৮ নম্বরে আছেন ভারতীয় মহারাজা। এশিয়ার লোকদের মধ্যে জুয়াড়ী মনোভাব একেবারেই থাকে না। তবে লোকসানের মুখ যদি ধীরে ধীরে দেখেন, তবে টিকেও যেতে পারেন।
১০ নম্বরে আছেন একজন কম বয়সী ইতালিয়ান। মিলানে অনেক বস্তি আছে, যেখান থেকে ভাড়া উঠে আসে। এই খেলায় আসা তার একদমই উচিত হয়নি। ঝোঁকের মাথায় বাজি ধরে ফেলবে, তারপর চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘর ভরিয়ে তুলবে। সবার সম্বন্ধে মনে মনে সে এক ছক কষে নিল। নিঃশব্দ গতিতে প্রবেশ ঘটল ল্যশিফের। সকলের সঙ্গে মধুর সম্ভাষণ বিনিময় করল।
খেলা শুরু হল। জমা পড়েছে পাঁচলক্ষ। গ্রীক লোকটি তার টাকার চাকতিগুলো সামনে টোকা দিতেই, জমা নেওয়া পর্ব শেষ হল।
প্রথমে ল্য শিফ তাসগুলো ঠিক করে নিল। ক্রপিয়ার একটা চামচের মত জিনিস দিয়ে তাস আলগোছে এগিয়ে দিল গ্রীক লোকটির উদ্দেশ্যে। ভাবলেশহীন মুখ। বাঁ হাত দিয়ে তাস দুটো তুলে নিল। একটু আড়াল করে দেখে নিল তাস দুটোর চেহারা। ল্যাশিফের দিকে সে উচ্চারণ করল না।
গ্রীক লোকটি নির্বিকার চিত্তে বসে রইল। অন্য কোন তাস সে চাইল না। তার অর্থ দাঁড়ায় যে পাঁচতে নয়-ছক্কা নয়-সাত তার ভাগে জুটেছে। জিততে হলে ব্যাংকারকে আট বা নহলা দেখাতে হবে। তা না হলে তাকে আরও একটা তাস তুলতে হবে। ফল স্বরূপ সে তার ভাগ্য খুলে যাবে একথাও নিশ্চিত রূপে বলা যায় না। ল্যশিফ মুঠো করে হাতের তাস দুটো উল্টে দিল। চৌকা-পাততো। এবার জিত ল্যশিফের।
গ্রীক লোকটা পাঁচটা চাকতি এগিয়ে দিল। প্রত্যেকটা এক লক্ষ্যের। ল্যশিফের পাঁচ লক্ষের সঙ্গে এগুলো যোগ হল। প্রত্যেক বাজির খেলা থেকে একটা শতাংশ ক্যাসিনোয় আসে। ব্যাংকার নিজে এটা আলাদা ভাবে সরিয়ে রাখে। খেলা তখনও চলছে। আসল খেলা জমেছে।
টাকার বাক্সে গুটি ফেলে কুপিয়ের ঘোষণা করল, ১০ লক্ষ জমা হল।
খেলা চলুক–বলল গ্রীকটি।
এইভাবে চলতে থাকবে যতক্ষণ না ভীতুর দল রণক্ষেত্র পরিত্যাগ করে।
গ্রীকটি তৃতীয় তাস টানল। এখানেও তার কোন লাভ হল না। ব্যাংকারের সাতের বিরুদ্ধে তার উঠল চার।
কুড়ি লক্ষ জমা হল চেঁচিয়ে বলল ক্রুপিয়ের।
বন্ডের পাশের লোকেরা তখন একেবারেই চুপসে গেছে।
আমি আছি বলেই বন্ড বসে পড়ল।
.
সত্যের মুখোমুখি
বন্ডের এই উক্তি শুনে ল্যশিফ তার দিকে না তাকিয়ে পারল না। চোখের মনির সাদা অংশটা এমনভাবে বেরিয়ে থাকে শিফের, তাতে তার চেহারায় একটা সব সময় নির্বিকার পুতুল পুতুল ভাব ফুটে ওঠে।
জ্যাকেটের পকেট থেকে বার করল ছোট একটা সিলিন্ডার। নাকে ঢুকিয়ে পরম তৃপ্তির সঙ্গে সে নিঃশ্বাস নিল। ল্যশিফ যখন তার এই কাজে ব্যস্ত তখন বন্ড স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চেহারাটা এমনই যে তাকে অনেকেই মানুষ না বলে ভুল করতে পারে।
না শুনেই এক তাড়া নোটের বান্ডিল বন্ড টেবিলের উপর রাখল। বন্ড বুঝিয়ে দিতে চাইল প্রচুর অর্থ নিয়ে সে আজ ময়দানে নেমেছে। বাকি ভদ্রমহোদয়গণ অনুমান করতে পারছিল যে দুর্জনের মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াই শুরু হতে চলেছে। ল্যশিফ চারটে তাস বার করল। বন্ডের দিকে তাস এগিয়ে দিল পিয়ের। বন্ড তখনও স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে শিফের। দিকে। এক নজর তাসগুলো দেখে সে উল্টে দিল তাস দুটো।
চার আর পাঁচ–অর্থাৎ নয়। সব থেকে বড় সংখ্যা।
রুদ্ধশ্বাসে সবই খেলা দেখছে। সকলের মনে একটাই প্রশ্ন ২০ লক্ষের বাজি ছেড়ে দেবার কি প্রয়োজন ছিল।
শিফ তাস দুটো দেখল একবার। দুটোই গোলাম। দুটো তাসই পাশে সরিয়ে রাখল। বাকারা বলে নোটের তাড়াটা বন্ডের দিকে এগিয়ে ধরল ক্রপিয়ের। প্রথম বারেই এভাবে জয় আসবে, সে একবারও ভাবতে পারেনি।
পাশেই বসে থাকে, মিসেস ডুপন্টের মুখে করুণ হাসি। তিনি অতি কষ্টে বললেন, আমি আপনার কাছে ডাকটা পৌঁছে দিলাম। তাস দেওয়া হতেই আমার ভীষণ আফসোস লাগছিল।
খেলা শুরু হয়েছে সবে মাত্র। এর পরের বার-আপনি হয়ত অনেক বেশি ভাল পাস দেবেন–বন্ডের জবাব। মিঃ ডুপন্ট স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ভুল ত্রুটিতো এই খেলার নিত্যসঙ্গী। তাহলে আমরা এখানে একত্র হয়েছি কেন?
বন্ড এবার দর্শকদের দিকে দৃষ্টি ফেরাল। প্রথমেই দৃষ্টি পড়ল রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ল্যশিফের দুই দেহরক্ষীর দিকে। প্রথমজনের বীভৎস চেহারা, জ্বলজ্বলে দুটি চোখ–দেখে পরিষ্কার বোঝা যায় তারা অনেক ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে আছে, খেলা দেখতে তারা আসেনি। রেলিঙের এ প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত বার বার পায়চারি করছে। দেখে মনে হয় এরা। অকারণে কোন মানুষকে ধরাশায়ী করতে পিছপা হবে না।
অন্য লোকটা ঠিক তার বিপরীত। বেঁটে, কালো, চ্যাপ্টা মাথা। সম্ভবত পায়ে কোন অসুবিধে আছে, তাই সঙ্গে রেখেছে বেতের ছড়ি। ক্যাসিনোর ভেতর লাঠি হাতে প্রবেশ নিষেধ। এর জন্য লোকটিকে নিশ্চয়ই বিশেষ অনুমতি নিতে হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কিছু না ঘটলেও খেলা চলাকালীন ব্যাংকারের ভাগ্য আজ তেমন ভাল যাচ্ছে না। দুঘণ্টায় এক কোটি ফ্রাঙ্ক লোকসান। গত দুদিনে ল্যশিফের লাভ আশা করা যায় পঞ্চাশ লক্ষে পৌঁছে গেছে। রাত একটা নাগাদ বন্ডের মূলধনের পরিমাণ দাঁড়াল দুকোটি আশি লক্ষে।
বন্ড আজ প্রতিটি খেলায় পদক্ষেপ ফেলছে খুব সাবধানে। লাভের পরিমাণ তার একার পক্ষে যথেষ্ট। শিফের মুখে দেখে তার কোন প্রতিক্রিয়া বোঝার উপায় নেই। সে যেন এক কলের পুতুল। নতুন ব্যাংক শুরুর পূর্বে ক্রপিয়ারকে কিছু নির্দেশ দিচ্ছে খুব চাপাস্বরে।
