বন্ড লেকের কাছে এসে দাঁড়াল। বিমান থেকে তোলা সেই ছবিটার কথা স্মরণে এল ওর। লেকের শান্ত রূপালি পানি ঝিলমিল করছে। লেকটা ছাড়াতে বরং আগ্নেয়গিরির হাঁ মুখ দেখতে পায় প্রথম। গলগল করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। বেশ দূর থেকে বন্ড সেই ধূমারন্ধ্রের উত্তাপ টের পায়। অশরীরী কালো ছায়ার মত পাক খেতে খেতে আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে। সে গুঁড়ি মেরে এগোয় আরো সতর্ক হয়ে। চারদিক কাঁকর পাথরে ভর্তি হঠাৎ তার ফাঁক দিয়ে বন্ড দেখতে পেল। ও গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে পড়ে। পাজরের খাঁচায় ওর হৃদপিণ্ড হাতুড়ির ঘায়ের মত পড়তে থাকে। কালো আর সোনালিতে মেশানো সেই প্রকাণ্ড কেল্লা ভয়ংকর ভাবে ঝুলে রয়েছে বন্ডের সামনে। প্রত্যেক তলার বাকানো ছাদগুলো যেন মস্ত মস্ত বাদুড়ের ডানা, ছায়া ফেলছে আকাশের গায়ে। সে বুঝতে পারে যে কোটার ভেতরে ঢোকা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। বন্ড পা টিপে টিপে এগিয়ে চলে যাতে কাকরে এতটুকু আওয়াজ না হয়। পুরোনো অভিজ্ঞতা থেকে তার মন পড়ল যে, বেশির ভাগ কেল্লারই একটা করে বেরোবার পথ থাকে। তোলা-সাঁকোর ঠিক তলায় পরিখার কাছাকাছি। ডাক্তার শ্যাটারহ্যান্ড-এর কেল্লাতেও তাই ছিল। ছোট্ট একটা দরজা, তাতে অজস্র পেরেক মারা। খুব ভাল করে দেখে নিয়ে সে আবার কাঁকর বিছানো পথে ফিরে আসে। দরজাটা হবে ওর কালকের লক্ষ্য।
লেকের যেদিকে কেল্লা বউ এবার সেই দিকে গিয়ে পৌঁছায়। দূরে ঝোঁপের মধ্যে এক আহত জন্তুর আর্তনাদ শুনতে পায়। তারপরেই একটা লোক টলতে টলতে স্খলিত পায়ে বেরিয়ে আসে। লোকটার যেখানে চোখ আর মুখ থাকার কথা সেখানে ছোট ছোট ফুটো। লোকটা কাতরাতে কাতরাতে এগিয়ে চলে। হঠাৎ লোকটা একেবারে দাঁড়িয়ে পড়ে। লোকটাকে বোধ হয় সে এই প্রথম নজর করে। দু হাত বাড়িয়ে বুক ফাটা চিৎকার করতে করতে এগিয়ে চলে। তারপর লেকের পানিতে নিজেকে ছুঁড়ে দেয়। সাথে সাথে পানির মধ্যে প্রচণ্ড এক আলোড়ন জাগে। এক ঝাক মাছ প্রাণপণ চেষ্টা করছে লোকটাকে খুবলে খাবার। লোকটার সারা শরীর ঘিরে একটা কালো দাগ পানির ওপর ছড়াতে থাকে; ছড়িয়েই চলে। বোধ হয় মাছেরা তার গলার নলি কেটে ফেলেছিল। তার শরীর নিঃস্পন্দ হয়ে যায়। পানির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে।
পিরানাআ! দক্ষিণ আমেরিকার মারাত্মক খুনে মাছ। এই লোকটা নিশ্চয়ই এক আত্মহত্যাকারী। এভাবে ভয়ংকর মৃত্যুবরণের কথা শুনে এখানে এসেছিল। তারপর লেক খুঁজতে গিয়ে নিশ্চয়ই কোন বিষাক্ত গাছগাছড়ায় মুখ ঘসটে যায়। আর ডাক্তার বাবু তো তার জ্যান্ত বলিদের জন্য কতরকম রসদই যুগিয়ে রেখেছেন! বন্ডের শরীর শিউরে ওঠে। সে দেওয়াল আঁকড়ে ধরে ধরে এগোয়। গোটা পার্কময় অল্প অল্প যেন গন্ধকের গন্ধ ভেসে আসছে বাতাসে। বন্ড এক খোলা জায়গায় এসে পড়ে। এর পেছন দিকে ছিল একটা অদ্ভুত ধরনের গুহা। সেই গুহার পিছনে বড় কালো ভুতুড়ে পোশাক পরে গুঁড়ি মেরে লুকিয়ে থাকে। আর তার উলটো দিকে দাঁড়িয়েছিল এক জাপানি ভদ্রলোক। কোট প্যান্ট পরা। কোন সরকারী কর্মচারি হতে পারে। লোকটি ছাতার বাটের ওপর মাথা ঠকছে। বোধ হয় কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্তকল্পে। খুব নিচু স্বরে বিড়বিড় করে কি যেন বলে যাচ্ছে।
বন্ড একটা গাছে হেলান দেয়। অন্ধকারে প্রায় মিশে দাঁড়িয়ে থাকে। ভদ্রলোকের উদ্দেশ্য বুঝতেই পারা যাচ্ছে। বন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
লোকটির বিড়বিড়ানি একসময় থামে। মুখ তুলে চাঁদের দিকে একবার তাকায়। তারপর পাথরের গণ্ডীটানা বিপজ্জনক সীমানার মধ্যে ঢুকে পড়ে। তারপর এগোতে থাকে। তার শরীরটা থকথকে গরম কাদার মধ্যে একটু একটু করে ডুবে যায়। মুখ থেকে একটা চিৎকার বেরিয়ে আসে। লোকটা ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। ক্লোফেলড-এর মৃত্যু গোনার যন্ত্রে আর একটি সংখ্যা একঘর লাফিয়ে গেল।
গোটা জাপানকে অভিসম্পাত দিতে দিতে বন্ড নিজের পথে এগোয়। সারা বছর ধরে আধ ঘণ্টা অন্তর একজন না একজন জাপানি আত্মহত্যা করে চলেছে। আর ভাববার সময় নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সে ফিরে যায় মালির ডেরায়।
ভোর হয়ে আসছে। বন্ড মালির ঘরে ঢুকল। আস্তে আস্তে বস্তার আড়ালে গেল। তারপর কতকগুলো বস্তা গায়ের ওপর টেনে নিয়ে শুয়ে পড়ল। ঘুমের মধ্যে সে নানারকমের চিৎকার-চেঁচামেচি শুনতে পেল।
.
রাতের বেলা মরণ খেলা
প্রায় চার ঘণ্টা পরে বন্ডের ঘুম ভাঙে। তখন স্বপ্নের চিৎকার সত্যি হয়ে ওঠে। মালির ডেরা চুপচাপ। হ্যাংলা কাঠের যে আড়াল–তার গায়ে মস্ত এক ফাটল। বন্ড সাবধানে সেইখানে চোখ রাখে। এক জাপানি চাষী বেদম চেঁচাচ্ছে। চারটে রক্ষী ছুটছে তার পেছন পেছন। রক্ষীদের হাতে লম্বা লম্বা ডাণ্ডা। একজন তার হাতের ডাণ্ডা টিপ করে ছুঁড়ে মারে লোকটার দিকে। সেটা পায়ে গিয়ে লাগতে লোকটা মাটিতে থুবড়ে পড়ে, লাঠির আগা দিয়ে লোকটাকে তারা খোঁচাতে থাকে। সাথে উৎকট উল্লাস আর চিৎকার। তারপর লোকটিকে ধরে ওরা লেকের পানিতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। পাড়ে দাঁড়িয়ে রক্ষীগুলো মরণখেলা মজা করে দেখতে থাকে।
বন্ড এবার গা ঢাকা দেয়। ঘড়িতে এখন নটা বাজে। দিনের কাজ এই কি শুরু হল না কি? রাতে আত্মহত্যা করতে এসে যারা শেষ পর্যন্ত ভয় পেয়ে পিছিয়ে যায় সকালে এরাই তাদের খুঁজে বার করে দুনিয়া পার করে দেয়। ঘণ্টা খানেক পরে কাকরে মৃদু পায়ের আওয়াজ কানে আসে বন্ডের। লেকের আর একদিক থেকে আসছিল শব্দটা। বন্ড দেখে চারজন রক্ষী অ্যাটেনশানের ভঙ্গিতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ বোধহয় পরিদর্শনে আসছে। একটু পরে সামনে ওর শিকারকে দেখতে পেয়ে বন্ড উত্তেজনায় ঘুষি পাকাতে লাগল।
