কিসীর পালা শেষ হয়েছিল। ও এবার উঠে এল নৌকায়। একটু পরে বন্ডের দিকে তাকিয়ে হাসল। হাসিতে বেশ খুশির ভাব। নাও এবারে তুমি একবার পানির তলায় নেমে দেখ কি ব্যাপার। তবে ঠিক তিরিশ সেকেন্ড হলেই তোমাকে টেনে তুলব। তোমার ঘড়িটা আমাকে দাও।
বন্ডের প্রথম ঝাঁপটা আনাড়ি এলোমেলো হয়ে গেল। ভাল করে ব্যাপারটা বুঝে ওঠার আগেই ও টের পেল ওকে টেনে তোলা হচ্ছে। পরের বার সোজা গিয়ে জলদামে ঢাকা একটা পাথরকে আঁকড়ে ধরল। হাতে পেল ডমের আকারের মসৃণ খোলকটা। দেখে তো হেসে গড়িয়ে পড়ল কিসী। গামলায় সেটাকে রেখে দিল। আরো আধঘণ্টা বন্ড পানিতে ঝাপাঝাপি করতে লাগল। এবারে বন্ড ওর পঞ্চম খোলক গামলায় জমা করল।
কিসী তো বন্ডের ওপর মহা খুশি। মোটা, খসখসে একটা কিমোনো ছিল নৌকায়। তাই দিয়ে সে বন্ডকে রগড়ে রগড়ে মুছে দিল। বন্ড মাথা নিচু করে বসে রইল। বন্ড যখন বিশ্রাম করতে লাগল কিসী তখন গামলাটা টেনে ভেতরে তুলল। সে ছুরি দিয়ে একটা মাছ কেটে ডেভিডকে খাওয়াল। এরপর ওদের দূরের খাওয়া ভাত, তার সাথে ছোট ছোট মাছ ক টা আর কিছু শুকনো উদ্ভিদ খাদ্য। খাওয়ার পর নৌকায় শুয়ে একটু বিশ্রাম। তারপর চারটে পর্যন্ত আবার টানা কাজ। তারপর ধীরে ধীরে ঘরে ফেরার পালা। কিসী তার কিমোনোটা গায়ে গলিয়ে নিল। নৌকাটা দুলছে। দূর দিগন্তে এক অস্পষ্ট বিন্দুর মত দ্বীপটাকে দেখা গেল। বন্ড আস্তে আস্তে গুন টেনে চলল। পড়ে আসা রোদ্র ক্রমে সোনা হয়ে, এল। একসময় ওরা দ্বীপে এসে পৌঁছাল, তারপর বাড়ির দিকে এগিয়ে চলল।
.
ছয় অভিভাবক
আগের দিন সন্ধ্যায় কিসী বাজারে তার শামুক-টামুক বিক্রি করে যখন ফিরল তখন বন্ডকে মেঝেয় পড়ে ছটফট করতে দেখেছিল। পেটের পেশি প্রবলভাবে খামচে খামচে ধরছিল বন্ডের। কিসী তাড়াতাড়ি বন্ডের সাঁতার কাটার প্যান্টটা গা থেকে টেনে ফেলে দিল। তারপর তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। ঘাড়ের কাছ থেকে পাছা পর্যন্ত নরম পায়ে হাঁটতে লাগল। ওকে গরম দুধ খাওয়াল। যে সব জায়গায় ফোস্কা পড়েছিল সে সব জায়গা দুধ দিয়ে মালিশ করে দিল। তারপর মিষ্টি করে বলল শুয়ে পড়তে।
পরের দিন সকালে আর ব্যথা-বেদনা কিছুই ছিল না। কিসী বলল, আজ আমরা আর বেশি দূর যাব না। দ্বীপের চূড়ার কাছাকাছি থাকব। সেদিন বন্ডের হাতে একুশটা আওয়াবি উঠল। কালো দুৰ্গটাকে সে দিন একদম পরিষ্কার দেখা গেল।
একবার বিশ্রামের ফাঁকে বন্ড কিসীকে জিজ্ঞেস করল দুর্গের ব্যাপারে সে কিছু জানে কিনা। এ কথা শোনামাত্র কিসীর মুখ যেভাবে কালো হয়ে গেল তাতে বন্ড বিস্মিত হল।
কিসী জানাল তাদের নানারকম কুসংস্কার আছে। তাদের বিশ্বাস শয়তান ওখানে এসে বাসা বেঁধেছে। পশ্চিমের সব শয়তান মরে নাকি ঐ এক শয়তান হয়েছে। এই দ্বীপে এর মধ্যেই একটা গল্প খুব চালু হয়ে গেছে। আমাদের যে ছ জন জিজো অভিভাবক আছেন তারা নাকি সমুদ্র পাড় থেকে একজন লোককে পাঠাবেন এই মৃত্যুর রাজাকে নিধন করতে। জিজো হলেন রক্ষা করার দেবতা। সব শিশুদের তিনি রক্ষা করেন। সব আমা-রা হচ্ছে সমুদ্রের শিশু। আমাদের পূর্বপুরুষেরা শত শত বছর আগে মূর্তিগুলো প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন। কোটালের মুখে তারা বসে থাকেন, বড় জোয়ার এলে তাদের ঢেকে ফেলে। সমুদ্রের পানি যখন গরম হতে থাকে, তখন জুন মাসের গোড়ায় এই দ্বীপের প্রত্যেকটি লোক মিছিল করে যায় সেই ছয় অভিভাবকের কাছে। আমরা গান করে তাদের প্রসন্ন করি।
একদিন কিসী এসে বন্ডকে জানাল যে, কাশুনি সান লোক মারফত খবর পাঠিয়েছেন। কাল সদর থেকে নৌকা। করে লোক এসেছিল। সাথে তারা মিষ্টি, সিগারেট এইসব উপহার এনেছিল। পুলিশের লঞ্চ কেন এসেছিল, এইসব। ওরা জানতে চাইছিল। জিজ্ঞেস করছিল, তিনজন এসেছিল পুলিশের লোক কিন্তু ফিরে গেল দুজনে। আর এক জনের কি হল? ওদের তাঁরা বলেন কাশুনি সান-এর সাথে দেখা করতে। কাশুনি-সান ওদের বলে দেন যে, তিন নম্বর লোকটি হচ্ছে মাছের লাইসেন্সের ভারপ্রাপ্ত লোক। আসার সময় লোকটির শরীর খারাপ করে–তাই ফিরে যাবার সময় সে বোধহয় শুয়ে শুয়ে গিয়েছিল। এই বলে তিনি তাদের ভাগিয়ে দেন। একটা ছেলেকে পাঠান নৌকাটা কোথায় যাচ্ছে। দেখতে। ছেলেটা এসে খবর দেয় নৌকাটা দুর্গের পাশের খাড়িতে গিয়ে ঢোকে। কাশুনি সান-এর তখন মনে হয়। ব্যাপারটা তোমার জানা দরকার। কিসী ওর দিকে তাকিয়ে বলে, তদোরোকি মান তোমাকে আমি বন্ধু মনে করি। আমার কেন যেন মনে হয় তোমার আর কানুশিসানের মধ্যে কিছু একটা গোপন ব্যাপার আছে আর সেটা ওই দুর্গকে নিয়ে। আমাকে তোমার খুলে বলা উচিত নইলে আমার চিন্তা যাবে না।
বন্ড ওর কাছে গিয়ে নিজের দুহাতে ওর মুখটা তুলে নিল। তারপর ওর ঠোঁটে একটা চুমু এঁকে দিল। বলল, তুমি খুব সুন্দর আর ভাল, কিসী। আজ আর নৌকা নিয়ে বের হব না। আমার একটু বিশ্রাম দরকার। তুমি আমাকে ওই উঁচু টিলাটার ওপর নিয়ে চল যাতে দুৰ্গটা আমি একবার ভাল করে দেখতে পারি। তারপর তোমাকে যা বলার বলব। কারণ তোমার সাহায্য আমার খুব প্রয়োজন। তারপর আবি তোমাদের ওই ছয় অভিভাবককে একবার দেখতে যাব।
দিনের বেলা সব খাবার-দাবার ঝুড়ির মধ্যে গুছিয়ে নিল কিসী। গায়ে পরল সেই কিমোনোটা আর পায়ে রোপমোলের জুতা। সরু আঁকা-বাঁকা পায়ে চলা পথ দিয়ে ওরা টিলাটার ওপর উঠতে লাগল। পেছনে পড়ে রইল ধূসর গ্রাম। যেতে যেতে বন্ডকে এক শিনটো মন্দির দেখাল কিসী। বলল, মন্দিরটার পেছনে চমৎকার এক গুহা আছে। কিন্তু কুবোর লোকেরা ভীষণ ভয় পায়। তাদের ধারণা ওটা একটা ভূতুড়ে জায়গা। শেষে ওরা হাজার ফুট উঁচু টিলাটার মাথায় উঠল। বন্ড পাথরের আড়ালে থেকে চারিদিক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।
