একদিকে ভালই হল। শত্রুপক্ষের কাছে আপনি, আমি ও ম্যাথিস তিনজনেই পরিচিত। তাই কার্যসিদ্ধির জন্য। আমাদের বিরুদ্ধে কোন পন্থা অবলন করতে এরা পিছপা হবে না। ল্যাশিফ তাহলে সত্যিই মরিয়া হয়ে উঠেছে। আপনাকে বিশেষ কোন কাজ দিচ্ছি না। শুধু ক্যাসিনোতে আমার পাশে পাশেই থাকবেন। আমার সহকারীও থাকবে, মিস লিন্ড। খেলা শুরুর আগে আমি তাকে আপনার কাছে সমর্পণ করতে চাই। আপত্তি করবেন না। মন্দ নয়। একটু মৃদু হাসি হাসল বন্ড। ল্যশিফের বডিগার্ড দুটো থেকে একদম চোখ সরাবেন না। মনে হয় না ক্যাসিনোর মধ্যে কিছু করবে বলে। তবু সাবধান থাকাই ভাল।
লিটার বলল, আমার দ্বারা যতটুকু সম্ভব আমি তাই করে যাব। এই কাজের আগে আমি মেরিন কোরে ছিলাম। মানে জানেন তার?
বুঝি বন্ডের উত্তর।
লিটারের বাড়ি টেক্সাস। ন্যাটোর গোয়েন্দা বিভাগে যুক্ত সে। কাজটা খুব সহজ নয়, কারণ এখানে বহু দেশের স্বার্থের প্রশ্ন জড়িত। বন্ড ভাবছিল আমেরিকানরা মানুষ হিসেবে সত্যিই চমঙ্কার।
লিটারের বয়স পঁয়ত্রিশ। লম্বা ছিপ ছিপে-চেহারা। তার পরনের সুটটা গায়ের থেকে একটু বেশি ঢিলে ঢালা। তার গতিভঙ্গী ও কথা বলার আদব কায়দা খুবই সংযত ও ধীর। কিন্তু প্রয়োজনে খুবই নির্মম হয়ে থাকে এরা।
টেবিলের উপর এখন ভাবে ঝুঁকে রয়েছে যে, যে কোন মুহূর্তে এরা হিংস্র হয়ে উঠতে পারে। চিবুক, থুতনি আর ঠোঁটে রয়েছে পূর্বের সেই সদাজাগ্রতভাব। চোখ কুঁচকোবার বদভ্যাসের জন্য চোখের পাশে অসংখ্য ছোট ছোট দাগ। হাসলে সেগুলোতেও ভাজ পড়ে। অগোছালো চুলের গোছা দেখলে হঠাৎই ইস্কুলের ছেলে বলে মনে হতে পারে। প্যারিসে ওর কাজকর্ম সম্বন্ধে যতই মুখ খুলুক না কেন, স্বদেশীয় সহকর্মীদের ব্যাপারে একেবারেই নীরব। মনে হয়। নিজের সংস্থার প্রতি তার আনুগত্য অনেক বেশি। যেটা স্বাভাবিক।
লিটার আরও একটা হুইস্কি নিল। বন্ড ততক্ষণে ওকে মুনজদের কথা বলেছে, আর বলেছে ল্যশিফের ভিলার দিকটা ঘুরে আসার কথা। পরে সাতটা নাগাদ ওরা হোটেল অবধি বেড়াতে যাবে ঠিক করল। ক্যাসিনো থেকে বেরোবার আগে বন্ড ওর সবটাকা, দুকোটি চারলক্ষ ফ্রাঙ্ক ক্যাশিয়ারের কাছে জমা রেখে দিল। কেবল দশ হাজারের কয়েকটা নোট সঙ্গে রাখল।
হোটেলে যাবার পথে দেখল বোমা ফাটার জায়গাটায় জোর কদমে কাজ হচ্ছে। অনেকগুলো গাছ উপড়ে ফেলা হয়েছে। হোস পাইপ থেকে পানি দিয়ে রাস্তাটা পরিষ্কার করা হচ্ছে। বোমার গর্তটাও নেই। লোকজনেরা কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না। নিশ্চয়ই হার্মিটেজের সামনেও ভাঙাচোরা মেরামত হয়ে গেছে। দোকান ও বাড়ির সামনের অংশে যে সমস্ত জায়গার ক্ষতি হয়েছিল তা সারিয়ে পূর্বের মত হয়ে গেছে। সন্ধ্যার স্নিগ্ধ আলোয় রয়্যাল শেজোয় আবার হারিয়ে যাওয়া শান্তি ফিরে এসেছে। কেয়ারটেকারটা কাছের লোক? জিজ্ঞেস করল লিটার। বন্ড নিজেও ঠিক জানে না। ম্যাথিস ওকে বলেছিল, তুমি ধরে নাও, ও কারো কাছ থেকে টাকা খেয়েছে। একমাত্র রাজা মহারাজা ছাড়া ওরা সকলকেই চোর জুয়াচোরের তালিকায় ফেলতে চায়। তোমাদের মঙ্গলের জন্য ওরা যা করে, তা সবটাই ওদের অভিনয়।
বন্ডকে দেখেই কেয়ারটেকারটা ছুটে এল। জিজ্ঞেস করল তার দুর্ভাগ্য জনক অভিজ্ঞতার কথা। ম্যাথিসের কথাটা মনে আসতেই সে বলল, ধাক্কাটা এখনও পুরোপুরি সামলাতে পারেনি, একটু সময় লাগবে। খবরটা যথা সময়ে ঠিক জায়গায় পৌঁছে যাবে। ভালই হল, ল্যশিফ খেলার সময় একটু অসাবধান হয়ে পড়বে।
.
শ্যাম্পেন আর গোলাপী
আলো বন্ড ঘরে এসে নিজের জিনিসপত্রের দিকে একবার ভাল করে চোখে বুলিয়ে নিল। না যে জায়গাকার জিনিস ঠিক সে জায়গাতেই আছে। গরম ও ঠাণ্ডা পানির শাওয়ার নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। মেয়েটির সঙ্গে দেখা হতে এখনও ঘণ্টা খানেক বাকি। মন সংযত করে সব প্ল্যান ঠাণ্ডা মাথায় ছকে নিতে হবে। জিতলে বা হারলে তখন কি করনীয় সে বিষয়েও চিন্তা আছে। ম্যাথিস, লিটার ও মেয়েটি এরা কে কোন্ ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে–এই ভাবতেই ভাবতেই কল্পনার লাগাম হাল্কা করে ধরে রইল। একের-পর এক দৃশ্য তার মণিকোঠায় এসে জমা হতে লাগল।
নটা বাজতে এখনও কুড়ি মিনিট বাকি। সব সমস্যা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে সে পোশাক পরতে উদ্যত হল।
কালো সার্টিনের টাইটা ঠিক করতে করতে আয়নায় তার দৃষ্টি চলে গেল। খুব ভাল করে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। ধূসর নীল চোখ দুটোয় নিজের অজান্তেই কৌতুকের আভাস উঁকি দিচ্ছে। ডান ভুরুর উপর চুলগুলো আজ যেন বড় বেশি অবাধ্য হয়ে উঠেছে। ডান গালে এই লম্বালম্বি কাটা দাগটা না থাকলেই কি চলছিল না। দাগের জন্যই তাকে আজ ঠিক গুন্ডাই লাগছে। ঠিক হোগিকার মাইকেল মেয়েটির দৃষ্টিকে তারিফ না করে পারা যায় না।
ম্যাথিস ওকে বলেছিল মেয়েটি তার সম্বন্ধে কি ধারণা পোষণ করে। তাহলে ল্যশিফের সঙ্গে সে আজ দ্বন্দ্ব যুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছে। যুদ্ধের সব সম্ভাবনাগুলো আরো একবার ভাল করে ভেবে নিল।
চ্যাপটা গান মেটালের সিগারেট কেসে পঞ্চাশটা মরল্যান্ড সিগারেট ভোরল। হিপ পকেটে তা নিয়ে নিল। ভর্তি রনসন লাইটারটা নিতেও ভুলল না।
একগোছা দশহাজারের ফ্রাঙ্কের নোট নিয়ে ড্রয়ারটা বন্ধ করে দিল। হালকা শ্যামল দারের হসলারটা এমনভাবে কাঁধে ঝোলাল যাতে ওটা বগল থেকে ঠিক তিন ইঞ্চি নিচে থাকে। শার্টের গোছর নীচ থেকে বার করল চ্যাপ্টা .২৫ বেরেটা অটোম্যাটিক পিস্তল। গুলিগুলো বার করে বার দুই প্রাকটিস করে নিল। ট্রিগারও দেখে নিল। গুলি ভরে, সেফটি ক্যাচ লাগিয়ে কাঁধের হাসলারের মধ্যে নিয়ে নিল সেটা। আবারও ঘরের চারদিকে দেখে নিল সব, এখনও কিছু নিতে বাকি আছে কি না। সিল্কের সার্টের উপর সিঙ্গল-ব্রেস্টেড ডিনার জ্যাকেটটি চাপাল। শেষবারের মত আয়নায় একবার চোখ বুলিয়ে নিল। নিজেকে আজ বেশ সপ্রতিভ লাগছে। এরপর অনেক নিশ্চিন্ত মনে হচ্ছে নিজেকে। বাইরে এসে দরজা টানতেই লক হয়ে গেল।
