বেঁটে চেহারা, পরনে দামী গরমের সুট, চওড়া ঈ হ্যাঁটের জন্য মুখের অনেকখানি অংশ ঢাকা পড়েছে। দুজনের কাঁধে দুটি রঙিন চৌকো ক্যামেরা কেস ঝুলছে–একটা উজ্জ্বল লাল, অন্যটি উজ্জ্বল নীল।
বন্ড ততক্ষণে তাদের প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরত্বের মধ্যে এসে গেছে। দুজনে দুজনের সঙ্গে কিছু ইশারা করল। চক্ষের নিমেষে নীল লোকটা ক্যামেরা নামিয়ে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে আলোর প্রচন্ড ঝিলিক, বিকট বোমা ফাটার শব্দ। গাছের আড়াল থাকা সত্ত্বেও এক ঝটকায় সে কুপকাত। অর্ধসচেতনভাবে কোন মতে হাঁটুতে ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করল। তার চারপাশে তখন বৃষ্টির মত ক্রমাগত ঝরে পড়ছে সুরকি, গাছের ডাল, রক্তমাখা জামাকাপড়ের ফালি আর মনুষ্য দেহের ছিন্নভিন্ন অংশ। চারদিক থেকে কাঁচ ভাঙার শব্দ। রাস্তার প্রায় সমস্ত গাছ পুড়ে গেছে, একটিতেও পাতা নেই। হ্যাটপরা লোক দুটোর কোন অস্তিত্বই চোখে পড়ল না। তবে লাল রঙের কিছু টুকরো রাস্তায়, গাছের গুঁড়িতে ও উঁচু মগডালে তখনও লেগে আছে। বন্ড গাছটা ধরে বমি করতে করতে উঠে দাঁড়াল, এই গাছটার জন্যই সে আজ নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। বাতাসে তখনও ভেসে আসছে বারুদের গন্ধ, পোড়া কাঠ ও পোড়া মাংসের বিশ্রী গন্ধ। এই সময় ম্যাথিস এখানে উপস্থিত হল। সেই তাকে ধরে ধরে নিয়ে চলল হোটেল সৃপ্লেনডিডে। হোটেলে তখন ভিড় জমে। গেছে। ভীড় ঠেলে ওরা বন্ডের ঘরের দিকে চলল। ঘরে এসেই ম্যাথিস রেডিও চালিয়ে দিল। ম্যাথিস তাকে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকে। ম্যাথিস টেলিফোনটা হুক থেকে খুলে নিতে ভুলল না।
আগে পুলিশকে জানিয়ে দিও জ্যামাইকা থেকে আগত ভদ্রলোক যিনি ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেছিলেন, তার কিছু। হয়নি। তাকে যেন ওরা অযথা বিরক্ত না করে। আমি ওদের সব বুঝিয়ে বলব। ওরা প্যারিসকে জানায় ব্যাপারটা দুজন বুলগেরিয়ান কমিউনিস্টকে কেন্দ্র করে। প্রতিশোধ নেওয়ার ঘটনা। একজন অপরজনকে বোমা মেরেছে। তৃতীয়। বুলগেরিয়ানটির সম্বন্ধে এখন কিছু বলার দরকার নেই। ও আশেপাশেই কোথাও রয়েছে। লোকটা প্যারিসে যাবার নিশ্চয়ই চেষ্টা করবে। সমস্ত রাস্তায় যেন পাহারা থাকে। বুঝেছ?
খুব জোর প্রাণে বেঁচে গেছ। তোমার উদ্দেশ্যেই বোমা ছোঁড়া হয়। একটু উল্টোপাল্টা হয়ে গেছে। যাইহোক আসল ঘটনা বার করতে আমাদের বেশি সময় লাগবে না। একটু থেকে ম্যাথিস বলল, তোমাকে ওরা এত গুরুত্ব দিচ্ছে কেন? ঐ বুলগেরিয়ান দুটো পালাল কি করে? বাক্স দুটোরই বা অর্থ কি? লাল বাক্সের টুকরো না দেখা পর্যন্ত কিছু বোঝা যাচ্ছে না। ম্যাথিস এক উত্তেজনায় নড়েচড়ে বসল। ব্যাপারটা ক্রমেই বেশ জমে উঠছে। তার সামনে এখন। অনেক কাজ। বন্ড আর ল্যশিফের ব্যক্তিগত যুদ্ধের আগেই সেও এর মধ্যে নিজেকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করে ফেলেছে।
এবার একটু ড্রিঙ্ক, তারপর খেয়ে একটু বিশ্রাম।
আমি যাই, পুলিশ সমস্ত ব্যাপার এলোমেলো করার আগে আমাকেই ঐ দিকে নজর দিতে হবে।
রেডিওটা বন্ধ করে ম্যাথিস বিদায় নিল। বন্ড নিস্তব্ধ ঘরে বসে রইল। সে বেঁচে আছে এটা ভাবতেই তার কেমন যেন অবাক লাগছে। ওয়েটার খাবার দিয়ে দিল। খাবারে মন দিয়েছে এমন সময় টেলিফোনের শব্দ।
আমি মাদমোয়াজেল লিন্ড। আপনি ঠিক আছেন তো।
না, না, তেমন কিছু নয়।
সাবধানে থাকবেন। ফোনটা ছেড়ে দিল।
হঠাৎ তার মনে হল, দুটো মরেছে, এখনও আর একটা রয়েছে।
আজকের খাবারের জন্য মোটা রকমের বকসিস পাওনা রইল ওয়েটারের। সারারাত ধরেই বসবে জুয়ার আসর। মনকে প্রস্তুত করে ভালভাবে তৈরি হওয়া দরকার। ঠিক তিনটে। ম্যাথিসও ঠিক সময়েই এসে গেছে। লোকটি। সুইডিশ। পা থেকে ঘাড় অবধি টিপে দিতে লাগল। আস্তে আস্তে স্নায়বিক উত্তেজনা অনেক কম মনে হল। এমনকি বা কাঁধের যন্ত্রণাও এখন অনেক কম। লোকটি চলে যেতেই বন্ডের দু-চোখের পাতা গভীর নিদ্রায় এক হয়ে গেল।
সন্ধ্যের সময় ঘুম ভাঙল। এখন শরীর অনেক বেশি ঝরঝরে। ঠাণ্ডা পানির শাওয়ার নিয়ে ক্যাসিনোতে উপস্থিত হল সে। গতরাতের পর থেকে এখানকার মুড থেকে একটু বেশি সরে গিয়েছিল সে। ঐ ভাবটা ফিরিয়ে আনা দরকার। যে কোন জুয়াড়ীর ধৈর্য আর আশাবাদীটা হওয়া ভীষণভাবে দরকার। তাস খেলার সঙ্গী হিসেবে স্বাভাবিক প্রবণতা ও আন্দাজ করার ক্ষমতা পাশাপাশি চলে বলতে গেলে।
বন্ড চিরকালের জুয়াড়ী। তাসের খসখসে শব্দ-তার মনে এক অদ্ভুত মোহ সঞ্চার করে। সবুজ টেবিলটা ঘিরে যে নীরব নাটক অনুষ্ঠিত হয় তাও তার সমস্ত সত্ত্বাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। গদীওয়ালা চেয়ার তার বড় প্রিয়। হাতে ধরা থাকবে শ্যাম্পেন বা হুইস্কি। রুলেতে বল আর তাসগুলো পৃথিবীতে কাউকে তোয়াক্কা করে চলে না। নিজের চেয়ার। থেকে এক ধাচের দর্শক ও অভিনেতা ভাবতে নিজেকে মন্দ লাগে না। মন্দ লাগে না অন্যের নাটকে অংশ গ্রহণ করতে, তারপর নিজের পালা এলে তখন হাঁ বা না বলা, যার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করে থাকে।
এই খেলায় সবচেয়ে পছন্দের বিষয় হল এই যে কেবল সে ছাড়া আর কেউই দোষের ভাগী হবে না। ভাগ্য আমাদের চালাচ্ছে, না আমরা ভাগ্যকে চালিয়ে নিয়ে চলেছি চাকরের মত। বরাত ভাল হলেও ঠাণ্ডা মাথায় খেলে যেতে হবে, খারাপেও নির্বিকার থাকতে হবে। কোনটা বরাত আর কোনটা খারাপ খেলার ফল এই তফাৎটা বুঝে নিতে হবে। জুয়া খেলতে গেলে এই তফাৎটা জেনে রাখা প্রয়োজন। ভাগ্য নানারূপে সম্মুখীন হয়–আদর কর, উপভোগ কর কিন্তু মাথায় তুলোনা বা ধাওয়া কোর না। কোন একদিন তাকেও হয়ত ভাগ্যের কাছে বা কোন রমণীর কাছে হার মানতে হবে। আজ এই জুন মাসের সন্ধ্যায় বন্ড যখন জুয়ার আড্ডায় ঢুকল, তার মনে তখন দারুণ আশা ও গভীর আত্মপ্রত্যয়। তারপর লক্ষ ফ্র্যাঙ্ক বদলে সে পঞ্চাশ হাজার চাকতি করে নিল। রুলের এক নম্বর টেবিলে বসল, পাশের আসনে শেফ দ্য পার্টি। শেফের কার্ডটা চেয়ে নিয়ে বন্ড খেলার বিবরণ সব দেখতে লাগল। আগের খেলার সঙ্গে পরের খেলার কোন সম্পর্ক নেই বললেই চলে। এক একবার চাকা ঘোরে, বলটা লাফাতে লাফাতে একটা গর্তে পড়ছে, সমস্ত ব্যাপারটি একটা পারস্পর্যহীন ঘটনা। তবু সে আগের খেলাটা বরাবর দেখে নিত। প্রত্যেকবারের খেলাই একটা সম্পূর্ণ নতুন খেলা। ব্যাংকারের পার্টনার ডান হাতে গজদন্তের বলটা তোলে, চাকার চারটে শোককে চালিয়ে ঘড়ির কাঁটা যেভাবে ঘোরে সেভাবে, আর সেই সঙ্গে, ঐ একই হাতে বলগুলো ছুঁড়ে দেয় উল্টো মুখে। বহু বছরের চেষ্টায় এই চাকতি, সিলিন্ডার আর মার্কামারা গর্তে বল ফেলার কায়দা এবং যান্ত্রিক কলা কৌশল এতটাই নিখুঁত অবস্থায় এসে উপস্থিত যে এখন চাকতির কোন খুঁত বা পার্টনারের ইচ্ছাকৃত চেষ্টা বলের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। তবু রুলেতে খেলুড়েদের মধ্যে আগের খেলাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে একটা প্রথাস্বরূপ, যাতে চাকতি ঘোরার ধরনে কোন বিশেষত্ব দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সে অনুযায়ী খেলা নির্ধারণ করা হয়।
