আমার কৌতূহল প্রবল হলেও মারিয়া মেয়েটির সম্বন্ধে সন্দেহ পোষণ করার কোনও কারণ ঘটেনি। কিন্তু গত মাসে নিলামদার সাদবি-রা যখন বিজ্ঞাপন দিল যে, জিনিসটাকে নিলামে বিক্রি করা হবে, তখন খটকা লাগল। বিজ্ঞাপনে জিনিসটাকে এক ভদ্রমহিলার সম্পত্তি বলে উল্লেখ করা হয়েছে, আর সাত দিন পরে নিলাম হবে। আমি খুব ভেবে চিন্তে মাথা খাঁটিয়ে সন্ধান নিতে লাগলাম, মেয়েটির সঙ্গে দেখাও করলাম। মেয়েটি সেই একই কাহিনী–প্যাকেটের কাগজে যা লেখা আছে তার পুনরুক্তি করল, যা বিশ্বাস করা শক্ত। সেই সময়ে থেকেই জানা গেল যে মেয়েটি মিনিস্ট্রি অব ডিফেন্স-এ কাজ করে; সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে একটা সন্দেহ জেগে ওঠে, যে মেয়ে এমন মোক্ষম জায়গা কাজ করছে তার পক্ষে অন্য কোন দেশ থেকে লাভ পাউন্ডের বেশি দামের উপহার আনাটা কেমন যেন গোলমেলে ব্যাপার। কাস্টম্স-এর কাজের সূত্রে MIx-এর একজন উঁচু দরের কর্তা ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় ছিল, তার সঙ্গে কথা বললাম, সেখান থেকে সূত্র ধরেই আপনাদের এই বিভাগে আমাকে পাঠান হল। বন্ডের দিকে চেয়ে ডঃ ফ্যাশ বললেন, এই হল ব্যাপার।
M ডঃ ফ্যানশ এর কাছে জানতে চাইলেন যে পান্নার ঐ গোল জিনিসটা খাঁটি কিনা? ডঃ ফ্যানশ বললেন, নিশ্চয়ই। ফাবেয়ার্জের তৈরি জড়োয়া জিনিস সম্বন্ধে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খোঁজখবর রাখে ওয়ার্ট স্কি প্রতিষ্ঠানের লোকেরা, ওসব জিনিস বেচা কেনাও করে সব চেয়ে বেশি; মিঃ স্নোম্যানও আমার সঙ্গে একমত। এটা যে কার্ল ফাবেয়ার্জের সেই হারিয়ে যাওয়া অনন্য শিল্পকীর্তি তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
আদি সূত্রের ব্যাপার সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞরা কি বলেন? যা বলা হয়েছে সেটা সত্যি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। ফাবেয়ার্জের সেরা যে সব কাজ, তার বেশির ভাগ ফরমাস দিয়ে গড়ানো। মিস ফ্রয়েডেনস্টাইন বলেছেন যে, তার পিতামহ ছিলেন বিপ্লবের আগের যুগের খুব একজন ধনী লোক। তার পোর্সি লেনের জিনিস তৈরির কারবার ছিল। ফাবেয়ার্জে যত জিনিস তৈরি করেছিলেন তার শতকরা নিরানব্বই ভাগই রাশিয়ার বাইরে চলে আসে। প্রাকৃবিপ্লব যুগের রাশিয়ান জড়োয়া শিল্পের নিদর্শন –এ ছাড়া তার অন্য কোন পরিচয় দেওয়া হয় না।
আচ্ছা এটা কি সম্ভব যে, এই এত বছর ধরে এই পান্নার জিনিস ক্রেমলিন প্রাসাদেরই কোথাও লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখা ছিল?
নিশ্চয়ই। ক্রেমলিনে যে ঐশ্বর্য আছে, তার অন্ত পাওয়া ভার। কোথায় যে কত কি লুকিয়ে রাখা আছে কেউ তা জানতে পারে না। সম্প্রতি কয়েকটা জিনিস প্রকাশ্য জায়গায় রাখা হয়েছে। কাজেই যদি ধরা যায় যে, ক্রেমলিনের ঝুলি থেকেই এই পান্নার বলটা বার করা হয়েছে, মালিকানা খাড়া করবার জন্য একটা ভূয়ো ইতিহাস ফাঁদা হয়েছে, তারপর কাজের ইনাম হিসাবে রাশিয়ার কোনও উপকারী সেবকের হাতে তুলে দেবার জন্য বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাহলে সম্ভাবনাটাকে কি উড়িয়ে দেওয়া যায়?
সাদুবির নিলামে কত দাম উঠবে বলে আপনি আশা করেন?
ঠিক বলা যায় না তবে ওয়াইস্কির তরফ থেকে নির্ঘাৎ বেশ চড়া দর দেওয়া হবে। তবে কত চড়া দর সেটা ওরা কাউকেই জানাতে চাইবে না। ওদের কাছাকাছি দর কেউ না কেউ হাঁকবে নিশ্চয়ই। সে যাই হোক, আমি লাখ পাউন্ডের কম বলব না। বন্ড উঠে দাঁড়িয়ে M-এর দিকে তাকিয়ে বলল, দেখুন স্যার আমার তো মনে হয় আর কিছু জানার দরকার নেই। শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে অতি সোজা সরল ব্যাপার। দেখা যাবে আমাদের সহকর্মীদের মধ্যে। একটি মেয়ে বড় জবর কপাল নিয়ে জন্মেছিল। তবে ডঃ ফ্যানৃশ যে এতটা কষ্ট স্বীকার করেছেন, সেটা তাঁর দয়া।
বিদায় সম্ভাষণের পালা চুকিয়ে ডক্টর সাহেবকে বাইরে এগিয়ে দিয়ে এসে বন্ড M-এর ঘরে ফিরে এল। M তখন অত্যন্ত গোপনীয় একটি ফাইল ড্রয়ার থেকে বার করে তার পাতা ওল্টাতে ব্যস্ত। বন্ড বসে অপেক্ষা করতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে M কাগজগুলো ফাইলে ঢুকিয়ে রেখে মুখ তুলে তাকালেন। তার চোখ দুটো চকচক করছে। মেয়েটির জন্ম প্যারিসে, ১৯৩৫ সালে। যুদ্ধের সময়ে জার্মানির বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে, ওর মা তাতে বেশ সক্রিয় অংশ নেন। যুদ্ধের পর মেয়েটি সরবোন-এ চলে যায়, সেখানে রাষ্ট্রদূতাবাসে চাকরি পায় ন্যাভাল অ্যাটাশে, মানে নৌ বাহিনী সংক্রান্ত ভারপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তির দপ্তরে দোভাষীর কাজ।
পরের খবর তো জানাই। সেই প্রতিরোধ আন্দোলনের কোন প্রাক্তন কর্মী ওর মায়ের সঙ্গে পূর্বপরিচয়ের দৌলতে ঘনিষ্ঠ হয় এবং ওকে প্যাঁচে ফেলে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করে। লোকটা তখন সোভিয়েটের NKVD-র কাজ করত। সেই থেকেই মেয়েটাকে ওদের নির্দেশেই কাজ করে যেতে হচ্ছে। ওদের নির্দেশেই মনে হয় মেয়েটি বৃটিশ নাগরিক হবার জন্য আবেদন করেছিল। প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে ওর মায়ের সম্পর্কের দৌলতে ১৯৫৯ সালে বৃটিশ নাগরিকত্ব লাভ করে এবং সেই সময়ে ফরেন অফিস থেকে আমাদের কাছে ওকে সুপারিশ করে পাঠানো হয়। এইখানেই মেয়েটা একটা প্রকাণ্ড ভুল করে বসে। কাজে যোগ দেবার আগে সে একমাসের ছুটি চেয়ে নেয়। পরে তত্ত্ব তাল্লাস নিয়ে ওর পাত্তা পাওয়া গেল লেনিন গ্রাদ-এর গুপ্তচরবৃত্তি শেখবার স্কুলে। তখন ভাবতে হল যে ওকে নিয়ে কি করা যায়। কেননা ধরেই নেওয়া হল যে, তালিম-টালিম যা নেবার সে নিয়েছে। সেকশন 100 পার্পল সাইফার-এর ফন্দিটা বার করলে, আর তার পরের কথা তোমায় নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই বলে মনে হয়।
