ফেলিক্স আর ভেসপার নিজেদের মধ্যে কথা বলতে ব্যস্ত। ম্যাথিস নেই, নেই তার সঙ্গী সাথীরা, তারা বুঝতেও পারছে না এখানে কি ঘটে যেতে চলেছে। কিন্তু বন্ডও ভাবল এত সহজে সে কখনও পরাজয় মেনে নেবে না। একটা কিছু তার করা দরকার। ক্রপিয়ারের নোট গোনা শেষে হয়েছে। এবার সে ব্যাংকারের অনুমতি নিয়ে খেলা শুরু করে দেবে। এই সুযোগ সে দুটো হাত দিয়ে খুব শক্ত করে চেপে ধরল টেবিলটি–তারপর সমস্ত শক্তি এক করে পেছনে এক ধাক্কা দিল। যার ফলে চেয়ার গিয়ে আছড়ে পড়ল বেতের ছড়িটার ওপর। লোকটার হাত থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেল ছড়িটা।
বন্ড দর্শকের সামনে এমনভাবে নিজেকে উপস্থিত করল যাতে করে দর্শক একবারের জন্যও ভাবতে পারল না এটা তার অভিনয়। চেয়ারটা একদিকে ভেঙে পড়ে আছে। প্রথমে উপস্থিত দর্শকগণ এই ঘটনায় খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল, পরে তাদের এই ঘোর কেটে যেতে বেশিক্ষণ সময় লাগেনি।
তারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল বন্ডের দিকে। শেফদ্যপর্টি, পরিচারক সবাই এগিয়ে এল যাতে কোন রকম বিশ্রী ঘটনার সম্মুখীন হতে না হয়।
রেলিং ধরে বন্ড কোন মতে উঠে দাঁড়াল। সে এই ব্যাপারের জন্য সত্যি খুব অপ্রস্তুত। সে এমন ভান করতে লাগল যেন গরমে, উত্তেজনায় সে নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি তার ফলস্বরূপ এই বিপত্তি। সকলেই তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করল। আরো বলল, মসিয়ো, আপনি কি একটু বিশ্রাম নিয়ে নেবেন?
বন্ড সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, না না এসবের কোন প্রয়োজন হবে না, সে এখন শারীরিক ও মানসিক দুই দিক থেকেই সম্পূর্ণরূপে সুস্থ। সে করজোড়ে তার এই অবস্থার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিল। নতুন চেয়ার এল। এবার তাকাল শিফের দিকে। তার সারা মুখে বিরাজ করছে নিদারুন এক আতঙ্ক। কিন্তু বন্ড যেন নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না– কারণ নতুন জীবন ফিরে পাবার আনন্দ সে ছাড়া আর কেই বা বুঝবে।
সারা টেবিল জুড়ে সকলের কাছেই আলোচনার একটাই বিষয় এখন বন্ড। রাত প্রায় শেষের দিকে, সকাল হতে বোধহয় আর বেশি দেরি নেই।
বন্ড সকলের কথাতেই সায় দিয়ে চলেছে। সে দর্শকদের আসনে খুঁজতে লাগল রক্ষীটাকে। না নেই–সম্ভবত সভাকক্ষ ছেড়ে পলায়ন করেছে। পরিচারকের হাতে ধরা রয়েছে বেতের ছড়িটি। ছড়ির মালিকের আশায় বসে আছে।
বন্ড ফেলিক্সকে দেখিয়ে বলল, ছড়ির মালিকের সঙ্গে ওর ভালই সম্পর্ক। অতএব ফেলিক্সে দেওয়াকে মানে-তার হাতে ছড়িটা তুলে দেওয়া। ফেলিক্স ছড়িটা একবার ভাল করে পরীক্ষা করলেই তার কাছে বন্ডের এই সব রহস্যের গিট আপনা হতেই দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়ে যাবে।
.
ভালবাসা ও ঘৃণা
ঘোষণা শেষ হল। জমা পড়েছে তিন কোটি কুড়ি লক্ষ। দর্শকরা আকুল নয়নে চেয়ে রয়েছে এই দুই খেলুড়েদের দিকে। বন্ডকে এখন অনেক বেশি তাজা লাগছে। অলৌকিক হারের মুখে মুখ থুবড়ে পড়েও ভাগ্যের জোরে সে এখনও বসে আছে খেলার অপেক্ষায়। চেয়ার উল্টে যে ভাবে সে নিজেকে আজ বাঁচিয়েছে, তাতে এই হারের তিক্ত অভিজ্ঞতা ও তার মনের গ্লানি একেবারে ধুয়ে মুছে গেছে।
দশ মিনিটের জন্য বিরতি। ক্যাসিনোর ইতিহাসে এমন ঘটনা কখনও ঘটেছে বলে মনে হয় না। এই ঘটনার পর তাকে আজ বড় বেশি বেমানান লাগছে এখানে। খাপের মধ্যে তাসগুলো তার দিকেই চেয়ে আছে। এবার তাকে জিততেই হবে। ভাল তাস তাকে তুলতেই হবে। বর্তমানকে পেছনে ফেলে ভবিষ্যতে যেতে তার এখন গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
ঘড়ির কাঁটায় রাত দুটো। বাকরার টেবিলেই বেশি ভীড়। এখানে কারো মুখেই কোন কথা নেই। তার কানে ভেসে আসছে ক্রপিয়ের গলা, সে দূরের কোন এক টেবিলে কি ইঙ্গিত করছে? তাদের দুজনের মধ্যে একজনের গলায় আজ পৌঁছে যাবে বিজয়মাল্য।
টেবিলের ওদিকে ল্য-শিফ। কিছুই জানে না এমন এক ভান করে বসে আছে। তাসগুলো তার দিকে এগিয়ে আসতেই সে দুটো তাস তুলে নিল। সমস্ত শরীর শক্ত করে নিজেকে ধরে রেখেছে সে, একবার বিচলিত হলেই সমস্ত পরিশ্রম আজ পানি হয়ে যাবে। তাস দুটো ওলটাল। দুটোই লাল বিবি-যার কোন মূল্য নেই। ~~~ …।
ব্যাংকারের হাত রয়েছে একটা সাহেব আর একটা কালো বিবি। নিঃশ্চিন্তে ধোয়া ছাড়ল। এখনও সুযোগ আছে। ল্য-শিফের হাতে উঠল, নয়-হরতনের নহলা। এককথায় নিজের চোখকেই আজ বিশ্বাস করতে পারছে না। বন্ডের জয় আজ অনিবার্য। হাতে তিন থাকা সত্ত্বেও নয় আসা মানে এক কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হওয়া। বন্ধু স্থানীয় হলে সে তাকে সাহায্যই করত। কিন্তু এক্ষেত্রে একথা মাথায় আনাও পাপ। এখন সব কিছু নির্ভর করছে এই বাকি দুটো তাসের ওপর দুই বিবি, যারা মুখ আড়াল করে রেখেছেন। তাস ওলটান-পাঁচ।
ব্যাংকরের আট হল ক্রপিয়ের জানন দিয়ে দিল। বন্ডের এরকম চুপচাপ বসে থাকা দেখে, শিফের মুখে প্রাণখোলা কুটিল হাসি দেখা দিল। এবার বন্ডের পালা। সবাই তখন ধরেই নিয়েছে বন্ড আজ পরাজিত। কাঠের হাত দিয়ে তাস উল্টে দিল–নয় দুই রানী হেসে উঠলেন। শিফের চেহারা আজ দেখার মতন। বুকে বড় বেশি ব্যথা পেয়েছেন। চাকতির পাহাড় বন্ডের দিকে এগিয়ে এল। ব্যাংকার ছুঁড়ে দিয়েছে টেবিলের ওপর একতাড়া নোটের বান্ডিল।
জমাপড়ল এক কোটি-সমপরিমাণ টাকার চাকাতি টেবিলে রাখা হল। লোকটার আর ফেরার পথ নেই। পড়তে হলে এখানেই মুখ থুবড়ে পড়তে হবে। একঘণ্টার আগের আমার অবস্থাই এ যেন ওর কাছে ফিরে এসেছে। কিন্তু আমার মত কোণ অলৌকিক কিছু ঘটবে না শিফের ভাগ্যে।
