না, তার সন্ধ্যে বেলার ব্যবহারের প্রতিশোধ নিচ্ছে ভেসপার। সত্যি তার যে একেক সময় কি হয়, দুম করে এমন সব কথা বলে ফেলে যার জন্য পরে নিজেকে নিজের কাছে ছোট হতে হয়।
দুজনে শ্যাম্পেন খেতে লাগল। বন্ড এই আবহাওয়ার পরিবর্তন চাইছিল। তাই সে নিজেই লিটার, ম্যাথিস এদের ব্যাপারে কথা বলতে থাকল। সন্ধ্যে বেলার ঘটনা বলতেও ভুলল না সে।
ভেসপার উত্তর দিচ্ছিল, কিন্তু সব সময় একটা ম্রিয়মাণ ভাব। হ্যাঁ অস্ত্রধারী লোক দুটোর দিকে দৃষ্টি পড়েছিল কিন্তু বন্ডের পেছনে ছড়ি হাতে লোকটির আসল উদ্দেশ্য যে এই ছিল তা তারা কল্পনাও করতে পারেনি। ক্যাসিনোর ভেতর যে এরকম ঘটতে পারে এ বিষয়ে কোন ধারণাই ছিল না। লিটার ও তার যাওয়ার পরে এম কেসে প্যারিসে ফোন করে খেলার ফলাফল জানিয়ে দেয়। তিনি অপেক্ষায় থাকবেন।
ভেসপার এটুকু বলে থামল। শ্যাম্পেন খাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু বন্ডের দিকে একবারও তাকিয়ে দেখেনি বন্ডের মুখ। বন্ড ভেসপারের আচরণে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ হচ্ছিল। কিন্তু মুখে কিছু বলল না। রাগে একটু বোধহয় বেশি শ্যাম্পেন পেটে পড়ে গেল। হোটেলের স্টুয়ার্ট ভেসপারের হাতে একটি চিঠি দিয়ে গেল। চিঠিটা পড়া হতেই বন্ডকে সে বলল, ম্যাথিস আমাকে সামনের হলে ডেকে পাঠিয়েছে, আপনার বিষয়ে কিছু তথ্য আছে। ইভিনিং পোশাকে নেই বলে আসতে পারছে না। চলি। ও হ্যাঁ আজকের ব্যবহারের জন্য আমি সত্যিই খুব অনুতপ্ত। আবার দেখা হবে। ভেসপার চলে গেল। বন্ড তখনও বসে রইল কারণ বিল না দিয়ে সে যায় কি করে। স্টুয়ার্ট-বিল আনতে চলে গেল।
নিজেকে এখন যেন খুব ক্লান্ত মনে হল। ভেসপার সঙ্গে থাকলে তাও কিছুটা সময় কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু ও যাবার পরেই ক্লান্তি যেন সর্বশরীর অবশ করে ফেলছে। কিন্তু ম্যাথিসের এই ধরনের ব্যবহার করার কি দরকার ছিল। ম্যাথি এলে তার কাছ থেকে কিছু খবর পাওয়া যেত–বুলগেরিয়ান বা ছড়িহাতে লোকটি বা শিফেরগতিবিধি–কত খবর
কিন্তু হঠাৎ তার মনে হল ম্যাথিস এরকম কাজ করবে না। চিঠি দেবার কোন প্রয়োজনই ছিল না। যে পোশাকেই থাকুক এখানে না আসার কি ছিল। বন্ডের কি মনে হতেই সে হন হন করে চলে এল বাইরের হলে। দু-একজন হোটেলের লোক ছাড়া আর কাউকেই চোখে পড়ল না। ভেসপার বা ম্যাথিস গেল কোথায়? গাড়ীগুলোর দিকে এগিয়ে চলল সে। সব গাড়িগুলো পরীক্ষা করতে লাগল সে। হঠাৎ একটা ক্ষীণ চিৎকার–তারপরেই গাড়ীর দরজা বন্ধ হবার শব্দ।
সুরকির ঝড় বইয়ে চোখের সামনে দিয়ে গাড়িটা বেরিয়ে গেল। খোলা জানলা দিয়ে একটা কালো মত কি যেন একটা ছিটকে পড়ল ফুল গাছগুলোর ওপর। এগিয়ে এসে দেখল ভেসপারের ব্যাগ। ভিতরে হাতড়াতেই বেরিয়ে এল একটা দোমড়ানো কাগজ। তাতে লেখা সামনের হলে কি আসবে? এলে ভাল হত, তোমার সঙ্গীর বিষয়ে অনেক খবর দেওয়ার ছিল। নিচে ম্যথিসের নাম লেখা।
.
পশ্চাদ্ধাবন
–চিঠিটা যে জাল এখন সে বিষয়ে বন্ডের আর কোন সন্দেহ নেই। ভাগ্যিস সে গাড়ি এনেছিল। না আনলে আজ বড় মুশকিলে পড়তে হত। বেন্টলিটার চোখ টানতেই মুহূর্তের মধ্যে ইঞ্জিন গর্জে উঠল। ছোট রাস্তা দিয়ে শব্দ করে তার গাড়ি ছুটে চলল।
উপকূলের দিকে রাস্তা ধরে চলতে লাগল। সুন্দর চওড়া রাস্তা, মোড়গুলোতে আবার আলোর ব্যবস্থা রয়েছে। গাড়ির স্পিড নব্বই মাইলে এসে পৌঁছল।
সিতোটা নিশ্চয়ই এই পথ ধরেই এগিয়েছে। মোড়গুলোতে এখনো ধোয়া আর ধুলো উড়ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হেডলাইটের আলো নজরে পড়বে। গাড়ি আগের থেকে অনেক বেশিই স্পিডেই চলতে লাগল। রাস্তার দিকে চোখ রেখে বন্ডের মনে হচ্ছিল ভেসপারের কথা। ভেসপারের মত মেয়ে কি করে এই বোকামির শিকার হল। এম-খুঁজে খুঁজে আর লোক পায়নি, একে পাঠিয়েছে।
মেয়েদের সঙ্গে কাজ করা মানেই এই রকম বিপদের আশঙ্কা থেকে যায়। এর চেয়ে বাড়িতে বসে থাকলেই পারে। এখানে আসার কি দরকার। ছেলেদের সঙ্গে সমান তালে চলতে হবে, এত তার জানা ব্যাপার। সারাদিনের পরিশ্রমের পর এ কি উটকো ঝামেলা। এ রকম চুরি করা এবং ব্লাকমেলের এই সব ঘটনার দ্বারস্থ হওয়া এগুলো নেহাতই মামুলি ব্যাপার। বুদ্ধির অভাব আছে বলেই এই সামান্য ভুলের শিকার হল, সেই সঙ্গে বন্ডকেও অনর্থক জড়িয়ে ফেলল।
এইসব ভাবতে ভাবতেই গাড়ি চালাচ্ছিল সে। যখন ভাবছে ভেসপারের কথা, তখনই মনটা রাগে বিষিয়ে উঠছে। ওদের মতলবটা ক্রমশ বোঝাই যাচ্ছে। ওরা চাইছে ওদের সঙ্গে একটা সমঝোতায় আসতে। চার কোটি টাকা দাও। পরিবর্তে মেয়েটিকেও আমরা অক্ষত অবস্থায় ফেরত দিচ্ছি। ওরা যদি ভাবে ওদের সাজান নাটকে বন্ডের মন ভুলবে তাহলে ওরা বন্ডকে এখনও চেনেনি। ভেসপার সিক্রেট সার্ভিসের লোক, তার এই সব চাল নোদর্পণে থাকা উচিত। বন্ড এ বিষয়ে এম-এর কাছে কিছুই বলবে না। কারণ ভেসপারের থেকেও তার কাজটা অনেক বেশি জরুরী।
মেয়েটিকে ভাল লাগার এই ফল। তাকে বাঁচাতে ছুটে চলেছে শত্রুদের পেছনে। সত্যি কি বিচিত্র জীবন। কার কপালে যে কি লেখা থাকে কে জানে? এই ছেলে ভুলনোর খেলায় সে নিজেকে কখনই জড়াবে না। সে সব দিক দেখে শুনেই পা ফেলবে। ওদের গাড়িটা ধরার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জানে না কখনও চোখে পড়বে কি না। গাড়িটা নজরে পড়লে দূরত্ব বুঝে সে গুলি চালাবে। গুলির বদলে ওরাও নিশ্চয়ই গুলি চালাবে। গোলাগুলি চলতে চলতে যদি ভেসপারের শরীরে লেগে যায় তার কিছু করার থাকবে না। হোটেলে গিয়ে লম্বা ঘুম। সকালে ম্যাথিসকে পুরো ব্যাপারটা জানিয়ে দেবে, সঙ্গে তার নাম লেখা চিঠিটাও দেখাবে। যদি ল্য শিফ এর মধ্যে বন্ডের সঙ্গে কোন বোঝাঁপড়ায় আসতে চায়, সে কিছু না বলেই তার মনে যা আছে তাই করে যাবে। মেয়েটার ভাগ্যে যা আছে তাই ঘটবে। সে তো তার ভাগ্য বদলাতে পারে। যদি কমিশনার এসে যা দেখেছে তার বৃত্তান্ত বলতে শুরু করে, বন্ড এটা ওটা বলে কাটিয়ে দেবে। বরং এটা বলতে পারে মদ্যপানের মাত্রাটা একটু বেশি হয়েছে বলেই ওর সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিল।
