বন্ড ছুটে গেল বারান্দার কোণে। একটা স্তম্ভের সাথে বেলুনের কাছি বাঁধা। একটু পরখ করে দেখে নিল। এইসময় কেল্লার ভিতর থেকে চেঁচামেচি ভেসে এল। বন্ড তাড়াতাড়ি রেলিং-এ উঠে ফ্রেমের গায়ে নিজের পা রাখার মত একটু জায়গা করল। তারপর ডান হাতে ওপরের কাছিটা ধরে বাঁ হাতে তলোয়ার দিয়ে কাছিটা কেটে ফেলল তলা থেকে। তারপর সে শূন্যে ভেসে চলল। রাতের মৃদু হাওয়ায় চালোকিত পার্ক পেরিয়ে বন্ড আস্তে আস্তে ভেসে চলল সমুদ্রের দিকে। কিন্তু তার বেলুন ক্রমশ ওপরে উঠছিল।
এ সময় কেল্লার ওপর তলা থেকে ফটাফট আওয়াজ আসতে লাগল। নীল, হলুদ আগুনের কয়েকটা ফুলকি, বো বোঁ শব্দে বন্ডের পাশ দিয়ে ছিটকে গেল। এভাবে ঝুলে থাকতে থাকতে তার হাত পা অবশ হয়ে আসছিল। হঠাৎ কি যেন একটা এসে লাগল ওর মাথার বাঁদিকে। ও বুঝতে পারল সব শেষ হয়ে আসছে। কেল্লাটা চাঁদের আলোয় যেন দুলতে লাগল। একটু পরে কেল্লাটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। প্রথমে প্রচণ্ড গরম হাওয়া তারপর হাওয়ায় বাজল বক্স বন্ডকে যেন ভীষণভাবে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল।
বন্ডের বেলুনটা গুলিতে ফুটো হয়ে গিয়েছিল। সেটা দ্রুত নিচে নামতে থাকল। নিচে কোমল ঢেউ খেলানো সমুদ্র। বন্ড তাতেই শয্যা পাতল। সে হাত-পা ছেড়ে দিয়ে সমুদ্রের বুকে মুখ গুজল একটু শান্তির আশায়। তার সব যন্ত্রণার যেন অবসান হল পানির কুলুকুলু প্রবাহে।
.
G. M. লিখেছেন
পাঠকেরা হয়ত আগেকার কাগজ থেকে অবগত আছেন যে, প্রতিরক্ষামন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপদস্থ অফিসার জেমস বন্ড সি. এম. আর. এন. ভি. আর.-কে কিছুদিন যাবত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি কার্যসূত্রে তিনি জাপানে গিয়েছিল। আশংকা করা হচ্ছে, তিনি হয়ত সেখানেই নিহত হয়েছেন।
দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে তার বেঁচে থাকার আশা অতঃপর আমাদের ত্যাগ করতে হচ্ছে। তিনি আমাদের বিভাগে অত্যন্ত সুনামের সাথে কাজ করে গেছেন। বিভাগীয় প্রধান হিসেবে এখন আমার ওপর গুরু দায়িত্ব পড়েছে সেই অফিসারের অসাধারণ কর্মকুশলতা এবং দেশের প্রতি কর্তব্য নিষ্ঠার কিছু কিছু বিবরণ জানাবার।
জেমস বন্ডের বাবা অ্যান্ড্র বন্ড ছিলেন জাতে স্কটিশ। গ্লেনগোর লোক তিনি। আর মা ছিলেন জাতে সুইশ। জেমস্ এর প্রাথমিক শিক্ষা বাইরে। ফ্রান্স ও জার্মান ভাষায় তাই তার অসাধারণ দক্ষতা জন্মায়।
এগারো বছর বয়সে বন্ড তার বাবা মাকে হারায়। তখন তার অভিভাবক হন এক ফুফু। নাম চারমেন বন্ড। তিনিও এখন মারা গেছেন। তার ফুফু ছিলেন শিক্ষিতা। বন্ড তাঁর কাছ থেকেই ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হবার উপযোগি শিক্ষা লাভ করে। যখন তার বয়স বারো তখন সে পরীক্ষায় ভাল ভাবে পাস করে ইচীন ঢোকে। আড়াই বছর থাকার পর সেখানে এক কেলেংকারী হয়। ফুফু তখন তার বাবার পুরোনো স্কুলে তাকে ভর্তি করে দেন। ক্রীড়া, কুস্তিতে ওই স্কুলে বরাবর নাম তার ছিল। ও যখন স্কুল ছাড়ে তখন ওর সতের বছর বয়স। এর মধ্যে জেমস দু-দুবার স্কুলের হয়ে লাইট ওয়েটে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামে। তাছাড়া ওরই উদ্যোগে সাধারণ ইংরেজি স্কুলে জুডো শিক্ষার প্রথম প্রবর্তন হয়। ১৯৪১ সাল নাগাদ বন্ডের বয়স যখন উনিশ তখন বাবার এক পুরোনো সহকর্মীর সহযোগিতায় বন্ড চাকরিতে ঢোকে। যে দপ্তরে ঢুকেছিল সেটাই পরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনে চলে আসে। এখানে তাকে বিশ্বস্ত গোপনীয় ধরনের কাজ করতে হত। সেই জন্য তাকে আর. এন. ভি. আর-এর স্পেশ্যাল-ব্রাঞ্চের লেফটেন্যান্ট করে দেওয়া হয়। যুদ্ধের সময় তার কাজকর্মে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে তার ঊর্ধ্বতন অফিসারেরা পরে তাকে কম্যান্ডার করে দেন। এ দুঃখজনক নিখোঁজ হবার আগে পর্যন্ত সে এখানেই কাজ করেছে এবং ধাপে ধাপে সিভিল সার্ভিসের প্রধান অফিসার পর্যন্ত হয়েছিল। তার সহকর্মীরাই বলবে, সে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সাহসিকতার সাথে কাজ করত। জরুরী অবস্থায় পড়লে তার যেন বিশেষ ক্ষমতা খুলত। কাজের খাতিরে তাকে বহুবার অত্যন্ত বিপদজনক অভিযানে যেতে হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই বিপদের মুখ থেকে সে কোন-না-কোনভাবে বেরিয়ে আসতে পেরেছে।
বাইরের কাগজে তার কিছু অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে প্রচুর হৈচৈ, লেখালেখি হয়। তাতে তাকে খুব জনপ্রিয় করে তোলে। এই অগাধ জনপ্রিয়তার জন্য তাকে নিয়ে পরপর বই লেখাও শুরু হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের মন্ত্রণালয় এসব উপন্যাসকে অত্যন্ত ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের চোখে দেখে।
এই স্মৃতি লিখনের উপসংহারে শুধু একটা কথাই বলতে বাকি রয়েছে। কম্যান্ডার বন্ডের বন্ধুরা জেনে রাখুন যে, তার এই শেষ অভিযান ছিল দেশ ও রাষ্ট্রের পক্ষে সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, কম্যান্ডার বন্ড হয়ত আর ফিরে আসবে না। তবু তার শেষ কাজ পরিপূর্ণ সাফল্যের সঙ্গেই সে সম্পূর্ণ করতে পেরেছে। একটি মানুষের এই নির্ভীক সাহসিকতা এ তল্লাটের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বহুতর নিশ্চয়তা দিয়েছে।
১৯৬২ সালে টেরেসা নামে একটি মেয়ের সাথে তার বিবাহ হয় কিন্তু সেই বিয়ে অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী হয়। তাদের কোন সন্তান-সন্ততি নেই। আমার যতদূর জানা আছে তার কোন আত্মীয়-স্বজনও জীবিত নেই।
এম. জি. লিখেছেন : গত তিন বছর ধরে তার সাথে কাজ করে আমি আনন্দিত ও গর্বিত। তার সম্বন্ধে যে আংশকা আমরা করছি তা যদি সত্যি হয়, তাহলে তার স্মৃতিফলকে কয়েকটি সহজ কথা উৎকীর্ণ করে দেবার প্রস্তাব কি আমি এখানে করতে পারি? এখানে তার বহু সহকর্মী ও অধস্তন কর্মচারিরা তার এই বিশেষ আপ্তবাক্যে বিশ্বাস করেন বলেই মনে হয় ও অকারণ দীর্ঘ ও প্রলম্বিত করার জন্য আমি আমার দিনগুলোকে নষ্ট করতে চাই না। তার চেয়ে আমি আমার সময়ের সদ্ব্যবহার করব।
