আজ তিন বছর ধরে আমাদের হেড কোয়ার্টারে বসে KGB-র হয়ে কাজ করে আসছে এবং এতদিন পরে তার ইনাম পাচ্ছে পান্নার গোলা, যার দাম লাখ পাউন্ডকেও ছাড়িয়ে যায়। প্রথমটা যেটা ধরতে পারছি, KGB নিশ্চয়ই পার্পল সাইফার এর টোপটা পুরোপুরি গিয়ে বসে আছে, না হলে এই অবিশ্বাস্য দামটা দিচ্ছে কেন? তার মানে খবরের রঙটা আরও চড়ানো যেতে পারে এবার, এমন কি হয়ত ২ নম্বরও চলবে।
দ্বিতীয়তঃ এতদিন ধরে মেয়েটি যে কাজের বিনিময়ে এক কপর্দকও পায়নি, সেটা ভাবিয়ে তুলেছিল আমাদের। ব্যাংকে ওর যে অ্যাকাউন্ট আছে, তাতে মাস মাইনের চেক এর অংকটাই কেবল জমা পড়ে এসেছে এত কাল, গোটা পঞ্চাশ পাউন্ড। এতদিন পরে এবার আমরা জানতে পারলাম যে, আসল ইনাম আসছে বিরাট অংকে, এক থেকে। সবই বেশ ভাল খবর।
বন্ড নড়েচড়ে বসল। ওর মনে হচ্ছে কোথায় যেন বেসুরো বাজছে, একটা জায়গা তো বটেই। একটু বিনীত কণ্ঠে বলল, ইংল্যান্ডে বসে যে কলকাঠি নাড়ছে, ওকে চালাচ্ছে, তার পাত্তা লাগানো হয়েছে কি কখনো, স্যার? কাজের হুকুম-টুকুমগুলো আসে কিভাবে?
পাইপ নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে অসহিষ্ণু ভঙ্গিতে জবাব দিলেন M, খোঁজ নেবার দরকার নেই বলেই হয়ত নেওয়া হয়নি। ভুলে যাচ্ছ কেন হে, দিনের মধ্যে ছ বার করে ওদের হাতের গোড়ায় গোছা গোছা খবর চালান দিচ্ছে। আবার নতুন করে কোন নির্দেশ দেবার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। লন্ডনে KGB-র লোক যারা আছে, তারা কেউ হয়ত ওকে চেনেই না–একমাত্র রেসিডেন্ট ডিরেক্টর-ই চেনেন হয়ত, কিন্তু রেসিডেন্ট ডিরেক্টর যে কে সে সম্বন্ধে কোন ধারণাই নেই আমাদের।
বন্ডের মাথায় হঠাৎ একটা সূত্রের সম্ভাবনা খেলে গেল। সে খুব শান্ত স্বরে বলল, হয়ত আমরা তাকে চিনে নিতে পারি, জানতে পারি যে লোকটা কে।
M ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলার জন্য বন্ডকে বললেন।
বন্ড বলতে শুরু করল, দেখুন স্যার, ডঃ ফ্যাশ বলেছিলেন মনে আছে আপনার যে, ওয়ার্টস্কির লোক যাতে চূড়ান্ত দর হাঁকে, তার জন্য কেউ নিশ্চয়ই বরাবর এক ধাপ নিচের দর হাঁকতে থাকবে? ডঃ ফ্যাশ-র কথা অনুযায়ী রাশিয়ানরা না কি ফাবেয়ার্জে সম্বন্ধে বিশেষ খোঁজ খবর রাখে না, তাই যদি সত্যি হয় তাহলে জিনিসটার দাম সম্বন্ধে ওদের সঠিক কোনও ধারণা না থাকারই কথা। তাছাড়া এ ধরনের জিনিসের দাম-টামের ব্যাপারে K.G.B.-র তো কোন ধারণা থাকবার কথা নয়। ডঃ ফ্যানশর কথা যদি ঠিক হয়, তাহলে মেয়েটার কপালে যে বিরাট অর্থপ্রাপ্তি ঘটতে চলেছে, সে তুলনায় দশ বিশ হাজারটাই বেশি সঙ্গত বলে মনে হয়।
একমাত্র রেসিডেন্ট ডিরেক্টার ছাড়া মেয়েটির ইনাম দেওয়ার ব্যাপারটা আর কেউ জানতে পারছে না। কাজেই নিলামের আসরে কম দরের উস্কুনি দিয়ে কেউ যদি দর চড়াতে চায়, সে হল ঐ রেসিডেন্ট ডিরেক্টর। এ ব্যাপারে আমি একেবারে নিঃসন্দেহ যে নিশ্চয়ই তার ওপর হুকুম থাকবে সাদৃবির দোকানে গিয়ে দরটাকে আকাশে তুলে দিতে।
আমার যা মনে হয় লোকটাকে অবশ্যই চিনে বার করা যাবে এবং এমন সব মালমশলা আমাদের হাতে আসবে যাতে ওকে দেশে ফেরত পাঠাতে ত্বর সইবে না। এ ব্যাপারে KGB কিছুই টের পাবে না। যদি নিলামের আসরে গিয়ে ওকে ফাঁসানো যায় আর বেশ কিছু ছবি তোলার ব্যবস্থা করা যায় এবং সেই সঙ্গে নিলামের দর হাঁকাহাঁকির বিবরণ, ব্যস তাহলে এক সপ্তাহের মধ্যেই ফরেন অফিসকে দিয়ে লোকটাকে অবাঞ্ছিত ব্যক্তি বলে দাগ দেওয়া যাবে। আর নতুন লোক আনাতে KGB-র যে ক-মাস লেগে যাবে, তার ঠিক নেই।
M চিন্তিত ভঙ্গিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। একটু পরে বন্ডকে বললেন, ঠিক আছে, 007। যাও, চীফ সব স্টাফের সঙ্গে দেখা করে সব ব্যবস্থা করে ফেল। M-এর সঙ্গে ব্যবস্থা যা করবার আমিই করছি। জালটা ওদের হলেও পাখিটা আমাদের। দেখ, নিলামে গিয়ে যেন দর হেঁকে বোস না, অত পুঁজি নেই। বন্ড তাড়াতাড়ি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। নিজেকে খুব বুদ্ধিমান বলে মনে হল।
১৩৮ নম্বর স্ট্রীটে ওয়ার্টস্কিদের দোকান, বেশ ছিমছাম আধুনিক কেতায় সাজানো। বাইরের শোকেসে আধুনিক এবং প্রাচীন জড়োয়ার বাহুল্য নেই–দেখে মনে হয় না ফাবেয়ার্জের তৈরি জিনিসের এরাই সবচেয়ে বড় কারবারি। দেওয়ালে কুইন মেরি, রাজমাতা, রাণী, গ্রীসের রাজা পল এবং ডেনমার্কের রাজা নবম ফ্রেডেরিক-এর যে সব রাজকীয় পরওয়ানা ফ্রেমে বাঁধিয়ে সারি সারি টাঙিয়ে রাখা হয়েছে, তাতেই বোঝা যায় যে, এরা সাধারণ কোন মণিকার নয়।
জেমস্ বন্ড মিঃ কেনেথ সোম্যান-এর খোঁজ করল। ঘরের পেছন দিকে বেশ কয়েকজন লোক গোল হয়ে বসেছিলেন, তাদের মধ্যে থেকে একজন উঠে এলেন। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি।
বন্ড বলল, আমি CID থেকে আসছি। আমার নাম জেমস্ বন্ড। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে আমার প্রত্যক্ষ এক্তিয়ারের বাইরে। আমার পরিচয় সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হতে হলে খাস রোনাল্ড ভ্যালান্স বা তার একান্ত সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা ছাড়া উপায় নেই।
ভদ্রলোক সন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে বন্ডের দিকে তাকালেন, তারপর বললেন, আসুন, নিচে যাওয়া যাক।
বন্ডকে যেখানে নিয়ে আসা হল সেটা একটা শো রুম। চারিদিকে দেওয়াল জোড়া সব কাঁচের আলমারি, ভিতরে। আলোর ব্যবস্থা। তাকের ওপর সোনা, হিরে, মণি মুক্তোর ঝিলিক।
