বন্ডের মনটা তখন কোথায় যে পড়ে ছিল কে জানে, টেলিফোনের আওয়াজ হতেই সেটি তুলে নিল।
স্যার?
চেয়ার ছেড়ে উঠে কোটটা তুলে নিল। গায়ে দিয়ে পরিপাটি করে নিল। লাগোয়া অফিস ঘরে গিয়ে ঢুকল, মেরি গুডনাইট সেখানে বসে। ওকে দেখে শুধু বলল, M। তারপর পাশের কমুনিকেশন্স সেকশন, অর্থাৎ যোগাযোগ বিভাগের কর্মচঞ্চলতার অস্ফুট শব্দের মধ্যে দিয়ে কার্পেট মোড়া অলিন্দ পার হয়ে লিফটের কাছে গিয়ে পৌঁছল। তারপর একেবারে আট তলায়।
M-এর সেক্রেটারি মিস মানিপেনির মুখ দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই। মানিপেনি নিজে কিছু জেনে থাকলে হাবে-ভাবে যেভাবে হোক বন্ডকে তার আভাস দেয়। কিন্তু আজ তার মুখে হাসি দেখে মনে হচ্ছে কেমন যেন নিরাসক্ত ভাব। বন্ড নিজের মনটাকে তৈরি করে নিয়েই দরজার ভিতরে পা বাড়াল।
বন্ড ঢুকে দেখল, M-এর বাঁ দিকে অচেনা এক ভদ্রলোক বসে আছেন।
M বললেন, আমাদের গবেষণা বিভাগের কম্যান্ডার বন্ডএর সঙ্গে বোধহয় পরিচয় নেই আপনার, ডঃ ফ্যানশ। ভদ্রলোকের চোখের চাহনি দেখে বন্ডের মনে হল, লোকটার চোখে শাটার লাগানো আছে–এক সেকেন্ডের হাজার ভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যে খোলে আবার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বোঝাই যাচ্ছে লোকটা হয়ত বিশেষজ্ঞ হবেন। তত্ত্ব আর বস্তু নিয়েই যার কারবার–মানুষ নিয়ে নয়। ভদ্রলোক মাঝবয়সী, চেহারা ভাল পোশাকের বাহার আছে। চওড়া রুমাল-মার্কা টাইয়ের ওপর মুক্তা বসানো পিন। হাতার কাফ লিঙ্কগুলো দেখে মনে হচ্ছে প্রাচীন মুদ্রা দিয়ে গড়া, চওড়া কালো ফিতেয় বাঁধা পাঁশনে চমশা–পুরনো এড়ওয়ার্ডিয়ান ফ্যাশনের আধুনিক সংস্করণ। বন্ড মনে মনে ছকে নিল, লেখক-টেখক হবে, সমালোচকও হতে পারেন।
M বললেন, ডঃ ফ্যাশ হচ্ছেন প্রাচীন মণি মুক্তো সম্বন্ধে একজন বিশিষ্ট পণ্ডিত। মণি-মুক্তোর ব্যাপারে উনি আবার এইচ এম কাস্টম্স, আর সি আই ডি বিভাগের উপদেষ্টা। এটা অবশ্য বাইরে কারও জানবার কথা নয়। MIx-এর দপ্তরে আমাদের যে সব সতীর্থরা আছেন, তারাই আসলে আমার কাছে আসতে বলেছেন ওঁকে। ব্যাপারটা আবার আমাদের মিস ফ্রয়েডেনস্টাইনকে নিয়ে।
মারিয়া ফ্রয়েডেস্টাইন হল গুপ্তচর; ইংল্যান্ডের সিক্রেট সার্ভিসের বুকের ওপর বসে সোভিয়েত ইউনিয়নের K.G.B.-র হয়ে কাজ করে যাচ্ছে। কম্যুনিকেশন্স ডিপার্টমেন্ট অর্থাৎ যোগাযোগ বিভাগে রাখা হয়েছে তাকে, তবে খুব একটা আঁটসাট গণ্ডীর মধ্যে। বিশেষ করে ওর জন্যই কাজের চৌহদ্দিটা সৃষ্টি করা হয়েছে। ওর একমাত্র কাজ হল, পার্পল সাইফার নামে বিশেষ এক ধরনের সাঙ্কেতিক সংবাদ লিপির গতি করা–এই পার্পল সাইফার -এর সৃষ্টিও বিশেষ করে ওরই জন্য।
ওর কাজ হল সারাদিনে ছ বার করে লম্বা লম্বা সব সংবাদ লিপি এই এই সাংবাদিক ভাষায় ঢেলে সাজানো এবং ওয়াশিংটন-এ CIA-র দপ্তরে পাঠান। এই খবরগুলো সাজানো হয় সেকশন্ত 100 থেকে। যে সব গুপ্তচর এক পক্ষের হয়ে কাজ করবার ভান করে, সেই সব ডবল এজেন্টদের নিয়েই এই সেকশন 100-র কারবার।
সিক্রেট সার্ভিস জানত যে মারিয়া ফ্রয়েডেনস্টাইন সোভিয়েত গুপ্তচর, এবং জেনেশুনেই তাকে নেওয়া হয়েছে সিক্রেট সার্ভিসে। পার্পেল সাইফার-এর সাঙ্কেতিক লিপির পাঠোদ্ধার করার সূত্রটি যাতে সে চুরি করে হাতিয়ে নিতে পারে, ইচ্ছাকৃতভাবে সে সুযোগটাও দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল রাশিয়ানরা এই সব খবরগুলো পাক, এবং ঠিক সময়ে ভুল খবরে বিশ্বাস করে বসুক। এসব কাজ অত্যন্ত গোপন রাখতে হয়, খুব বুঝেসুঝে ব্যবস্থা করতে হয়, একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেলেই ফাঁস হয়ে যাবে। তবে বছর তিনেক হল কোন ঝামেলায় পড়তে হয়নি।
M ডঃ ফ্যানস-র দিকে ফিরে চাইলেন। ব্যাপারটা বরং আপনিই বলুন ডক্টর, কম্যান্ডার বন্ড শুনে নিক।
বন্ডের দিকে এক ঝলক দেখে নিয়ে ভদ্রলোক বলতে শুরু করলেন, ব্যাপারটা হল ফাবেয়ার্জে বলে একজন বিখ্যাত রাশিয়ান মণিকার। বিপ্লবের আগের যুগে জার আর জার মহিষীদের জন্য অবিশ্বাস্য রকমে দামী দামী সব ঈস্টার এগ তৈরি করতেন। তিনি অনেক রকম কাজে হাত পাকিয়েছিলেন, মণি মাণিক্য দিয়ে দামী দামী ঈস্টার এগ তৈরি করা তারই মধ্যে একটা। তা ছাড়াও আরও অনেক রকম অপূর্ব সব জড়োয়ার কাজ করে গেছেন, যাকে বলা যায় শিল্পকলার অপূর্ব ঐতিহাসিক নিদর্শন। যে কোন জুয়েলারের দোকানে তাঁর তৈরি সেরা জিনিসের যা দাম, শুনলে সত্যি বিশ্বাস করা যায় না। তার সবচেয়ে বিস্ময়কর শিল্পকর্মের একটি নিদর্শন সম্প্রতি এ দেশে এসে পৌঁছেছে–যাকে বলা হয় মরকত গোলক। তারই আঁকা একটা নকসা থেকেই জিনিসটার কথা জানতে পারা গিয়েছিল, আসল। জিনিসটার সন্ধান কেউ জানত না। প্যারিস থেকে রেজিস্ট্রি করে জিনিসটা যার নামে এসেছে তিনি হলেন মিস মারিয়া ফ্রয়েডেনস্টাইন।
আপনি খবরটা পেলেন কি করে, ডক্টর জানতে পারি?
আপনার চীফ তো আগেই বলেছেন, প্রাচীন সব জড়োয়ার জিনিসপত্র বা ঐ ধরনের ব্যাপারে কাস্টমস আর এক্সাইজ বিভাগ থেকে আমার পরামর্শ নেওয়া হয়। মূল্যবান কোন জিনিস বিদেশে পাঠাতে হলে, তার দাম জানিয়ে দিতে হয়। এই জিনিসটার দাম বলা হয়েছে এক লক্ষ পাউন্ড। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক। স্বরাষ্ট্র দপ্তরের পরোয়ানা নিয়ে এই প্যাকেটটা খোলা হয়েছিল এবং আমাকে ডাকা হয়েছিল ভালভাবে দেখে একটা দাম কষে দেবার জন্য। মিঃ কেনেথ স্নো ম্যানের লেখা আমি পড়েছি, তাতে যা বিবরণ আর নক্সা আছে, তাই থেকে ওটাকে মরকত গোলক বলে চিনে নিতে মোটেই বেগ পেতে হল না। ওদের আমি জানালাম যে, একটা ব্যাপারে আমার খটকা লাগছে সেটা হল, সঙ্গের দলিলটা রাশিয়ান আর ফরাসি ভাষায় জিনিসটার আদি সূত্রের হদিশ লেখা আছে তাতে। একটি ফটোস্ট্যাট কপি দেখিয়ে বলতে শুরু করলেন, কপিটা আমিই করেছি। ওর মধ্যে যা আছে তার সারমর্ম হল, মিস ফ্রয়েডেনস্টাইন এর পিতামহ ১৯১৭ সালে সরাসরি ফাবেয়ার্জে-কে এই বস্তুটি তৈরির ফরমাস দেন। বোঝাই যায় যে, নগদ রুবলের বদলে চট করে সরানো যায়, এমন একটা সুবিধা মত দামী জিনিসের দরকার হয়েছিল। ১৯১৮ সালে তার মৃত্যুর পর, জিনিসটা তার ভাইয়ের হাত আসে, তারপর ১৯৫০ সালে মিস্ ফ্রয়ডেনস্টাইনের মার হাতে। ইনি খুব ছোট বেলাতেই রাশিয়া ছেড়ে চলে আসেন, প্যারিসে এসে দেশ ত্যাগী জারপন্থী রাশিয়ান অধিবাসীদের মহল্লায় বসবাস করতে থাকেন। বিয়ে করেননি, কিন্তু অবৈধ সন্তান এই মানিয়ার মা হন। গত বছর তিনি মারা যান। এবং তারই কোন বন্ধু বান্ধব বা সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক–দলিলে কারও সই নেই–তার নায্য উত্তরাধিকারিনী মারিয়া ফ্রয়েডেনস্টাইন-এর কাছে এই মূল্যবান সম্পত্তিটি পাঠিয়ে দিয়েছে।
