কিন্তু একদিন সমুদ্রে যাবার পথে বন্ডকে যেন কেমন অন্যমনস্ক দেখাল। কি যেন ভাবছে ও। কিসী নৌকা বার করার আগেই বন্ড তাকে ডাকল। বলল, তার সাথে জরুরী কথা আছে। একথা শুনে কিসীর বুক ধড়াস ধড়াস করতে লাগল। ওর পাশে একটা পাথরে বসল সে। বসে এক হাত দিয়ে বন্ডকে জড়িয়ে ধরল।
বন্ড এক টুকরো দোমাড়ানো কাগজ বার করল পকেট থেকে। কিসীর সামনে মেনে ধরল, সেটা দেখে ভয়ে শিউরে উঠল কিসী। বন্ড আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, কিসী, এই কথাটার মানে কি? ভলাদিভোস্টক প্রকাণ্ড এক দেশের সাথে যেন এই শব্দটার যোগ আছে। মনে হচ্ছে দেশটার নাম বোধহয় রাশিয়া। আমার কেমন যেন মনে হয় ওই রাশিয়ার সাথে আমার জীবনের অনেক কিছু জড়িত। আগে আগে আমি যেন ওখানে অনেক কিছু করেছি। এই কুরোয় আসার আগে আমি কোথায় ছিলাম? কথাটা আমি কতদিন জানবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। কিসী তুমি আমাকে সাহায্য করবে?
পুরোহিতের কাছে তার প্রতিজ্ঞার কথা মনে পড়ে গেল কিসীর। নিজের মুখ সে বন্ডের হাতের মধ্যে গুঁজে দিল। তারপর সে বন্ডের দিকে মুখ তুলে বলল, হ্যাঁ, আমি তোমাকে সাহায্য করব।
তাহলে আমি ওই ভলাদিভোস্টকে যাব। তাহলে হয়ত আমার আরো অনেক কথা মনে পড়বে। সেখানে থেকে আমি তখন ফিরে যাবার চেষ্টা করতে পারি।
কিসী জানাল যে, ফাকুওকার মেলবোট যাবে কাল। সেখান থেকে আমি তোমাকে ট্রেনে চড়িয়ে দেব। সাথে টাকাকড়ি দিয়ে পথ বাতলে দেব। খুব সাবধানে যেও।
কিসীর গলায় কান্না আটকে আসছিল। সে নৌকার কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে ঠেলে সেটাকে পানিতে নামাল। বন্ডের জন্য অপেক্ষা করল অন্য দিনের মত। তারপর গিয়ে বসল নিজের জায়গায়।
জেমস বন্ড নিজের জায়গায় বসে নৌকার দাঁড় খুলল। পানকৌড়িটাও এই
সময় লাফিয়ে উঠল নৌকায়।
কিসী বন্ডের চোখে চোখ রেখে মৃদু হাসল। বন্ডের পিঠে সূর্যের আলো এসে পড়েছে। দিনটা ছিল ভারি সুন্দর। কুরোতে অবশ্য বন্ডের সব দিনই ভাল কেটেছে।
কিন্তু ওর নাম যে জেমস বন্ড সে কথা ও জানে না। এক টুকরো কাগজে একটি মাত্র রাশিয়ান কথায় ও হঠাৎ যে তাৎপর্য খুঁজে পেয়েছে তার তুলনায় কুরোর এই জীবন, কিসী সুজুকির এই ভালবাসা, টাইগারের ভাষায় বলতে হয়? তিতিরের ক ফোঁটা কান্নার চেয়ে বেশি কিছুই নয়।
ক্যাসিনো রয়্যাল
ক্যাসিনো রয়্যাল — জেমস বন্ড
সিক্রেট এজেন্ট
ভোর তিনটে নাগাদ ধোয়া আর ঘামের গন্ধে ক্যাসিনোর জুয়ার আড্ডা অসহ্য হয়ে ওঠে। লোভ, আশংকা আর উত্তেজনা জুয়াড়ীর নিত্যসঙ্গী–বিশেষ করে টাকার অংকটা যদি বেশি হয়। সব মিলিয়ে ব্যাপারটা যেমন আত্মার তৃপ্তি ঘটায় না তেমনি শারীরিক দিক থেকেও পীড়াদায়ক।
জেমস বন্ড এই সময় অনুধাবন করলেন শরীর ও মন দুই-ই অসাড়। এর পর কাজে ইস্তফা দেবেন ঠিক করলেন। এর পরেও খেলতে থাকলে মাথা কাজও করে না বরং ভুল হয় সব থেকে বেশি।
রুলেত-এর টেবিল থেকে সন্তর্পণে উঠে পড়ল। ভিতরের ঘরে তখনো খেলা চলছে। ল্যশিফ জিতে চলেছে। বন্ড লক্ষ্য করল সেই মুখ। কাঁধ ঝাঁকুনি দিয়ে বন্ড সেখান থেকে বেরিয়ে এল।
ক্যাশের চারপাশে উঁচু বেড়া, একজন তোক দাঁড়ালে তার থুতনি অবধি পৌঁছায়। টুলে বসে ক্যাশিয়ার। তার কাছে রাখা থাকে থাক-করা চাকতি আর নোট। সেগুলো এমনভাবে রাখা যে বেড়া টপকে সেগুলো নিয়ে আবার বেড়া পার হয়ে পালানো কঠিন।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে বন্ড দশ হাজার আর এক লাখ ফ্রাঙ্কের নোটের তাড়াগুলো ক্যাশিয়ারের কাছ থেকে নিচ্ছিল। সেই সঙ্গে তার মনের মণিকোঠায় ভেসে চলেছে এক ছবি–আগামীকাল ক্যাসিনো কমিটির মিটিং। মিটিং রোজই বসে। মসিয়ো ল্যশিফ জিতেছেন দুলাখ। যেমনভাবে রোজ খেলেন সে পদ্ধতিতে। মিস ফেরার চাইল্ড এক ঘণ্টার মধ্যে দশ লাখ জিতে যান। বেশ মাথা ঠাণ্ডা রেখেই তিনি খেলছিলেন। ভাই কাউন্ট দ্য ভিলোরা রুলেতে জেতেন দশ লাখ। তিনি অবশ্যই ভাগ্যবান। তারপর আসছেন ইংরেজ ভদ্রলোক মিস্টার দুদিনে, তিনি জিতেছেন তিরিশ লাখ। পাঁচ নম্বর-টেবিলে লানা খেলছিলেন প্রথমটার থেকে পরেরটা বেশি বাজি ধরে। শেফ দ্য পার্টি ডুক লোমের কাছে বিস্তারিত বিবরণ আছে। লোকটি লেগে থাকতে জানে ও সবসময় চড়া বাজি ধরে। কপাল ভাল লোকটির। সন্ধ্যার খেলায় শনা দ্য ফেরে উঠেছে এত, বাকরাতে হয়েছে এত আর রুলেতে হয়েছে এত। রুলে বেশি লোকে যাচ্ছে না, কোনমতে খরচ উঠছে।
এরপর ধন্যবাদ বিনিময় করে সভা ভঙ্গ হল। সুইং ডোর ঠেলে বাইরে এল সে। ক্যাশ লুট করার কোন বাসনা ছিল না বন্ডের, সে কেবল বিষয়টা সম্বন্ধে সামান্য কৌতূহল বোধ করছিল। ক্লোকরুমে একরাশ ফ্র্যাঙ্ক দিয়ে ক্যাসিনোর সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল বন্ড। না, ল্যশিক কোনমতেই ক্যাশ লুট করার চেষ্টা করবে না। সুতরাং এই সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তা না করাই ভাল। তার চেয়ে বর্তমান চিত্রটি দেখা যাক। জুতার তলায় কাকরের মচমচ মুখটা তেতো তেতো, চোখ দুটো জ্বলছে। নাক যেন বন্ধ হয়ে আছে। বাইরে রাতের তাজা হাওয়ায় নিঃশ্বাস নিল বন্ড। এতক্ষণে সব অনুভূতিগুলো ফিরে আসছে। সেই সঙ্গে চিন্তাশক্তিও।
চওড়া পথ পেরিয়ে বাগানের মধ্যে দিয়ে ঢুকল হোটেল সঁপ্লেনডিডে। কেয়ারটেকারের কাছ থেকে চাবি ও টেলিগ্রাম নিল বন্ড। এল নিজের ঘরে দোতলায় ৪৫ নম্বরে। টেলিগ্রাম এসেছে জ্যামাইকা থেকে। লেখা আছে? কিংস্টন জ্যামাইকা…বন্ড সুপ্লেনডিড রয়্যাল লেজো খারাপ মাল উৎপাদন হাভানা সিগারের ফ্যাকট্রিতে ১৯১৫ এক কোটি রিপিট এক কোটি স্টপ আশা করি এই টাকায় চলবে শুভেচ্ছা। দ্য সিলভা তার মানে এক কোটি ফ্র্যাঙ্ক পাঠান হয়েছে। বিকেলে বন্ড প্যারিস মারফত লন্ডন হেডকোয়ার্টারের কাছে আরো টাকা চেয়েছিল। তারই জবাবে এই টেলিগ্রাম। প্যারিস থেকে লন্ডনে ক্লিমেন্টসের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানা যায় তিনি এম-এর শরণাপন্ন হয়েছেন। এম অগত্যা রাজি হয়ে ট্রেজারির সঙ্গে ব্যবস্থা করতে আদেশ দেন।
