.
তিতিরের ক ফোঁটা কান্না
কিসী হঠাৎ দেখতে পেল কালো কিমোমোয় ঢাকা একটা দেহ সমুদ্রের বুকে আছড়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, এ নিশ্চয়ই তারই লোক। জীবনে এত তাড়াতাড়ি সাঁতার সে কখনো কাটেনি।
পানিতে পড়ে বন্ড প্রথমটা খাবি খেতে থাকে তার সব কিছু অবশ হয়ে আসে। কিন্তু বাঁচার ইচ্ছাই ওকে সজাগ। করে তোলে। কিসী যখন ওর কাছে গিয়ে পৌঁছায় তখন গা-থেকে কিমোেনোটা প্রাণপণে খুলে ফেলার চেষ্টা করছে। কিসী কাতর ভাবে বলেছিল, আমাকে চিনতে পারছ না?
না, বন্ড কোন কিছুই চিনতে পারছে না। কেবল একটি মুখ, তার শত্রুর মুখ। কিসীর কথায় কান দেয়, যা বলছে শুনতে চেষ্টা করে বন্ড।
আমাকে অনুসরণ করে এসো তারো-সান। তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়লে আমি তোমাকে টেনে নিয়ে যাব। এই ধরনের উদ্ধার কার্যে আমাদের হাত পাকানো আছে।
কিসী সাঁতার কেটে এগিয়ে গেল কিন্তু বন্ড পারল না। আহত জন্তুর মত সে এক জায়গায় ক্ষীণভাবে ঘুরপাক খেতে লাগল। কিসীর শুধু কাঁদতে বাকি ছিল। কিসী ওকে ধরে থামাল, আস্তে আস্তে ওকে বুঝিয়ে বলতে ও কিসীর বুকের ওপর মাথা রাখল আর কিসী ওর হাতের তলা দিয়ে চালিয়ে দিল নিজের হাত তারপর পা দিয়ে দিয়ে চিত-সাঁতার কেটে কিসী ওকে টেনে নিয়ে চলল।
একটা মেয়ের পক্ষে আধমাইল স্রোতের সাথে যুদ্ধ করে চলা। সে এক আশ্চর্য সাঁতার। চাঁদের আলোয় পথ চিনে এগোচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত সে পানি থেকে টেনে তুলল বউকে। ওকে ডাঙায় ফেলে, সেও বন্ডের পাশে লুটিয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ পরে বন্ড উঠে বসল দুহাতে মাথা চেপে ধরে। সমুদ্রের দিকে শূন্য দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইল। কিসী তার একখানা হাত দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরতে বন্ড আরো ফ্যালফ্যাল করে তাকাল ওর দিকে। কে তুমি? আমি এখানে কি করে এলাম। তারপর বন্ড কিসীকে ভাল করে দেখতে লাগল। তুমি ভারি সুন্দর দেখতে। কিসী ওকে খুঁটিয়ে দেখল। তুমি কি কিছুই মনে করতে পারছ না?
বন্ড চোখ বুজে ভাবল তারপর বলল, কিছু না, শুধু একটা মানুষের মুখ মনে আছে। লোকটা বোধহয় মরে গেছে। তোমার নাম কি? আমাকে সব খুলে বল।
আমার নাম কিসী সুজুকি। তুমি আমার ভালবাসার লোক। তোমার নাম তারো তদোরকি। আমরা এই দ্বীপে বাস করি। কিন্তু তুমি কি এখন একটু হাঁটতে পারবে তোমাকে আমি বাড়ি নিয়ে যাব। তোমার মাথার একটা পাশ গুরুতর ভাবে জখম হয়েছে আর পাঁজরের কাছে কেটে গেছে। তোমাকে ডাক্তার দেখিয়ে সুস্থ করে তুলব। কিসী ওর হাত ধরে ওকে বাড়ি নিয়ে চলল। কিন্তু কিসী নিজের বাড়িতে ঢুকল না, বাড়ি ছাড়িয়ে, ক্যামেলিয়ার ঝোঁপ ছাড়িয়ে, শিনটো মন্দিরের পেছন দিয়ে সে বন্ডকে নিয়ে তুলল সেই গুহায়। গুহাটা মস্ত বড়। আমি তোমার সাথে এখানেই থাকব। আমি বিছানা খাবার-দাবার সব নিয়ে আসছি। তুমি এখন শুয়ে একটু বিশ্রাম কর। ডাক্তার তোমার সব অসুখ ভাল করে দেবেন।
কিসী পাহাড়ের পথ দিয়ে ছুটে চলল। মনের মানুষকে সে ফিরে পেয়েছে, ওকে যেমন করে তোক নিজের কাছে ধরে রাখবেই। কিসী তার বাবা মাকে সব কথা বলল। ও দুধ গরম করল, বিছানা নিল, বাবার সবচেয়ে ভাল কিমোনোটা নিল, বন্ডের দু একটা টুকিটাকি জিনিস নিল। মেয়ের এই ধরনের খেয়াল এবং স্বাধীনতার সাথে তার বাবা মার খুব পরিচয় ছিল। তার বাবা শুধু বলল, যদি কানুশিসান তাদের আশীর্বাদ করেন তাহলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিসী নিজেকে ধুয়ে গায়ের লবণ তুলে ফেলল তারপর তার সেই একমাত্র বাদামী কিমোনোটা গায়ে গলিয়ে নিয়ে সে ফের পাহাড়ের পথ দিয়ে গুহার দিকে ছুটে চলল।
কিসী পরে পুরোহিতের সাথে দেখা করল। তার মুখ গম্ভীর। তিনি যেন তার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। কিসী হাঁটু গেড়ে বসেছিল তাঁর সামনে। পুরোহিত হাত তুলে আশীর্বাদ করে বললেন, কিসী-চান, আমি জানি। সব জানি সেই শয়তানটা মারা গেছে। তার বউটাও মরেছে সেই সঙ্গে। মৃত্যুর দূর্গ একদম ধ্বংস হয়ে গেছে। আমাদের ছয় অভিভাবক যা ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন, ঠিক তাই হয়েছে। সমুদ্র পার থেকে লোক এসেই এ কার্য উদ্ধার করেছে। সেই লোক এখন কোথায়?
মন্দিরের পেছনের গুহায়, কানুশি-সান। ভীষণভাবে জখম হয়েছে। আমি তাকে ভালবাসি। তাকে আমি নিজের কাছে রাখতে চাই। অতীতের কথা সে কিছুই মনে করতে পারছে না। আমি চাই ও ভুলেই থাকুক। তাহলে আমরা বিয়ে করতে পারি, তাহলে ও কুরো দ্বীপের সন্তান হয়েই চিরদিন এখানে থেকে যেতে পারে।
তা হয় না মা। সময় হলে ও সব ফিরে যাবে। তারপর একদিন ফিরে যাবে পৃথিবীর বুকে। নিজের দেশে ও নিশ্চয়ই একজন কেউকেটা লোক।
কিসী বলল, আমি শুধু ওকে একটু কাছে রাখতে চাই, যত্ন করতে চাই। যতদিন আমি পারব। যদি এমন দিন আসে ও স্বেচ্ছায় চলে যেতে চায় আমি বাধা দেব না। ও সুস্থ হয়ে ওঠার পর ও যাতে সুখী হয় তা আমি দেখব। আমি সামান্য হলেও ওকে সাহায্য করেছি। আমি তার প্রাণ বাঁচিয়েছি। এর বিনিময়ে আমি কি একটু কিছুও পেতে পারি না? সৃষ্টিকর্তা পাঠিয়েছেন এই বীর পুরুষকে আমাদের কাছে। কুরো দ্বীপের অধিবাসীদেরও কি উচিত নয় তাকে সম্মান জানান।
পুরোহিত চোখ বুজে মৌন হয়ে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। তিনি কিসীর মুখের দিকে চেয়ে বললেন, আমার দ্বারা যা সম্ভব আমি তা করব। এখন ডাক্তারকে আমার কাছে একবার পাঠিয়ে দাও। তারপর নিয়ে যেয়ে তাকে গুহায়। এখন বেশ কিছুদিন তুমি খুব সতর্ক থাকবে। এখন কিছুদিন গুহা থেকে একেবারেই বের হওয়া চলবে না।
