বন্ডের দুহাতের মাঝখানে টেবিলের সবুজ কাপড়ের ওপর ফেলা হল দুটো তাস। বন্ড এক নজরেই দুটো তাস উল্টে ধরল। নয় ক্রপিয়ের বলে উঠল। ল্য-শিফে তখন চেয়ে আছে তার হাতে ধরে থাকা কালো সাহেবের দিকে।
ল্যশিফ দেখল, সমস্ত চাকতিগুলো আরো হাজার হাজার টাকার সঙ্গে এক হচ্ছে। শিফে কোন কথা না বলে সভাকক্ষ। পরিত্যাগ করল। প্রচুর ধন্যবাদ বন্ডের কানে আসছিল। বন্ড এদিকে কোন কর্ণপাত না করে এগিয়ে চলল ফেলিক্স আর ভেসপারের দিকে। ডিরেক্টরদের ঘরে তার ডাক পড়ল। সব মিলিয়ে তার আজকের মূলধন সাতকোটি ফ্রাঙ্কে ছুঁয়ে গেল। সকলের কাছ থেকেই সে উষ্ণ অভিনন্দনের স্পর্শ পেল। তাকে আবার সন্ধ্যে বেলা খেলতে আসার আমন্ত্রণ জানান হল। বন্ড এর প্রত্যুত্তরে কোন জবাব দিল না। লিটার পকেট থেকে ৪৫ বুলেট বার করে টেবিলে রাখল। তোমার কাণ্ড থেকে আমরা অবাক না হয়ে পরিনি। ছড়িটা দেখার পর বুঝতেই পারছ ম্যাথিক্সদের মনের অবস্থা। বুলেটটা এত শক্তিশালী ছিল যে তোমাকে এমনভাবে পাওয়া যেত কিনা সন্দেহ। কিন্তু মজা দেখ সব ঘটনার মূল কেন্দ্র বিন্দু হল শিফ। তুমিও জান আমিও। মজা দেখ লোকটা যেহেতু একা ঢোকে, সেই জন্য তুমি তাকে সব জেনেও সন্দেহের তালিকায় নিতে পার না। খুব ভেবেচিন্তে পদক্ষেপ ফেলেছে ওরা। ওর হাতের ছাপ প্যারিসে পাঠান হয়েছে। সকালের মধ্যে কোন খবর আসবে মনে হয়।
তবু একটাই সান্ত্বনা, শুরু তোমার খারাপ হলেও শেষ তোমার ভালই হয়েছে। ল্য-শিফ তোমাকে এত সহজে ভুলতে পারবে বলে মনে হয় না।
বন্ড একটু মুচকি হাসি হাসল। এই হাসি কিছুক্ষণ আগেও কত নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল। সত্যি খামটা সময়ে পেয়ে আমার খুব উপকার হয়েছে। না হলে সব কিছু হারিয়ে সর্বশ্রান্ত হয়ে বসেছিলাম আমি। অসময়ে যে পাশে আসে সেই তো প্রকৃত বন্ধু–কি বল লিটার। আমি তার কাছে চিরদিনের জন্য ঋণী হয়ে থাকব।
চল লিটার, অনেকক্ষণ তো হল এবার হোটেল ফেরা যাক। এখন একটু শ্যাম্পেন হলে মন্দ হয় না কি বলেন? ভেসপার ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানায়। কিন্তু তার আগে একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হতে হবে। শরীরটা বড়ই ক্লান্ত ঠেকছে। আপনি আগে টাকাগুলো হোটেলে রেখে আসুন। তারপর রোয়াগালাস্ত যাওয়া যাবে।
ফেলিক্সকে যাবার কথা বলল বটে কিন্তু ভেসপারকে সে একাই পেতে চাইছিল। ফেলিক্স বন্ডের মুখের দিকে তাকিয়ে তার বাসনা আঁচ করে নেয়। সে বলে প্যারিস থেকে নানারকম কাজের ফিরিস্তি দিয়ে পাঠিয়েছে। সে গুলোতে এখনও হাতই পড়েনি। চল, বন্ড তোমাকে হোটেলে পৌঁছে দিয়ে আসি। তোমার একা যাওয়া একটুও নিরাপদ নয়। আজকে ধনরত্নের ভাণ্ডার জাহাজে সবাই উঠতে চাইবে।
তারা সরে এসে দেখল–অভ্যর্থনার জন্য কেউ এখানে উপস্থিত নেই। বন্ড, তোমার যদি কোন আপত্তি না থাকে। আমি তোমার সঙ্গে থাকতে পারি। বন্ড ফেলিক্সকে আশ্বস্ত করে বলল, তুমি শুধু শুধু ভয় পাচ্ছ, সঙ্গে পয়সা না থাকলে ওরা আমায় রেখে কি করবে। তুমি বরং ঘুমোও, সারাদিন যা ধকল গেল।
বন্ড ঘরের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। এখন অনেকটা সে স্বস্তিবোধ করছে। মানসিক উদ্বেগ আর নেই। মাথার পেছনে তার ডান কাঁধটা বেশ ব্যথা ব্যথা করছে। দুবার সে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে। এখন আর শত্রুর প্রতীক্ষায় থাকতে মন চাইছে না।
এবার সে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। অনেকক্ষণ ধরে নিজেকে নিরীক্ষণ করল সে। হঠাৎ ভেসপারের মুখটি আয়নায় ভেসে উঠল। তাকে যত দেখছে তার প্রতি প্রবল আকর্ষণ ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। আবেগহীন নীল চোখ দুটির দিকে চোখ পড়লেই বন্ডের মন চায় ঐ চোখে পানি আনতে। এইসব ভাবতে ভাবতেই সে ঘর ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। পকেটে একবার হাত বুলিয়ে দেখে নিল চেকটা সঙ্গে নিয়েছে কিনা। বারান্দায় চাঁদের আলো এসে পড়েছে। আলা পড়তে বারান্দাটা আজ বড় বেশি শূন্য মনে হচ্ছে। কারো পদধ্বনি এসে পৌঁছল না বন্ডের কাছে।
.
লা ভি আঁ রোজ
একটি সাতফুট উঁচু সোনালী ফ্রেমের মধ্যে দিয়ে রোয়া গালান্তের শুরু। গোটা কতক টেবিলে তখনও জুয়ার আসর চলছে। বন্ড অতি কষ্টে লোভ সংবরণ করল। যে রকম সৌভাগ্য আজ তার ভাগ্যে জুটেছে এর পর আবার আসরে বসা মানে নিজের সম্মান নষ্ট করা। সোনালি ধাপ দিয়ে যেতে যেতে বারবার ভেসপারের হাতের স্পর্শ পাচ্ছিল বন্ড।
নাইট ক্লাবটি ঘোট। ঝড়ের মোমবাতির আলো জ্বলছে। দেওয়ালে সোনালি ফ্রেমের আয়না। দেওয়ালে গাঢ় নীল সার্টিন, সেই রঙের সঙ্গে তাল রেখে মোড়া ও আসবাবপত্রও সেই রঙের করা হয়েছে। এক কোণে পিয়ানো, ড্রামে বেজে চলেছে লা ভি আঁ রোজের মাদক সুর। সব মিলিয়ে এখানকার পরিবেশ এক অদ্ভুত মদিরতা বহন করে চলেছে।
দরজার কাছের টেবিলে বসার জায়গা পেল ওরা। দুজনেই চুপচাপ বসে বাজনা শুনতে লাগল। নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে বন্ড বলল, এতক্ষণ তোমার পাশে বসার সুযোগ পেয়েছি আমি। সারাদিনের পরিশ্রম বৃথা যায়নি, যার ফলস্বরূপ তোমার সান্নিধ্য।
ভেসপার বন্ডের কথায় সায় দিল। বন্ড ভেবেছিল ভেসপার হাসবে। কিন্তু সে বাজনাই শুনে যেতে লাগল। পরম নিশ্চিন্তে সিগারেট খেয়ে যাচ্ছে বন্ড। মেয়েটির সমস্ত সত্তা তখন বন্ডের মনে জুড়ে বসে আছে, তাই কোন সূক্ষ্ম জিনিসই তার নজর এড়াচ্ছে না। সে চাইছে মেয়েটি তার ডাকে সাড়া দিক। কিন্তু আজ সে বড় বেশি গম্ভীর। শীতল তার চাউনি। সে কি বুঝতে পেরেছে বন্ডের মনের বাসনা? তাই সে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে চাইছে?
