দুর্গের মস্ত উঁচু দেওয়ালের ওপারে কালো পার্ক, পার্ক ছাড়িয়ে দুর্গের কালো সোনালি প্রকাণ্ড গম্বুজ। বন্ড দেখল কয়েকজন লোক চাষীদের পোশাক পরে কোদাল হাতে কালো মুখোশে মুখ ঢেকে ঝোঁপের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বন্ডের মনে পড়ল রাতে কোন শিকার পড়ল কিনা তাই দেখতে ওরা বোধহয় রোদে বেরিয়েছে। আজ রাতে বন্ড যখন দেওয়াল টপকাবে তখন ওই রক্ষীদের এড়িয়ে লুকোবে কোথায়? যাক্ দিনের এখন অনেকটাই বাকি। বন্ড কিসীকে বলল, আজ রাতে সঁতরে আমি ঐ দুর্গে যাব। পাঁচিল টপকে ভেতরে ঢুকব।
কিসী ঘাড় নেড়ে জানাল যে, আমি সব জানি। তুমি ঐ লোকটাকে আর তার স্ত্রীকেও মারবে। তুমিই হচ্ছ সেই লোক যার কথা আমরা শুনেছি। সমুদ্র পেরিয়ে এই কুরো দ্বীপে মরে আসবার কথা। যে এই কাজ করবে। কিন্তু তুমি ছাড়া কি আর কেউ এ কাজ করতে পারতো না? আমার বিশ্বাস তুমি কুরোয় অনেকদিন থাকবে। আমি যে মন্দিরে প্রার্থনা করেছি। এর আগে কখন এমন করে কিছু চাইনি। তুমি আমার মাঝি হবে। আজ রাতেও আমি তোমার সাথে সতারে যাব। অন্ধকার রাতে তোমার একজন সঙ্গী থাকার দরকার। আমাকে ছাড়া তুমি তো পারবে না। বন্ড ওর একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, না। এটা হচ্ছে পুরুষ মানুষের কাজ। কিসী ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি আমার মন স্থির করে ফেলেছি। আমি রোজ রাতে আসব, ঠিক মাঝ রাতে। দেওয়ালের নিচে পাথরের আড়ালে এক ঘণ্টা করে অপেক্ষা করব। ওই লোকগুলো হয়ত তোমার ক্ষতি করতে পারে। পানিতে পুরুষদের চেয়ে মেয়েরা অনেক বেশি বুঝতে পারে। আমি কুরোর সব পানির খবর জানি। তুমি ফিরে না আসা পর্যন্ত আমার চোখে। ঘুম আসবে না। অন্তত একটা সময় যে তোমার কাছে ছিলাম আমাকে তোমার দরকার লাগতে পারে–এ কথা ভেবে আমি খুব শান্তি পাব। বন্ড শেষ পর্যন্ত রাজি হল।
টিলা থেকে নামার সময় ওরা আর একটা সরু পথ দিয়ে এল। পানিতে তখন কোন জোয়ার ছিল না। ওরা কালো নুড়ি আর পাথর মাড়িয়ে শৈলান্তরীপের কোণ বরাবর এসে পড়ল। এখানে একটানা কঠিন পাথুরে বেলাভূমি। তাতে পাঁচটি লোক চৌকো চৌকো পাথরের বেদীতে আসন-পিঁড়ি হয়ে বসে আছে। তাদের দৃষ্টি দূর সমুদ্রে নিবদ্ধ। কেবল তারা মানুষ নয় এই যা। পাথরের তৈরি মূর্তি। ষষ্ঠ মূর্তিটার শুধু দেহটুকু আছে। মাথাটা ঝড়ে উড়ে গিয়েছে। সেই পাঁচটা মূর্তির চারদিক ওরা ঘুরে ঘুরে দেখল। জীবনে এই প্রথম বন্ডের মনে দারুণ এক ভয়ের ভাব জাগল। হাসি খুশি, উলঙ্গ আমা মেম্বেদের অভিভাবক; আদিম নিরবয়ব এই মূর্তিগুলো যারা বানিয়েছে তারা সাথে বহুতর বিশ্বাস আর কর্তৃত্বও চাপিয়ে দিয়েছে। তার মনে হল সে যেন হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা করে। কিসী এক মনে বসে প্রার্থনা করল। শেষে ওরা যখন ফিরে যাচ্ছে তখন কিসীর হাত বন্ডের হাতের মধ্যে ধরা।
কুরো-র পূর্ব তীরে ওরা খুব সাবধানে গিয়ে পৌঁছল। কালো পাথরের খাজে নৌকাটাকে লুকিয়ে রাখল। তখন এগারটা বেজে গেছে। কিসী তার সেই বাদামী রঙের কিমোনো গা থেকে খুলে ফেলল। চাঁদের আলোয় তার শরীর উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। দুই উরুর মাঝখানে একফালি কালো আবরণ কিসের এক ইশারা জানাল। কিসী হেসে উঠল খিল খিল করে।
বন্ড সূতির কালো নিনজা-পোশাক গায়ে গলিয়ে নিল, জিনিসটা পরে বেশ আরাম। তাছাড়া পানিতে শরীর গরমও রাখবে। মাথার ঢাকাটা পিঠে ঝুলিয়ে নিল। যে প্যাকেটটা সাথে করে নিয়ে যেতে হবে পানিতে ভাসিয়ে তার দড়িটা বন্ড নিজের হাতের কবজির সাথে শক্ত করে বেঁধে নিল। তাতে করে ও সবসময় বুঝতে পারবে যে, মোড়কটা সাথে সঙ্গেই রয়েছে।
কিসীর দিকে তাকিয়ে একবার ঘাড় নাড়ল। কিসী ওর কাছে এল। দু হাত দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে ঠোঁট জুড়ে চুমু খেল।
প্রত্যুত্তরে বড় কিছু করার আগেই কিসী ঝাঁপ দিয়ে পড়ল শান্ত সমুদ্রে।
.
আহা, কি মনোরম স্থান
কিসী কে অনুসরণ করতে বন্ডের এতটুকু অসুবিধে হচ্ছিল না। কিসী বেশ স্থির ও স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতে বুকে ভর দিয়ে এগোচ্ছিল। ওরা মন্থর গতিতে এগিয়ে চলল সেই বিশাল দেওয়ালের দিকে। খানিক পরে সেই দেওয়াল-ই ওদের সামনে সর্বব্যাপী দিগন্ত হয়ে দাঁড়াল।
উঠবার মুখে এদিক-ওদিক ছড়ানো-ছিটানো কতকগুলো পাথর। কিসী কিন্তু পানিতেই রইল। বন্ড পাথরের ওপর উঠে দাঁড়াল। তারপর মোড়কটার মুখ খুলে ফেলল। তার থেকে বার করল লোহার গজালগুলো। খানিকটা তরতর করে উঠল যাতে ওর ডান হাতখানা তাক করে কতকগুলো পাথরের মাঝখানে এক খাজে ফেলতে পারে। যাবার আগে বন্ড মেয়েটার দিকে হাওয়ায় এক চুমু ছুঁড়ে দিল। উত্তরে কিসী ঢেউয়ের মত হাত নাড়ল এক দিক করে। বিদায় জানার এই জাপানি রীতি। তারপর সে আবার সমুদ্রে ভেসে গেল। বন্ড মুখের কালো ঢাকনাটা নামিয়ে দিল। আরোহণ পর্ব শুরু হল ওর। সাথে সেই কালো মোড়কটাও চলল। দেওয়ালটা একটু হেলানো। দুশো ফিট উঠতে বডের সময় লাগল বিশ মিনিট। এবার ও এক গান-পোর্ট-এ গিয়ে পৌঁছাল। তার ছফিট ঢালাইয়ের ওপর দিয়ে বন্ড নিঃশব্দে গড়িয়ে দিল নিজেকে। বন্ড গুঁড়ি মেরে গিয়ে পড়ল পার্কের ঘনান্ধকার ছায়ায়। পড়েই উঠে দাঁড়াল দেওয়ালে ঠেস দিয়ে। সে কালো ছায়ার মত ডান দিকের দেওয়াল ঘেঁষে এগিয়ে চলে। ওর প্রথম কাজ হল গুপ্তস্থান খুঁজে বার করা। যেখানে দরকার পড়লে ও রাতটা কাটাতে পারে। তাছাড়া সঙ্গের প্যাকেটটা কোথাও রেখে যেতে হবে। একটু এগিয়ে বস্তু পাঁচিলের গায়ে এক গুমটি ঘর দেখতে পায়। পাতলা দরজা হাট করে খোলা। যা ভেবেছিল তাই। মালিকের ঘর। সেখানে পুরোনো বস্তার এক পাহাড় রয়েছে। বন্ড এক মুহূর্ত ভেবে নেয়, তারপর কবজিতে ঝোলানো মোড়কের দড়িটা আলগা করে। গোটা কতক বস্তা সরিয়ে তাই দিয়ে নিজের জন্য বেশ গুছিয়ে এক তাঁবুর মত বানায়। এবার সে মোড়কটা সেই তাঁবুর আড়ালে জিমা করে দেয়। তারপর গুঁড়ি মেরে বেরিয়ে আবার পার্কে পড়ে। মনে মনে স্থির করে সমস্ত চৌহদ্দিটা আগে খুব তাড়াতাড়ি একবার জরিপ করে নেওয়া দরকার। সীমানা পাঁচিলের গায়ে গায়েই রইল বন্ড। ঝোঁপঝাড়ের পাশ দিয়ে সে নিঃশব্দে এগিয়ে চলল।
