ব্লোফেলড-এর গায়ে চকচকে বর্ম, মাথায় খোঁচা খোঁচা ডানাওয়ালা অদ্ভুত ইস্পাতের শিরস্ত্রাণ। তার বর্ম পরা ডানহাত লম্বা, খোলা এক সামুরাই তলোয়ারের ওপর রাখা। বাঁ হাত তার সঙ্গিনীর হাতের সাথে জড়ানো। কোন সন্দেহ নেই এই মহিলাই সেই ইরমা বানট! ব্লোফেল্ড তার মুখের পর্দা সরায় এবং একজনকে উদ্দেশ্য করে কি যেন বলতে থাকে। বন্ড এই প্রথম নজর করে যে, ওই বিশেষ রক্ষীটির কোমরে বেলট বাঁধা এবং তার সাথে ঝুলছে খাপসমেত অটোমেটিক পিস্তল। লোকটা হেসে লেকের দিকে আঙুল দেখায় ঝক ঝর্ক পিরানায়া তখনো শেষ ভোজে ব্যস্ত। ব্লোফেলড ঘাড় নেড়ে অনুমোদন জানায়। তারপর যুগলে রাজকীয় ভঙ্গিতে হেঁটে চলে যায়। রক্ষীগুলোর মুখ বন্ড খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে তাদের মুখে কোন অশ্রদ্ধার চিহ্ন মাত্র নেই।
টাইগার বলেছিল, কমপক্ষে বিশজন রক্ষী এখানে আছে। সমস্ত সম্পত্তিটা হবে পাঁচশ একর জুড়ে। সেই মূর্তি দুটো আবার বন্ডের দৃষ্টি পথে এল। ব্লোফেন্ড-এর মুখের পর্দা তোলা মেয়ে মানুষটির সাথে কি যেন কথা বলে চলেছে। ওরা এখন মাত্র বিশ গজ দূরে। ওরা জঘন্য ভাষায় কথা বলছিল। বন্ড উগ্রীব হয়ে কান পাতে।
বোফেন্ড বলল, ফাকুওকা থেকে পুলিশ হরদম এখানে আসা যাওয়া করুক তা আমরা একদম চাই না। চাষীদের কাছ থেকে খবর খুঁটে বার করার ওদের হয়ত রাস্তা আছে। কাগজে কাগজে ইতিমধ্যে গুঞ্জন উঠেছে।
তাহলে আমরা কি করব, প্রিয় অৰ্মন্ট? আমরা মোটা রকমের ক্ষতিপূরণ আদায় করব তারপর অন্যত্র চলে যাব। অন্য দেশেও এই এই কায়দার পুনরাবৃত্তি হবে। সব জায়গায় কিছু না কিছু লোক থাকেই যারা মরতে চায়। শুধু যে সব সুযোগ আমরা লোককে দিই তার আকর্ষণের বিষয়গুলো হেরফের করতে হবে। পৃথিবীর ইতিহাসে একেবারে নতুন কিছু খুঁজে পাওয়া ভার। আমি তাই করছি। আমার সঁকো, আমার জলপ্রপাত বছরে যদি দশটা লোকের ফসল তোলে, সেটা পরিসংখ্যানের দিকে থেকে যাই হোক না কেন আমার মূল আদর্শকে তা বাঁচিয়ে রাখবে।
তা ঠিক। অর্নস্ট, তুমি সত্যিই এক অসাধারণ প্রতিভা। এর মধ্যেই তুমি এ জায়গাকে মৃত্যুর এক মন্দির বানিয়েছ।
ক্লোফেন্ড প্রায় চিৎকার করে বলে–আজ যদি আমি অতি সাবধানে আমার সব হদিশ, সব পায়ের চিহ্ন এইভাবে মুছতে মুছতে না আসতুম তাহলে হয়ত এতদিনে আমাদের দুজনকে খুন করতে পেছনে গুপ্তচর লাগতো। কিংবা সরকারী উপায়ে খুন করতে ওদের ওই নির্বোধ আইনের কবলে সঁপে দিতে আমাদের! হঠাৎ ব্লোফেল্ড বলে ওঠে দেখছ ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে ঐ মালির ঘরটা একেবারে হাট করে খোলা। অনায়াসে কোন গুপ্তচর ওখানে লুকিয়ে থাকতে পারে। দাঁড়াও আমি একবার সন্দেহ ভঞ্জন করে আসি।
বন্ড কেঁপে ওঠে। তাড়াতাড়ি মাটিতে শুয়ে পড়ে গায়ে পুরু করে বস্তা চাপা দিয়ে দেয়। ওদিকে পায়ে মটমট শব্দ এগিয়ে আসে। বন্ড লোকটার উপস্থিত টের পাচ্ছিল। তারপর একটা ধাতব ঝনাৎ শব্দ। ব্লোফেন্ড-এর তলোয়ারের ঘায়ে বস্তার পাহাড় নড়ে ওঠে। হাতুড়ির ঘায়ের মত তলোয়ারের একটা কোপ বন্ডের পিঠের মাঝখানে পড়েছিল। বহু বস্তা চাপানো ছিল বলে তার শিরদাঁড়ার চামড়া খসে যায়নি। বন্ড শুনতে পায় ব্লোফেন্ড চলে যেতে যেতে বলছে এখানে একটা ভাল তালা লাগানো দরকার। আস্তে আস্তে পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল।
বন্ড উঠে পড়ে। সে ভাবে লোকটা অবশ্যই উন্মাদ। একটা বিষয় খুব পরিষ্কার বন্ডের এই গোপন ডেরাটার বারোটা বেজে গেছে। আজই তবে শেষ, বিশেষ রজনী হোক্কেল্লায় ঢুকবার পথ যদি কোনভাবে পায় তাহলে ব্লোফেন্ডকে খতম করার রাস্তা ও একটা খুঁজে বার করবেই। এ বিষয়ে বন্ড নিশ্চিত।
কিসীর কথা এখন ওর মনে পড়ে যায়। কিসী ওর জীবনে এক মধুর স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। বন্ড নেতিয়ে পড়ে ঘুমে। ঘুমের মধ্যে আবার এক দুঃস্বপ্নের জগতে হানা দেয়। তার স্বপ্নে অদ্ভুত সব জিনিস ভিড় করে আসে।
.
মানুষ ধরার ফাঁদ
কেল্লা থেকে ঠিক সন্ধ্যে ছ টায় গভীর একটা ঘণ্টার ধ্বনি ভেসে এল। দিনের ওপর দিয়ে এক বেগুনি পর্দা নেমে আসছে। ধীরে ধীরে। ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। বন্ড উঠে দাঁড়ায়। তখনো পিঠটা কনকন করছিল। প্রথম একটু পানি খায় তারপর পেমিকান -এর বড় টুকরোটা বার করে চিবুতে থাকে। মোটে এক প্যাকেটে সিনসেই ছিল সঙ্গে। হঠাৎ তার কিসীর কথা মনে হয়। এই তো আর কয়েক ঘণ্টা পরেই কিসীকে বন্ড নিজের কাছাকাছি পাবে। কিন্তু এই কয়েক ঘণ্টায় কি হবে? তখন বাজে সাতটা সন্ধ্যের ঝিল্পীরব অনেকটা থেমেছে। বউ নিখুঁতভাবে তৈরি হতে থাকে। রাত যখন নটা বন্ড তখন ওর গুপ্তস্থান ছেড়ে বের হয়। চারদিক নিস্তব্ধ। বন্ড গত রাতের রাস্তা ধরে এগোয়। তারপর সেই বিশাল কেল্লার সামনে এসে দাঁড়ায়। ওপরের কতকগুলো জানালা দিয়ে হলদেটে অস্পষ্ট আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। বিপদের হুশিয়ারি জারি করা বেলুনটা তিনতলা অথবা পাঁচতলার থামের গায়ে বাঁশের সাথে বাঁধা। বন্ড স্থির করে ওগুলোকে তাক করতে হবে। সে তোলা-সাঁকোর তলায় ছোট্ট গুপ্ত পথটির সামনে চলে আসে। জাদুকরের আলখাল্লার যত পকেট এই নিনজা-স্যুটেও তত পকেট। বন্ড একটা পেন্সিল টর্চ আর একটা উখো বার করে লোহার শেকল কাটতে থাকে। চড়চড় শব্দ করে খুলে আসে শেকলটা। দরজায় মৃদু চাপ দিতেই দরজাটা খুলে যায়। দরজার এক ধাপ ভেতরে, পাথরের মেঝেয় একটা মানুষ ধরার ফাঁদ পাতা। দোরগোড়ায় এমন কত ফাঁদ পাতা আছে কে জানে।
