নিঃশব্দে দরজাটা বন্ধ করে দেয় বন্ড। চারদিকে শুধু অন্ধকার। থেকে থেকে কিচকিচ শব্দ ওঠে। বন্ড সামনের এক পাথরের দিকে গুঁড়ি মেরে এগোয়। কয়েকটা মোটা মোটা থাম পার হল। মাথার ওপর পানে খিলান দেওয়া ছাদের আভাস। তাতে মাকড়সার জাল ভরতি। হ্যাঁ, ওই যে পাথরের ধাপ গেছে উপর দিকে। পা টিপে টিপে ওঠে। এরপর আরেকটা প্রবেশ পথ। বন্ড সাবধানে ঠেলে। সাথে সাথে বুঝতে পারে ওপাশে একটা ছোট তালার প্রতিবন্ধক রয়েছে। বড়সড় এক শিকাঠি বের করে বন্ড। সেটা ঢুকিয়ে চাড় দিতেই ওপাশে পেরেক স্কু মাটিতে গড়িয়ে পড়ে। দরজার ওপাশে যেন আরো অন্ধকার। আরো কয়েকটা পাথরের সিঁড়ি। শেষ হয়েছে গিয়ে কাঁচের এক চকচকে আধুনিক কায়দার দরজায়। বন্ড উঠে গিয়ে দরজার হাতল খুব সাবধানে ঘোরায়। আস্তে করে ঠেলতে দরজাটা খুলে যায়। বন্ড পা টিপে, দম বন্ধ করে গিয়ে চাবির গর্তে কান পাতে। কোন সাড়া শব্দ নেই। ও ভেতরে ঢুকে দরজাটা আলতো করে ভেজিয়ে রাখে। কেল্লার খাস হলঘরে ঢুকে পড়ে বন্ড। ওর বাঁ দিকে প্রকাণ্ড সদর দরজা। দরজার মুখে এক প্রকাণ্ড কুপি জ্বলছে। ছাদের দৈর্ঘ্য বরাবর আড়াআড়িভাবে কড়িবরগা ফেলা, তার ফাঁকে ফাঁকে বাশের জাফরি কাটা। যা দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করা গেছে।
পরের ঘরটায় রাজকীয় আড়ম্বরের আভাস রয়েছে। নানা রকম অস্ত্র শোভা পাচ্ছে দেওয়ালে।
বন্ড একটা লুকোবার জায়গা খোঁজে। চওড়া চওড়া পর্দাগুলোকেই তার উপযুক্ত জায়গা বলে মনে হয়।
একটা পায়ের শব্দ যেন এগিয়ে আসছে। বন্ড তার কোমরে জড়ানো সরু চেনটা খুলে বাঁ হাতের কব্জিতে জড়িয়ে নেয়। আর ডান হাতে সিঁদকাঠিটা নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। কোন এক রক্ষীকে দেখা গেল বন্ডের গুপ্তস্থানের পাশে দিয়ে দরবার কক্ষের দিকে এগিয়ে যেতে। দরজায় একটা খুট শব্দ তারপর সব চুপচপ। বন্ড আরো মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করে। তারপর ধীরে ধীরে পর্দাটা সরায়। যাতে ঘরের সবটা ভালভাবে নজর করতে পারে। ঘরে কেউ নেই সে একা।
বন্ড তার অস্ত্রশস্ত্র বাগিয়ে দরজার দিকে গুঁড়ি মেরে এগোয়। এবার আর দরজার ওপাশে কোন সাড়া শব্দ নেই। আওয়াজ না করে বন্ড দরজা খুলে ভেতরে লাফিয়ে পড়ে। যে কোন দিক থেকে আক্রমণ আসুক না কেন তার জন্য সে প্রস্তুত। কিন্তু একেবারে ঘর খালি। কিন্তু ওই শেষ প্রান্তের দরজার ওপারে থেকে কি সঙ্গীত যেন ভেসে আসছে। ধন্যবাদ, ক্লোফেন্ড! এই বাজনার আওয়াজ ওকে সাহায্য করবে। প্যাসেজের মাঝামাঝি পা টিপে গুঁড়ি মেরে ও এগিয়ে। যায়।
কিন্তু এতটুকু সংকেত, এতটুকু সতর্ক না করেই ব্যাপারটা ঘটে গেল। প্যাসেজের ঠিক আধাআধি যখন ও গিয়ে পোঁছেছে, তখন বিশ ফুট লম্বা সেই কাঠের মেঝেটা হঠাৎ টেকিকলের মত বোঁ করে ঘুরে ওঠে। একটু শব্দ পর্যন্ত হয় না। বন্ড প্রাণপনে হাত পা ছেড়ে, খামচে কিছু-একটা ধরতে চায়। কিন্তু বউ বুঝতে পারছিল ক্রমেই এক অতল অন্ধকারে ও তলিয়ে যাচ্ছে।
প্রাচীন কেল্লায় চিরকাল এই ধরনের ফাঁদ পাতা থাকে, তার তলায় থাকে গোপন সুড়ঙ্গ। আর বন্ড সে কথা ভুলে গিয়েছিল। ওর দেহটা যখন পাটাতনে ঝুলছে, আর সেটা যখন এক নিশ্চিদ্র শূন্যতার মধ্যে নেমে চলেছে সেই সময় যান্ত্রিক কৌশলে কাঁপা কাঁপা বিক্ষিপ্ত ঘণ্টা বেজে ওঠে। বন্ড ভাল করে বুঝতে না বুঝতে তজাটা ওর শরীরের ভার নামিয়ে দিয়ে ফের স্বস্থানে উঠে যায়। আর বন্ড এক অন্ধকার ঘরে অচৈতন্য অবস্থায় আছড়ে পড়ে।
বন্ড যেন প্রবল অনিচ্ছায় সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গে সাঁতার কাটতে থাকে। কিন্তু ওকে এত মারছে কেন? এত মার। খাওয়ার মত কি করেছে ও যন্ত্রণার প্রবল কুয়াশায় সব যেন ঢাকা, তবু বন্ড আবছা আবছা দেখতে পায় সেই হলদেটে মুখ। সেই ক্ষুদে ক্ষুদে চোখ। সে বুঝতে পারে এক ভয়ঙ্কর জিনিস ঘটে গেছে। ভুল হয়ে গেছে সব। টাইগার, আমি ভুল করে ফেলেছি! বন্ড যেন হারানো খেই খুঁজে পায়।
আগাগোড়া ব্যাপারটা তখন মাথায় খেলতে থাকে। খুব সাবধান এখন। তুমি কিন্তু বোবা কালা। ফাকুওকার এক খনি মজুর তুমি। খুব স্বাভাবিক ব্যবহার কর।
বন্ড টের পায় তার গায়ে কিছু নেই। পরনে খালি একটা খাটো নিজা প্যান্ট। বন্ডের মুখ দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছিল। অদৃশ্য রক্ষীর পিছু পিছু চলতে থাকে। রক্ষীটি টর্চ হাতে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল।
একটা ঘরের মাঝখানে নিয়ে গিয়ে বন্ডকে দাঁড় করানো হল।
দ্বিতীয় রক্ষীটি বন্ডের নিজা-স্যুট আর পকেটের যাবতীয় বস্তু মেঝের ওপর রাখে। ভয়ংকর অপরাধমূলক সব বস্তু।
সিল্কের চমৎকার এক কালো কিমোেনো পরে ক্লোফেন্ড দাঁড়িয়ে আছে। তাতে সোনালি এক ড্রাগনের ছবি আঁকা। ফায়ার প্লেসে মালসায় গনগনে আগুন। কালো দুটো গুলির গর্তের মত চোখ। তার পাশে বসে ইরমাবাট।
ক্লোফেন্ড-এর তলোয়ারটা দেওয়ালে খাড়া করা ছিল। সেটা তুলে নিয়ে ও লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে আসে। তলোয়ারের ডগা দিয়ে বন্ডের জিনিসগুলো খুঁচোতে থাক। তারপর কালো স্যুটটাকে তোলে। জার্মান ভাষায় জিজ্ঞেস করে, এটা কি কোন প্রধান রক্ষীটি সেই ভাষাতেই জবাব দেয়। এটা হচ্ছে নিজা স্যুট। গুহ্য নিজুৎসু শিল্পের যারা চর্চা করে এটা তাদের। এদের গুপ্ত রহস্য অতি প্রাচীনকালের। জাপানে এদের এক সময় লোকে ভীষণ ভয় পেত। এরা যে এখনো রয়েছে তা জানতাম না। এ লোকটাকে নির্ঘাৎ আপনাকে খুন করতে পাঠানো হয়েছে। আমাদের প্যাসেজের কাছে যদি ওই কৌশল করা না থাকত, তাহলে হয়ত পেরেও যেত।
