদে শরীর আরো বেশি ক্লান্ত লাগছে। চব্বিশ ঘন্টা যেতে না যেতেই এই ধাক্কা। সহ্যের তো একটা সীমা থাকে–এখানে সেই সীমাও ছাড়িয়ে গেছে। এবারে দৈব সহায় হবার কোন আশা নেই। কারণ কেউ জানেই না যে সে এখানে আছে। সকাল হওয়ার অনেক পরেই কেউ হয়ত তার খোঁজ খবর করবে। ভাঙা গাড়িটা চোখে পড়বে ঠিকই কিন্তু এই গাড়িটা কার তা বার করতেও অনেক সময়ের ব্যাপার। সত্যি সে আর চিন্তা করতে পারছে না। যা হবার হবে, তখন দেখা যাবে। হঠাৎ ভেসপারের কথা মনে পড়ল। রোগা লোকটা চোখ বন্ধ করে আছে। প্রথমে ভেসপারকে দেখে তার খুবই রাগ হল। কারণ যত নষ্টের গোড়া এই ভেসপার। তার জন্যই আজ বন্ড। এখানে। পরক্ষণেই তার নগ্ন, অসহায় পা দুটোর দিকে চেয়ে বন্ডের কি রকম মায়া হল। নাম ধরে ডাকল, ভেসপার! কিন্তু কোন শব্দ নেই, একটুর জন্য যেন মনে হল দেহটা নড়ে উঠল। তার কথা বলা দেখে রোগা লোকটা তাকে একটা সজোরে চড় মারে। আচমকা এই আক্রমণের জন্য বন্ড প্রস্তুতি ছিল না। এলোপাথাড়ি মার আসতে লাগল। লোকটি এ বিষয়ে পেশাদার না হয়ে যায় না। একটুর জন্য যে যন্ত্রণা ভুলে ছিল। কিন্তু এই আক্রমণে সে একেবারে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল। লোকটি যে এত ভয়ঙ্কর তা তার চেহারা দেখলে বোঝা যায় না।
