জ্যামাইকাতে এক সময় কাজ করেছে বন্ড। তাই কিছুটা অভিজ্ঞতা ছিলই। তাকে যে ছদ্ম ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়েছে তা হল মেসার্স ক্যাফরি নামক জামাইকার সর্বপ্রধান কোম্পানির শাসালো মক্কেলের। এই কোম্পানির ব্যবসা আমদানি ও রপ্তানি। তাই জামাইকা থেকে তার প্রতি যা নির্দেশ আসছে তাকে সেই ভাবে করতে হচ্ছে। নির্দেশ পাঠাচ্ছে ডেইলি-গ্লিনার নামক ঐ অঞ্চলের বিখ্যাত কাগজের অফিসের ডেস্ক থেকে একজন।
লোকটি স্বল্পভাষী, নাম ফসেট। কেথেন দ্বীপপুঞ্জের কচ্ছপ ধরা এক কোম্পানির হিসেবপত্র দেখত এক সময়। যুদ্ধের সময় স্বেচ্ছায় সৈন্যদলে ভর্তি ছিল সে। শেষে মাল্টার নৌ-বিভাগের গোয়েন্দা দপ্তরে কেরানির কাজ জোটে। যুদ্ধ থেমে গেল। বিষণ্ণচিত্তে কোমনে ফেরার উদোগ করছে, তখন সে সিক্রেট সার্ভিসের নজরে পড়ে। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে সিক্রেট সার্ভিসের যে বিভাগে কাজ করছিল তারা ফসেটকে ফটোগ্রাফি শেখায় ও একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সাহায্যে তাকে ডেলী গ্লিনারের কাজে চাকরি দেয়।
বিভিন্ন এজেন্সী থেকে খবরের কাগজের অফিসে যে সব ফটোগ্রাফ আসতে সেগুলো বাঁচাই করা ছিল তার কাজ। ফাঁকে ফাঁকে অপরিচিত লোকের কাছ থেকে টেলিফোনে আদেশ আসত। সমস্ত ব্যাপারটা নিখুঁত ও গোপনীয় রেখে কাজ করতে হত। টাকাটা তার এক কল্পিত আত্মীয় ইংল্যান্ড থেকে তার নামে পাঠাচ্ছেন এই ভাবে ব্যাঙ্কে জমা পড়ত।
অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে যে খবর আসত সেগুলি বন্ডকে জানানো ছিল ফসেটের এখানকার কাজ। ফসেটের পাঠানো কোন খবর জ্যামাইকাতে ডাকবিভাগ কখনো সন্দেহ করবে না। ফসেট এখন ম্যারিটাইম প্রেস অ্যান্ড ফটো এজেন্সীর সংবাদদাতা, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স তাকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে। এর জন্য মাসে সে বাড়তি দশ পাউন্ড পাচ্ছে।
ফসেট উৎসাহিত হচ্ছিল। গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্যই হয়ত সে একদিন পুরস্কৃত হবে। একটা গাড়ী কেনার প্রথম কিস্তির টাকাটা দিয়ে ফেলল সে। সবুজ রঙের আই-শেড চোখে এটে অফিসের ডেস্কে সে যখন বসে থাকত, সমীহ করে তাকাত সকলে।
বন্ড এইসব ব্যাপারগুলো বেশ মানসচক্ষে দেখতে পেল। তার কাছে কখনো আদেশ আসে না। এম-এর সঙ্গে যোগাযোগে সময় লাগে। অবশ্য এত কান্ডেরও কোন মানে নেই, সম্ভবত এই শহরেই সিক্রেট সার্ভিসের আর একদল লোক আছে যারা সোজাসুজি রিপোর্ট করছে। তবু এই পদ্ধতিতে কাজ করে একটা ধারণা হয় যে সে যেন রিজেন্ট পার্কের হেড কোয়ার্টারের ঠাণ্ডা মাথা লোকগুলো, যারা সমস্ত কলকাঠি নাড়ছে তাদের থেকে অনেক দূরে।
বন্ড দুবার পড়ল টেলিগ্রামটা। ডেস্কে রাখা টেলিগ্রাম ফর্ম থেকে একটা পাতা ছিঁড়ে নিল, কারণ অপর পক্ষকে কার্বন কপি দিয়ে কি লাভ?
উত্তরটা গোটা গোটা অক্ষরে লিখলঃ
খবরের জন্য ধন্যবাদ যথেষ্ট হবে–বন্ড
কেয়ারটেকারের হাতে উত্তরটা দিয়ে বন্ড দ্য সিলভা লেখা টেলিগ্রামটা পকেটে পুরল। হয়ত ওরা পোস্ট অফিস থেকে এর কপি জোগাড় করে ফেলেছে। কেয়ারটেকারকে হয়ত ঘুষ দিয়ে হাত করেছে, বন্ড আসার আগে ওরা স্টিমে খামটা খুলেছে কিনা কে জানে। গুডনাইট জানিয়ে চাবি নিয়ে বন্ড সিঁড়ির দিকে চলল। লিফট নিল না, কারণ, এর সংকেত বড় মারাত্মক। সিঁড়ি পেরিয়ে সে বারান্দা অতিক্রম করে নিঃশব্দে নিজের ঘরের সামনে পৌঁছল।
সুইচটা জ্বেলে দিল। ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠল। ঘরের মধ্যে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিল। ঘরের মধ্যে ভাল করে দৃষ্টি দিল। খেতে যাবার আগে সে যা যা ব্যবস্থা নিয়েছিল তা সঠিক জায়গায় আছে কিনা দেখল। এই-সব তুচ্ছ ব্যাপারের দিকে খেয়াল আছে বলেই সে আজও বেঁচে আছে। সিক্রেট এজেন্টের কাজে প্রতিপদে বিপদের শঙ্খধ্বনি।
যাক, তাহলে ক্যাসিনোতে থাকা অবস্থায় কেউ তার ঘরে ঢোকেনি। এরপর বন্ড জামাকাপড় ছেড়ে গোসল সেরে নিল। সে হিসেব করে দেখল গত দুদিনের খেলায় সে জিতেছে তিরিশ লাখ। সব মিলিয়ে ওর মূলধন দাঁড়িয়েছে দু কোটি তিরিশ লাখ ফ্রাঙ্ক অর্থাৎ তেইশ হাজার পাউন্ড। জানলার বাইরে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার চঞ্চল, উৎসুক চোখ দুটি আপনা হতেই বন্ধ হয়ে এল। ঘুমন্ত বন্ডের মুখে নেমে এল নিষ্ঠুরতার এক কঠিন আভাস।
.
এম–এর জন্য
এই ঘটনার ঠিক দুসপ্তাহ আগে সিক্রেট সার্ভিসের স্টেশন এস থেকে এম-এর কাছে নিম্নলিখিত বার্তা গেল। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের এই বিভাগের প্রধান তিনি।
এম সমীপে।
এস-এর অধ্যক্ষের নিকট হইতে।
বিষয় : সিয়ো ল্য শিফকে বিধ্বস্ত করার পরিকল্পনা। ল্য শিফ ফ্রান্সে শত্রুপক্ষের প্রধান এজেন্ট এবং আলসেস এর শিল্প অঞ্চলের কমিউনিস্ট প্রভাবিত ট্রেড ইউনিয়নগুলির গুপ্ত অর্থদাতা। এই ইউনিয়ন যে আমাদের সঙ্গে শত্রুপক্ষের সম্ভাব্য যুদ্ধের ক্ষেত্রে গুপ্তচরের কাজ করতে পারে সে বিষয়ে আমরা অবগত।
এর শঙ্গে ল্যশিফের জীবন কাহিনী ও স্মার্শ গুপ্তচর সংস্থা সম্বন্ধে কিছু তথ্য দেওয়া হল।
কিছুদিন থেকে আমরা লক্ষ্য করছি ল্যশিফ অত্যন্ত বিপদজনক কাজে হাত দিয়েছে। সমস্ত দিক থেকেই সে সোভিয়েত রাশিয়ার সুযোগ্য এজেন্ট বলা যায়। কিন্তু কিছু শারীরিক ও নীতিগত দুর্বলতা আছে। এই দুর্বলতার সুযোগ আমরা মাঝে মাঝে নিতে পেরেছি। তার একজন ইউরেশীয় (১৮৬০ নম্বর) বান্ধবী আমাদেরই লোক, স্টেশন এস থেকে তাকে নির্দেশ পাঠান হয় এবং তার মারফত ল্যশিফের অনেক ব্যক্তিগত ঘটনা আমাদের গোচরে এসেছে। নানা কারণ আমাদের মনে সন্দেহ জন্মেছে সে ল্যশিফ অত্যন্ত আর্থিক দুরবস্থায় পড়েছে। ১৮৬০ নম্বর এর কয়েকটি লক্ষণ আবিষ্কার করে যে, যেমন খুব সঙ্গোপনে কিছু গহনা বিক্রি, অ্যানটিবেসের একটি বাড়ি বিক্রি এবং বাড়তি খরচ সম্বন্ধে সজাগ হয়ে ওঠা খুবই স্বাভাবিক। এই কেসটিতে আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন দোয়জিয়েম বুরো। এঁদের সাহায্যে অনুসন্ধান চালিয়ে কিছু বিচিত্র তথ্য সামনে এসেছে।
