কিন্তু লোকটা কে?
লোকটার কাগজে লেখা আছে ও যোবা এবং কালা। আর যে সব কাগজপত্র রয়েছে, সেগুলোতে লিখেছে লোকটা ফাকুওকার এক খনি মজুর। আমার অবশ্য বিশ্বাস হয় না। ব্লোফেন্ড মেয়েমানুষটির দিকে ফিরে দাঁড়ায়। তুমি কি মনে কর, ইরমা? তোমার তো এসব ব্যাপারে নাক খুব পরিষ্কার। ইরমা বাট উঠে বন্ডের পাশে এসে দাঁড়ায়। চোখ দিয়ে প্রায় বিদ্ধ করে ওকে দেখতে থাকে তারপর আস্তে আস্তে ওর চারপাশে ঘোরে। বন্ডের দিকে তখনো ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছে ইরমা। চাপা কণ্ঠস্বরে বলে ওঠে, হতে পারে না। তবু সে-ই। ডান গালে সেই কাটা দাগ। মুখের আদল মিলছে। ভুরুটা কামিয়েছে। ইমা বলে উঠল, এ সেই ইংরেজ এজেন্ট। সেই জেমস বন্ড। এই লোকই স্যার হিলারী ব্রে নামে নাম ভাঁড়িয়ে গিয়েছিল। আমি দিব্যি করছি। তোমাকে আমার কথা বিশ্বাস করতেই হবে, অর্নস্ট।
ব্লোফেন্ড-এর চোখ ছুঁচলো হয়ে আসে। কিছু কিছু মিল আমিও দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু ও এখানে এল কি করে? কে পাঠিয়েছে ওকে
জাপানি সিক্রেট সারভিস। ব্রিটিশ সিক্রেট সারভিসের সাথে নিশ্চয়ই তাদের সম্পর্ক আছে। ব্যাপারটার অনেক কিছু খটকা থেকে যাচ্ছে। আমাদের খুব সতর্ক হয়ে এগোতে হবে। এই লোকটার পেট থেকেই বার করতে হবে সব কথা। লোকটা বোবা-কালা কি না তা আমাদের এক্ষুণি বার করে ফেলা দরকার। জেরা ঘরে ফেললেই সেটা টের পাওয়া যাবে। কিন্তু তার আগে একটু ঠাণ্ডা করা দরকার।
.
জেরা ঘর
এখন ঘরে দশজন প্রহরী। তাদের প্রত্যেকের হাতে লম্বা লম্বা আসাসোটা। একটি লোক বন্ডের দিকে এগিয়ে এল। লোকটাকে দেখতে প্রকাণ্ড এক বাসের মত। পাকা ফলের মত মাথায় চকচকে টাক। লোকটা প্রবল বেগে ডান হাত চালাল বন্ডের মাথা লক্ষ্য করে। বন্ডের মাথায় যেন আগুনের গোলা ফাটতে লাগল। তারপর চালাল বাহাত। বন্ডের মাথা আরেকদিকে হেলে পড়ল। রক্তের ঝিরিঝিরি কুয়াশার মধ্য দিয়ে বন্ড ব্লোফেন্ড আর সেই স্ত্রী লোকটিকে দেখতে পাচ্ছিল। বন্ড পরপর দশটা ঘুষি হজম করল। ও বুঝতে পারছিল যে, মনের এবং শরীরের শক্তিটুকু থাকতে থাকতে কিছু একটা করা দরকার। লোকটি তার পা দুটি ফাঁক করে দাঁড়িয়েছিল। ওর মোক্ষম তাক করতে সুবিধে হল। আর লোকটা যখন সামো প্যাট পয়জারের কিছুই জানে না। আর একটা প্রচণ্ড ঘুসি যখন মাঝ পথে, সেই সময় বন্ড তার শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে এক প্রবল লাথি ওপর দিয়ে ছুঁড়ল। ঠিক জায়গায় সজোরে গিয়ে পড়ল ওর পা। লোকটা আহত জন্তুর মত আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
তাই দেখে রক্ষীগুলো তাদের আসাসোটা বাগিয়ে একসঙ্গে এগিয়ে এল, কোন তার বন্দুক বার করল। পাশেই একটা লম্বা খাড়া চেয়ার। আত্মরক্ষার জন্য বন্ড সেটাকে লাফ মেরে তুলে নিল। তুলে ছুড়ল দাঁত মুখ খিঁচিয়ে ধেয়ে আসা ওই রক্ষীগুলোর দিকে। চেয়ারের একখানা পা ধা করে গিয়ে লাগল একটা লোকের মুখে। লোকটা হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে ধড়াস করে পড়ল মাটিতে।
ব্লোফেন্ড চিৎকার করে বলে উঠল সিধে রাস্তায় লোকটা কথা বলবে না। শুনতে যদি ও পায় তাহলে জেরা ঘরে ফেললেই বুঝবে ঠ্যালারাম বাবাজী। ওকে সেখানে নিয়ে যাও।
কোন আদেশ দিতেই রক্ষীগুলো চলে গেল। কোন তখন বন্দুকের আগা দিয়ে ইশারা করল বন্ডকে। বইয়ের প্রকাণ্ড তাক সরিয়ে ছোট্ট এক দরজা বার করল। সরু পাথরের সিঁড়ি নেমে গেছে নিচের দিকে। সেই দিকে যেতে ওকে নির্দেশ করল।
সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে বন্ড। ক্লোফেন্ড-এর টুটি টিপে ধরার একটা সুযোগ পাওয়া যাবে না! যেত, যদি এই একটি জিনিস ও সাথে নিয়ে আসতে পারত। প্যাসেজ পেরিয়ে আগে আগে চলছিল বন্ড। তার পিঠে পিস্তল ঠেকানো। পাথরের তৈরি এক অদ্ভুত ঘরে গিয়ে ঢোকে। ঘরটা ভীষণ গরম। রোফেন্ড আর সেই মেয়ে মানুষটি ঢুকতে দরজা বন্ধ হল। ওরা গিয়ে বসল কপির তলায় পাতা দুটো আরাম কেদারায়। কোন বন্ডকে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিল যে, বারো পা এগিয়ে ঘরের শেষ প্রান্তে যেতে। সেখানে বেদীর মত উঁচু একটা পাথরের আসন, তাতে আবার হাতল লাগানো। বেদীর ওপর ফোঁটা ফোঁটা কাদা শুকিয়ে রয়েছে, সারা মেঝে জুড়ে তেমনি আগ্নেয়গিরির গলিতে নোংরা ছড়ানো। পাথরের আসনটার ঠিক ওপরে মাথার কাছে একটা গোল গর্ত। বন্ডকে যা বলা হল ও তাই করল। গরম চটচটে কাদায় ওর পেছনের চামড়া কুঁচকে এল। হাতলে হাত রেখে ক্লান্ত বন্ড অপেক্ষা করতে লাগল। এসবের অর্থ বুঝতে পেরে পেটের ভেতরটা ওর খামচে উঠছিল।
ব্লোফেন্ড-এর গলার স্বর ভেসে এল। কম্যান্ডার বন্ড এটার নাম জেরা ঘর। আমার নিজের আবিষ্কার এই জিনিস এর এমন অনিবার্য শক্তি যে, একেবারে নির্বাক লোককেও কথা বলিয়ে ছাড়ে। এক উষ্ণ প্রস্রবনের ঠিক ওপরেই তুমি বসে আছ। এক হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড মত কাদা মাটি এই উষ্ণ প্রস্রবণের উৎক্ষিপ্ত হয়। প্রায় একশ ফিট উঁচু পর্যন্ত সেটা ওঠে। এমনভাবে এটা নিয়ন্ত্রিত যে, ঠিক পনেরো মিনিট অন্তর বিস্ফোরণ ঘটে চলবে। জাপানি হও, যা বলে তুমি চালাতে চাইছ নিজেকে তাহলে তুমি ওই আসন ছেড়ে উঠবে না। এবং ঠিক এগারোটা বেজে পনের মিনিট হলে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে এক ভয়ংকর মৃত্যু হবে তোমার।
কিন্তু যদি তুমি শুনতে পাও এবং বুঝতে পার তখন তোমার ওপর অন্যরকম নির্যাতন চালানো হবে। যা তোমাকে বাধ্য করবে আমার সব কথার জবাব দিতে।
