বারে যেতে সবে সিঁড়িতে পা দিয়েছে, লিফটের দরজা খুলে গেল। ঠাণ্ডা গলায় নারীকণ্ঠস্বর, গুডইভনিং।
লিফট থেকে বেরিয়ে মেয়েটি ওখানেই দাঁড়িয়ে পড়েছে। তার রূপের মোহজালে সে আটকা পড়েছে। এইবার সামনে দেখেই সে উত্তেজিত হল।
কালো ভেলভেটের বাহুল্য বর্জিত নিখুঁত পোশাক। সত্যি এরকম দোকান যে কটা আছে তা বোধহয় হাতে গুণেই বলা যায়। সরু হীরের নেকলেস, কাটা গলার ঠিক শুরুর জায়গায় হীরের ক্লিপ আঁটা। কাঁধে কালো ব্যাগ, কোমরের কাছটা ধরা। কালো সোজাচুল, টিপটা সামান্য গোল হয়ে গেছে। এত চমৎকার রূপ যে কারো হতে পারে না দেখে। ভাবা যায় না। তার দিক থেকে চোখ সরান মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। বন্ডের মধ্যে এক অজানা ধুকপুকুনি শুরু হয়ে গেছে। বাঃ ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে আপনাকে। রেডিওর ব্যবসা ভালই চলছে আশা করি। বন্ডের হাত ধরে মেয়েটি তাকে সোজা। নিয়ে চলল সামনের দিকে অর্থাৎ খাওয়ার আসরে। সমারোহের সঙ্গে দুজনে প্রবেশ করল। আসলে কি জানেন? কালো ভেলভেটে বসলেই দাগ হয়ে যায়। আজ রাত্রে কোন এক সময় যদি আমার আর্তনাদ কানে যায়, তখনই বুঝবেন। আমি বেতের চেয়ারে আসন গ্রহণ করেছি।
বন্ড মেয়েটির কথায় হেসে ওঠে। চলুন, যতক্ষণ না খাবার আসছে ততক্ষণ আমরা ভডকা খাই, অবশ্য ককটেলও চলতে পারে অবশ্য। আপনার যদি কোন আপত্তি না থাকে। এখানকার খাবার রয়্যালের মধ্যে সবচেয়ে নাম করা।
বন্ডের মনে হল মেয়েটি চট করে পানীয়ের নামটা বদলাল, এই ব্যাপারটা ধরা পড়ে গেছে। কিন্তু সে কেবল মুহূর্তের জন্য। হোটেলের বাটলার নীচু হয়ে তাদের অভিবাদন জানায়। ভিড় ঠেলে তারা ভেতরে এল। সকলে ঘাড়ফিরিয়ে বন্ড ও তার সঙ্গিনীকে দেখতে লাগল। আগের চেয়ে বন্ড এখন অনেক বেশি স্বাছন্দ্য বোধ করছে।
রেস্টুরেন্টের যে অংশে ক্যানের দিকে এসে মিশেছে সেখানেই থিকথিকে ফ্যাশানেবল লোকদের ভিড়। বন্ড ভিড়ের দিকে না গিয়ে পিছনে আয়না লাগানো বারান্দার মত অনেকটা, নিভৃত নিরিবিলিতে গিয়ে বসল। সোনালী মেশানো দেওয়াল আর আসবাব সব মিলিয়ে যথেষ্ট পরিচ্ছন্ন ও ঝকঝকে।
কি খাবেন?
এক গ্লাস শুধু ভডকা, মেয়েটি এইটুকু বলেই মেনুর দিকে দৃষ্টি দিল।
বন্ড লোকটিকে বলল, ছোট হলেও ভডকা ঠাণ্ডা হওয়া চাই।
দেখুন তো আমি এত কথা বলছি কিন্তু আপনার নামটাই জানা হয়নি। আপনার নামটা না জানা পর্যন্ত আপনার চমৎকার পোশাকের সামনে স্বাস্থ্য পান করা যাচ্ছে না।
ভেমপার লিন্ড, ভেসপার।
আমার নামটা বড় অদ্ভুত। আমার জন্ম এক ঝোড়ো সন্ধ্যায়, বাবার কাছ থেকে তাই শুনেছি আমি। ঐ সন্ধ্যাটির কথা স্মরণ রেখেই আমার এই নামকরণ। নামটা কেউ পছন্দ করে, আবার কেউ পছন্দ করে না। আমার এখন অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে।
নামটা সত্যিই সুন্দর। আচ্ছা আপনার নামটা আমায় ধার দেবেন? বন্ড ভেসপারকে বুঝিয়ে দিল মার্টিনির ফরমুলার কথা। ড্রিংকের একটা নাম চাই। ভেসপার, সত্যিই দারুণ হবে। সে সব পৃথিবীর মানুষ আমার এই ককটেলের স্বাদ গ্রহণ করবে, সেই সময়কে ধরে রাখার উপযুক্ত এই নাম। আপনি কি দিতে রাজি আছেন?
প্রথম ড্রিংকটা আমি আগে চেখে দেখব। বর্ণনা শুনে আমারই লোভ হচ্ছে।
এই সব ঝামেলার সমাধান হয়ে গেলে একসঙ্গে একদিন খাব। ফলাফল ভাল বা মন্দ যাই হোক না কেন।
আচ্ছা এবার খাবারের কথা বলি। কিছু কি ঠিক করেছেন? খুব দামী হওয়া চাই কিন্তু, দেখুন আপনার ইতস্তত হওয়ার কোন কারণ নেই। না হলে, আপনার অপূর্ব পোশাকের অমর্যাদা করা হবে ভেসপার।
মেয়েটি বলল আমি দুটোই দারুন জিনিস বেছেছি। মাঝে মাঝে লক্ষপতি সাজতে বেশ ভালই লাগে, বিশেষ করে যদি প্রথমে ক্যাভিয়ার দিয়ে শুরু করা যায়। পরে গ্রিলড রোগন দভো, সঙ্গে নোপ সুফল। আরো পরে ফ্রেজ ছিবোয়া ক্রিম দিয়ে। দেখুন আমি কি রকম বেহায়াপনা করছি।
আপনি বেহায়া হতে যাবেন কেন? দামী খাবারের অর্ডার, এই গুণটাই বা কজনের থাকে। তাছাড়া এগুলো স্বাস্থ্যের পক্ষেও ভাল।
আপনার অনুমতি পেলে আমি আজ রাতে শ্যাম্পেন খেতে চাই। আজকের পক্ষে এটাই উপযোগী।
হা। আমারও শ্যাম্পেন চলবে।
বন্ড আঙুল তুলে নামটা দেখাল। পরিচারক বলল, সিয়ো খুব ভাল ওয়াইন বেছেছেন। ব্লা ছ ব্লা ব্রাট ১৯৪৩। বন্ডের মুখে মৃদুহাসি। এটা আনতেই সে অনুমতি দিল। এই ব্রান্ডটা খুব দামী না হলেও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শ্যাম্পেন হিসেবে সম্মান পেতে পারে। বন্ড নিজের এই কথায় নিজেই হেসে উঠল।
কিছু মনে করবেন না। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আমি বরাবরই শৌখিন। একা থাকি। একলাই খেতে হয়। এইসব করে খাওয়ার মধ্যে একটু বৈচিত্র আনা আর কি। মৃদু হাসি ভেশপারের মুখে। সব খুঁটিয়ে করা এটা আমার একটা বদভ্যাস বলতে পারেন। এইভাবে বাঁচার এক আনন্দ আছে, আছে সেই সঙ্গে পৃথক অনুভূতি।
ভডকা খেতে গিয়ে ভেসপা হঠাৎ বলে উঠল, আপনাকে আসল কথাই বলা হয়নি। ম্যাথিস খবর পাঠিয়েছে। বিষয় সেই বোমা। অদ্ভুত গল্প।
.
বাকারা
বন্ড চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। না, ধারে কাছে কেউ নেই। ক্যাভিয়ার আসতে এখনও বেশ দেরি আছে।
শুরু কর, তোমার শোনা কাহিনী।
তৃতীয় বুলগেরিয়ান ধরা পড়ে গেছে। প্যারিসে পালিয়ে যাচ্ছিল। মিত্রো চালাচ্ছিল। পথে দুজন ইংরেজকে তুলে নেয়। যাতে ওর ওপর পুলিশের চোখ না যায়। একটি মোড়ে যখন গাড়ী থামায় ওর তখন ওর মুখে ফরাসী শুনে ওদের মনে সন্দেহ জাগে। ওরা কাগজ-পত্র দেখতে চায়। পিস্তল বার করে সে তখন এক পুলিশকে গুলি চালায়। ততক্ষণে পুলিশটি মারা গেছে। অন্যজনের হাতে ও ধরা পড়ে। এটাই আশ্চর্য, কিভাবে যে ওকে ধরল। রুয়েনে নিয়ে গিয়ে চিরাচরিত পদ্ধতি তারা ব্যবহার করে। সে সব কথা বলে দেয়।
