তাদের টেবিল ঘিরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজমান। কিন্তু আশেপাশের টেবিলগুলো তাদের থেকে অনেক বেশি সক্রিয়।
একটা নাগাদ তাদের খেলা এক নতুন মোড় নিল।
২ নম্বরের গ্রীক লোকটির অবস্থা তখন খুবই সঙ্কটজনক।
২ নম্বরে কারমেল ডিলেনি পাস দিল, ৩ নম্বরে লেডি ডানভার্সও ঐ একই ব্যাপার করলেন।
ডুপন্ট দম্পত্তি ব্যাংকারের আটের কাছে পরাজিত হলেন।
জমা পড়ল মোট চল্লিশ লক্ষ।
বন্ড পুনরায় একতাড়া নোট বার করল।
এক নজরে একবার সে তাসটা দেখে নিল।
না। মাত্র পাঁচ। সত্যিই অবস্থা একেবারে চরমে উঠেছে। বন্ডের তাসগুলো উল্টে দিল পিয়ের।
আশি-লক্ষ জমা পড়ল।
বন্ডের আবার হার।
গত দুটো খেলায় সে এক কোটি কুড়ি লক্ষ ফ্রাঙ্ক খুইয়েছে। হাতে আছে মাত্র এক কোটি ষাটলক্ষ। যা কোন মতে কাজ চালান যায়।
বন্ডের চোখের সামনে তার মূলধন প্রায় নিঃশেষ হয়ে যেতে থাকল। কিন্তু শিফে পরম বিশ্বাসে খেলে যাচ্ছে। তার এমন অসহায় অবস্থা আগে বোধহয় কোনদিন হয়নি। গাল তার শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। পকেট থেকে টাকা আর চাকতি সে বার করে দিল। কেউ জানতেও পারল না এই তার শেষ বাজি।
তাকিয়ে দেখল সামনে দাঁড়িয়ে ফেলিক্স আর ভেসপার। শিফের দেহরক্ষীরা ঐ জায়গায় আর নেই। ভেসপার একটু মুচকি হাসি হাসল।
ল্য-শিফ পেল বিবি আর একটা কালো পাঁচ। বন্ডের দিকে তাকিয়ে সে আরও একটা ধীর হস্তে তাস তুলল। সবাই নির্বাক পুতুলের মত বসে। তার যখন ছয়, শিফের পাঁচ। এখন ব্যাংকারের করণীয় হল যে কোন একটি তাস তোলা যেগুলো অবশ্যই এক, দুই, তিন অথবা চার হওয়া চাই। অন্য তাস উঠলেই তার পরাজয় নিশ্চিত।
এই অবস্থায় বন্ডের জেতার সম্ভাবনা অনেক বেশি। ল্য-শিফ তাস তুলল চার–এর থেকে ভাল তাস আর বুঝি হয় না। আজ সে সর্বদিক থেকে সর্বশ্রান্ত হয়ে পড়ল।
.
প্রাণঘাতী টিউব
কিছুক্ষণের জন্য বস্তু স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। একটা সিগারেট ধরাল। এখন তার কাজ হোটেলে ফিরে যাওয়া। পরের দিন প্লেন ধরা। এই সব চিন্তা করে আর কি লাভ। পরের বার যেন এই রকম না হয় তার চেষ্টাই করতে হবে।
কিছুক্ষণ আগেও উৎসুক জনতাকে দেখেছে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে। কিন্তু এখন এক ভিন্ন পরিস্থিতি। এখন এমন একজনও সাহসী ব্যক্তি আছেন কি যিনি তিন কোটি কুড়ি লক্ষ ফ্রাঙ্ককে চ্যালেঞ্জ জানাবেন?
লিটার নেই কিন্তু ভেসপার এখনও তার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। মুখে সেই মধুর হাসি। ও খেলার কিছু বোঝে না, বুঝলে দেখতে বউ কি শোচনীয় পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে।
এই সময় পরিচারক এসে বন্ডের হাতে একটা খাম দিয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে খামটা ছিঁড়তেই-খামের মধ্যে বেরিয়ে এল একতাড়া নোটের বান্ডিল। একটুকরো কাগজে লেখা মার্শাল এড। তিন কোটি কুড়ি লক্ষ ফ্রাঙ্ক। যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে এই শুভেচ্ছা।
বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনি বন্ডের। তাকিয়ে দেখে ফেলিক্স এসে গেছে। পাশে ভেসপার–ঠোঁটে তার সেই পুরোনো হাসি। নতুন করে খেলার জন্য সে মনকে প্রস্তুত করতে লাগল। এই সুযোগ ওকে কাজে লাগাতে হবে।
টেবিলের মধ্যে বাজির টাকা জমা হতে শুরু করেছে। টেবিলের উপর রয়েছে তিনকোটি কুড়িল ফ্রাঙ্ক। বন্ডের মনে হল শিফের আর অল্প কিছু এসে গেলেই সে টেবিল পরিত্যাগ করবে। তার সব আর্থিক অনটন বন্ধ হয়ে যাবে। তার পরিবর্তে পুনরায় সম্মান ফিরে আসবে। কিন্তু শিফের কোন ওঠার আগ্রহই নেই। এখন একমাত্র উপায় সব টাকার ওপর বাজি ধরা। শিফ একবার যদি ঘুণাক্ষরে জানতে পারত তবে এত টাকা সরিয়ে রেখে আবার পাঁচ লক্ষ ফ্রাঙ্ক। থেকে খেলা শুরু করত। ক্রপিয়ের খুব জোর গলায় ঘোষণা করতে থাকল। যাতে করে আসপাশের কাছ থেকে লোকেদের এখানে বসান যায়। বাকরার ইতিহাসে এত টাকার বাজি কখনো ধরা হয়নি।
ল্যশিফের ক্যাসিনোতে এত উচ্চমূল্যের বাজি কখনও ওঠেনি। বন্ড খেলা চলার সম্মতি দিল। চারিদিকে এই খবর পৌঁছে গেল। লোকজনের ভিড় ক্রমেই বাড়তে থাকল। এমনও অনেক লোক আছে যারা সারা জীবনে এত টাকা রোজগারের কথা ভাবতে পারে না।
ক্যাসিনোর একজন ডিরেক্টর শেফ দ্য পার্টির সঙ্গে নিজেকের মধ্যে সব আলোচনা সেরে নিল। শেফ দ্য পার্টি বন্ডের দিকে ফিরে বললেন, আমি খুবই লজ্জিত, কিছু মনে না করে, মসিয়ো আপনি কি বলবেন কত পড়েছে আপনার? বন্ড যে খুবই বিত্ত্ববান তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু তিন কোটি কুড়ি লক্ষ ফ্রাঙ্ক–কোন কম অংকের ব্যাপার নয়। এমন অনেক সময়ে হয়েছে যে সঙ্গে টাকা নেই কিন্তু ঝোঁকের মাথায় বাজি ফেলেছে। হেরে গেলে তাকে জেল দেওয়া হয়েছে। বন্ড আর কথা না বাড়িয়ে নোটের তাড়াটা টেবিলের উপর রাখল। ক্রপিয়ের টাকা গুনতে শুরু করেছিল।
শিফের সঙ্গে তার রক্ষীর দৃষ্টি বিনিময় হতেই বন্ড অনুভব করল তার শিরদাঁড়ার কাছে শক্তমত কি ঠেকল। ডান কানের কাছে কে মুখ নিয়ে এসে বলল এখন সাবধান হোন মসিয়ো, আমার হাত ধরা আছে চিরকালের সাথী আপনার শিরদাঁড়া উড়িয়ে দেবে নিঃশব্দে। দশ বলার আগে আপনার বাজি ফিরিয়ে নিন, লোক জড়ো করলেও আপনার রেহাই নেই।
লোকটার উচ্চারণ শুনে মনে হয় সে দক্ষিণ অঞ্চলের। এরা কখনই কথার খেলাপ করে না। এদের কাছে কথার দাম খুব বেশি। এখন সব পানির মত পরিষ্কার। বোঝা যাচ্ছে মোটা জুড়ির অর্থ। ব্যারেলের মধ্যে এমনভাবে রবারের আস্তরণ পরান থাকে যাতে শব্দ হয় না, কিন্তু নিঃশব্দে কাজ হয়ে যায়। টেবিলের ওপারে ল্য-শিফ তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে। সে গভীর প্রতীক্ষায় বসে আছে বন্ড কতক্ষণে তার পরাজয় স্বীকার করবে।
