তাহলে মিঃ বন্ড, সেই অপারেশন থান্ডার বল নেবার জন্য তৈরি হও। ওই পরিকল্পনায় আমি গোটা পশ্চিমী দুনিয়াকে নিজের কবলে এনে শাসিয়ে রেখেছিলাম। যা চেয়েছিলাম তা যদি করতে পারতাম এবং যে-টাকা চেয়েছিলাম তা যদি পেতাম তাহলে দেখানো যেত যে আশংকা সব সময় থেকেই যাচ্ছে। বিপজ্জনক খেলনা যা নাকি সবসময় ভুল লোকের হাতে পড়ার সম্ভাবনা তা বরাবরের জন্য পরিত্যক্তও হতে পারত। তাছাড়া ইংল্যান্ড এখন সবরকমে এক অসুস্থ দেশ। সেই অসুস্থতা যদি মৃত্যুতে ত্বরান্বিত হয় তো বাধা কি! ব্লোফেল্ডকে কেমন যেন অন্যমনস্ক দেখাল। ক্লোফেল্ড আবার বলতে শুরু করল আমি তোমাকে একটা সত্যি কথা খুলে বলি, মিস্টার বন্ড। আমার মনে কিছু নিদারুণ দৌর্বল্য আছে, যার সাথে আমি অবিরাম লড়াই করে চলি। কারণ আমার অদ্ভুত প্রতিভা সত্বেও আমি জগতে একা। উপযুক্ত সম্মান তো পাইনি। উপরন্তু লোকে আমাকে ভুল বুঝছে। সন্দেহ নেই এই ধড়ফড়ানির মূল কারণ অনেকটাই শারীরিক। লিভার, কিডনী, হার্ট-এর ব্যাপার–মাঝ বয়সে যা যা উপসর্গ হয় আর কি! সাথে জুটেছে কিছু মানসিক অবসাদ। তাই মিস্টার বন্ড আমি মাথা খাঁটিয়ে এই পরিকল্পনা বার করেছি–জীবনের বোঝা বয়ে বেড়ানোর অপরিসীম যন্ত্রণা থেকে যারা মুক্তি চায় তাদের জন্য আমি এই অনায়াস মৃত্যুর ব্যবস্থা করেছি। তুমি নিশ্চয়ই স্বীকার করবে যে, এটা অপরাধ দূরস্থান, বরঞ্চ এক জনহিতকর কাজ। পৃথিবীর ইতিহাসে অচিন্তনীয়। যা অনেক বাজে কথা হল। এখন বল তুমি কিভাবে মরতে চাও। নিজেই সম্মানজনক ভাবে মাথা পেতে দেবে না কি বিশ্রীভাবে তোমার মুণ্ডটা আমার কেটে ফেলতে হবে। ব্লোফেন্ড এক পা এগিয়ে এসে সেই বিশাল তলোয়ারটা মাথার ওপর তুলে ধরল।
বন্ড জানতে কি করতে হবে। ওই স্ত্রীলোকটির হাতের কাছেই একটা বেল রয়েছে। আগে ওর একটা ব্যবস্থা করা দরকার। বন্ড লাফিয়ে পড়ল বাঁদিকে। একটা লাঠি তুলে নিয়ে স্ত্রীলোকটির ওপর উঁচিয়ে ধরল, লাঠিটা পড়ল তার মাথার একপাশে। সে হাত-পা ছড়িয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল চেয়ার থেকে। পড়ে একদম নিস্পন্দ হয়ে রইল তার শরীর। ক্লোফেল্ড-এর তলোয়ার আছড়ে পড়ল হাওয়ায়। বন্ডের কাঁধ থেকে ইঞ্চি কয়েক দূরে। বন্ড পাশ কাটিয়ে ফের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। লাঠিটা বাঁ হাতের মুঠোয় ধরে মারল এক প্রবল খোঁচা। সেটা গিয়ে লাগল ক্লোফেল্ড-এর বুকের খাঁচায়। কিন্তু নিজেকে সামলে সে আবার প্রচণ্ড শক্তিতে এগিয়ে এল। তার হাতের তলোয়ার কাস্তের মত ঘুরছে। তলোয়ারের ডগা যেন বন্ডের পাঁজরে একবার আলতো টোকা দিয়ে গেল। বেরিয়ে এল রক্ত।
কিন্তু ব্লোফেন্ড ফের পিছিয়ে যাবার আগেই বন্ড তার পা লক্ষ্য করে লাঠি চালাল। তাক বুঝে ব্লোফেন্ড-এর ডান কাঁধে প্রচণ্ড বেগে লাঠি বসিয়ে দিল। ক্লোফেল্ড মওকা বুঝে সমানে আক্রমণ করতে লাগল। হিংস্র আবেগে খুঁচিয়ে চলল। বন্ড এই প্রথম অনুভব করল যে তার পরাজয় অনিবার্য। সেই কথা ভেবে তার শরীর হিম হয়ে যেতে লাগল। ব্লোফেন্ড বুঝতে তলোয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বন্ড এগিয়ে এসে তলোয়ারের মার লাঠি দিয়ে আটকে ফেলে দিল হাতের লাঠিটা। তারপর ব্লোফেন্ড-এর গলা লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিল। দু হাতে টুটি টিপে ধরল ওর। কয়েক মুহূর্তের জন্য দুটো ঘর্মাক্ত মুখ পরস্পরের খুব কাছাকাছি এল। ব্লোফেন্ড তলোয়ারের বাঁট দিয়ে বন্ডকে প্রাণপণে আঘাত করে চলেছে। বন্ড সেই আঘাত একদম গ্রাহ্য করল না। দুই থাবা গলায় বসিয়ে ও সজোরে টিপে চলল, টিপেই চলল।
একসময় ক্লোফেন্ড-এর হাত থেকে তলোয়ার খসে পড়ল সশব্দে।
তখন ব্রোফেন্ড নখ বসিয়ে বন্ডের নাক মুখ যেন ছিঁড়ে-খুঁড়ে ফেলতে চাইল। চোখ খুলে নেবার চেষ্টা করছিল ব্লোফেন্ড। বন্ড দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলে উঠল, এবার তুমি মর।
ব্লোফেন্ড-এর শরীর পিছলে পড়ল মাটিতে। জিভটা বেরিয়ে এল, চোখ কপালে উঠল। তার শরীরটা পিছলে পড়ল মাটিতে। বন্ড কিন্তু তখনো সাঁড়াশির মত ধরে তার গলা। বন্ড তখন এক প্রবল রক্ত তৃষ্ণায় সব কিছু ভুলে গিয়েছে।
বন্ডের হুঁশ ফিরল। সে উঠে দাঁড়াল। কালো সিঙ্কের কিমোনো থেকে সোনালি ড্রাগনের মুখ যেন লকলকে আগুন উগরে দিচ্ছে! যন্ত্রণায় যেন তার মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। ব্লোফেন্ড-এর তলোয়ারটা কুড়িয়ে নিয়ে প্রায় ঘুমের ঘোরে টলতে টলতে বন্ড প্যাসেজ পেরিয়ে চলল সেই ঘরটায় যেখানে তার ওপর খানিক আগে অত্যাচার চালানো হয়েছিল।
ঘড়ি দেখল। বারোটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। ওই সেই কাঠের বাক্সটা। বন্ড তলোয়ারের এক ঘায়ে বাক্সটার ডালা খুলে ফেলল। ভেতরে প্রকাণ্ড এক চাকা। হাঁটু গেড়ে বসে বন্ড চাকাটা ঘুরিয়ে চলল। কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দিল। এবার ছুটে গেল প্যাসেজের দিকে। এখন তাকে বের হতে হবে। এই জায়গা থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালাতে হবে। কিন্তু পালাবার পথ বন্ধ। ওদিকে রক্ষীরা আছে। একটা পর্দা ছিঁড়ে ফেলে, তলোয়ারের ঘায়ে জানালার কাঁচ ভাঙল বন্ড। বাইরে বারান্দা। তলার দিকে মুখ বাড়িয়ে দেখল কাঁকর বিছান রাস্তা অন্তত একশ ফিট নিচে।
হঠাৎ ওপরে কোথায় যেন বাঁশির মত এক সরু শিস্ ভেসে এল। বন্ড মুখ তুলল। বেলুনটায় হাওয়া লেগে শব্দ হচ্ছে। বন্ডের মাথায় এক বুদ্ধি এল। ওই গ্যাস বেলুন যদি পঞ্চাশ ফিট ফ্রেম-করা এক মস্ত নিশানকে ধরে রাখতে পারে–তাহলে একটা মানুষের ওজনকে কিছুক্ষণ ধরে রাখতে পারবে না?
