ছোট শহরটি আজ যতদূর সম্ভব নিজেকে সজ্জিত করেছে অতিথি অভ্যর্থনার জন্য। বড় রাস্তায় প্যারিসের ধনরত্ন ব্যবসায়ীগণ বিনা ভাড়ায় তাদের সওদার আসর জমিয়েছে।
মহম্মদ আলি সিন্ডিকেটকে ক্যাসিনোতে আনা হল। শুরু হল তাদের নেশার পাথেয় জুয়া।
বন্ড এই তপ্ত রোদে দাঁড়িয়ে এই ইতিহাসের মধ্যে নিজেকে লিপ্ত করে নিয়েছে। এই জাঁকজমকের মধ্যে তার কাজের পটভূমিকা অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। গভীর ও গোপন চক্রান্তে সেও এক অংশীদার এ কথা মনে উদয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে নিজের কাছে বড় অসহায় মনে হয়। যাকগে। এই সব চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলাই ভাল। হার্মিটেজে যাওয়ার আগে ল্যশিফের আবাস একবার দেখে যাওয়াই সমীচীন।
বন্ডের গাড়ি গাছে ঢাকা রাস্তা দিয়ে ভট ভট শব্দ তুলে বালিয়াড়ি পেরিয়ে দক্ষিণ দিকে ছুটে চলল। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সে পৌঁছে গেল হার্মিটেজের সু-সজ্জিত বার-এ। জানলার পাশের টেবিল বেছে নিল।
বিলাসবহুল ফরাসী কায়দায় সাজানো এই ঘর। মেহগনি, চামড়া আর পেতলের ছড়াছড়ি। বন্ড এবার দৃষ্টি দিল ঘরে উপস্থিত লোকজনদের প্রতি। প্যারিস থেকেই তোক বেশি এসেছে। একটু বেশি যেন সাজসজ্জা হয়ে গেছে। চনমনে কথাবার্তা, প্রাণোচ্ছল আবহাওয়া স্মরণ করিয়ে দেয় এরা যেন সকলেই নাটকের নট নটী। পুরুষরা নিয়েছে বোতল ভরা শ্যামপেন। তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মেয়েদের হাতে রয়েছে মার্টিনি। পাশের টেবিলে ছটফটে গোছের একটি মেয়ে তার পাশের সঙ্গীকে বলছে, ড্রাই আমার ভালই চলে। টুইডের সুট পরিহিত তার সঙ্গী নিজেকে ছিমছাম রাখতে ব্যর্থ হয়ে গেছে তার ঐ মদ্যপানে রক্তিম চোখ দুটোর জন্য।
ডেজি ঠিকই বলেছ, তবে কিনা একটুকরো লেবু…
ততক্ষণে বন্ডের চোখ বাইরে চলে গেছে। দীর্ঘদেহ ম্যাথিস ও সঙ্গে ধূসর পোশাকে কালো চুল একটি মেয়ে। পরস্পর পরস্পরের হাত ধরে রয়েছে, তবে তাদের মধ্যে খুব অন্তরঙ্গতা আছে বলে মনে হয় না। ওরা ভেতরে এল। বন্ড ওদের দেখতে পেয়েও না দেখার ভান করল। মসিয়ো বন্ড না? ম্যাথিস আশ্চর্য, গলা উচ্ছ্বসিত। বন্ড অবাক হয়ে। উঠে দাঁড়াল। আপনি একা? কারো অপেক্ষায় নাকি? আসুন পরিচয় করিয়ে দিই মাদামোয়া মেম লিন্ড। আমার। সহকর্মী। ইনিজ্যামাইকা থেকে এসেছেন।
বন্ড বলল, আমার আজ কি সৌভাগ্য। আসুন আপনারা। ওরা চেয়ারে এসে বসল। প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও ম্যাথিস দুজনের ড্রিংকের অর্ডার দিল। বন্ডের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে একটা সিগারেট ধরাল সে, অত্যন্ত সহজ ও সাবলীলভাবে নাক মুখ দিয়ে ধোয়া ছাড়তে লাগল।
মেয়েটির উপস্থিতি বেশ ভালই লাগছিল বন্ডের। গভীর নীল চোখের ঐ নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছিল এক ধাক্কায় সব যেন চুরমার হয়ে যাবে। মুখে প্রসাধনের চিহ্ন মাত্র নেই। তবু মেয়েটির রূপে বন্ডের উত্তেজনা কিছু কম হচ্ছিল না, বরং উৎসাহিত হচ্ছিল এই ভেবে যে মেয়েটির সঙ্গে একইসঙ্গে কাজ করতে হবে তাকে।
ম্যাথিস বন্ডের আনমনা ভাব লক্ষ্য করছিল। সে একাই উঠে পড়ল।
মনে কিছু কোর না আমি রাতের ডিনারের ব্যবস্থাটা করে আসি। মেয়েটি মাথা হেলাল।
বন্ড বুঝতে পারল, ম্যাথিস তাদের সুযোগ দিয়ে গেল। আজ সন্ধ্যেতে আপনি যদি একা থাকেন, তাহলে আমার সঙ্গে ডিনারে কোন আপত্তি আছে কি? মেয়েটি অর্থপূর্ণ হাসি দিয়ে জানাল, আপত্তি থাকবে কেন? আপনি কি আমাকে আপনার সঙ্গে ক্যাসিনোতে নিয়ে যাবেন? আমাকে সঙ্গে নিলে আপনার লাক খুলে যাবে
একসঙ্গে কাজ করতে হলে যেভাবে আলোচনা করতে হয় সেভাবেই পরস্পর মিলিত হবার জন্য স্থান-কাল ঠিক করল। বন্ডের ভয় ছিল এর কাছাকাছি আসতে তাকে কত না বাধা অতিক্রম করতে হবে, কিন্তু এখন দেখল মেয়েটি কোন রকম ভনিতা না করেই কাজের বিষয়ে খুঁটিনাটি ব্যবস্থা নিয়ে সহজেই কথা বলছে।
ম্যাথিস ফিরে আসতে বন্ড বিলটা চেয়ে নিল। হোটেলে ফিরে যেতে হবে, কারণ কয়েকজন বন্ধু লাঞ্চ করবে তার সঙ্গে। মেয়েটির সঙ্গে করমর্দন করে বেরিয়ে এল। মেয়েটি তখনও চেয়ে আছে বন্ডের গমন পথের দিকে। ম্যাথিস চেয়ারে বসতে বসতে বলল, ও আমার বিশেষ বন্ধু। তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে মনে হচ্ছে, বরফ গলতে শুরু করেছে।
একটু হেসে সে বলল, বন্ডকে এ পর্যন্ত কেউ গলাতে পারেনি। মনে হচ্ছে এর পক্ষে এটা এক নতুন অভিজ্ঞতা হবে তোমার পক্ষেও। মেয়েটি এই কথার সোজাসুজি উত্তর না দিয়ে বলল, চমৎকার চেহারা। কারমাইকেলের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় কিন্তু ওর মধ্যে একটা নির্মম–
কথাটা তখনও শেষ হয়নি। ওদের কয়েক হাতের ব্যবধানে প্লেট গ্লাসের জানলা ঝনঝন করে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। বিস্ফোরণ এত প্রবল বেগে হয়েছিল যে তারা চেয়ারের সঙ্গে ঠুকে গেল। এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা কাটিয়ে বাইরের ফুটপাতে কি সব ভেঙে পড়ার আওয়াজ ভেসে এল। বার থেকে বোতল উল্টে গেল, চারদিকে চিৎকার, আর্তনাদ ও ছোটাছুটি। ম্যাথিস মেয়েটিকে বসিয়ে রেখে ভাঙা জানলার ফাঁক দিয়ে বাইরে চলে গেল।
.
হ্যাট পরা লোক দুটো
বন্ড বার থেকে বেরিয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকে। রাস্তার দু-পাশে গাছের সারি, কয়েকশ গজ দূরে হোটেল। খিদেও পেয়েছে প্রচন্ড। সূর্য এখন ঠিক মাথার উপরে, তাপের জোরও বেশি। এই রোদেও গাছতলায় দুজন লোক দাঁড়িয়ে। বন্ডের সঙ্গে লোকদুটোর দূরত্ব এখন ঠিক একশ গজ।
