জাপানের এই সেই মাছধরা পানকৌড়ি। বন্ড কিসীকে পাখিটার কথা জিজ্ঞেস করল। কিসী বলল, আমি ওকে পেয়েছিলাম তিন বছর আগে। ও তখন বাচ্চা। তখনো ওর ডানায় তেল। আমিই পরিষ্কার করে, যত্ন করে গলায় পরালাম ওটা। যত বড় হয়, গলার ওই বেড় তত বড় করতে হয়। এখন ও ছোট মাছ টপাটপ গিলে ফেলে কিন্তু বড়গুলো ঠোঁটের আগায় বয়ে নিয়ে আসে। সেগুলো স্বেচ্ছায় দিয়ে দেয়। মাঝে মধ্যে পুরস্কার হিসেবে বড় মাছের এক-আধ টুকরো পায়। আমার সাথে প্রচুর সাঁতার কাটে, আমাকে সঙ্গ দেয়। সমুদ্র যখন অন্ধকার হয়ে আসে তখন বড় একা লাগে। এ হল আমার ডেভিট। হলিউডে আমার একটা লোককেই যা ভাল লেগেছিল–লোকটা ছিল ইংরেজ। আমি তার নামেই নাম দিয়েছি। তাকে ডেভিড নিতেন বলে সবাই। বন্ডের মুখ দিয়ে ঘাম গড়াচ্ছিল। কিসী তার চুল বাঁধা রুমাল খুলে, একটা ঝুঁকে বভের ঘাম মুছিয়ে দিল ধীরে ধীরে।
ওর বাদামী চোখের দিকে তাকিয়ে বন্ড একটু হাসল। এই প্রথম ও এত কাছে থেকে কিসীর মুখখানা দেখছে। সোনালি শরীরে গোলাপী আভা। রুমাল থেকে বেরিয়ে ছড়িয়ে আছে ওর কালো বাদামী চুল। আর আগের দিন তো দেখেইছে, ওর বুক, পাছা কত উন্নত-পেট, কোমর যথেষ্ট পাতলা আর সরু। সব মিলিয়ে খুব সুন্দর দেহ। সবসময়। লবণ পানির সংস্পর্শে থাকতে থাকতে যদিও তার গায়ের চামড়া হেজে যাবার কথা ছিল কিন্তু তা হয়নি। শরীর স্বাস্থ্যে এবং রঙ যেন সোনার মত জ্বলজ্বল করছে।
বন্ডের বুক, মুখের ঘাম যখন মুছিয়ে দিচ্ছিল, তখনই বন্ড ওর প্রতি মমতা অনুভব করে। ঠিক সেই মুহূর্তে বন্ডের মনে হচ্ছিল, সারা জীবন ওর সাথে যদি কাটাতে পারা যেত। তার চেয়ে ভাল আর কিছু হত না। কোন সকালে ওর সাথে নৌকা করে দূর দিগন্তের পানে বেরিয়ে পড়া আর সন্ধ্যে হলে সেই ছোট্ট, তকতকে ঘরে ফেরা! কিন্তু এসব অলীক চিন্তা মন থেকে ও তখনি ঝেড়ে ফেলে দিল। পূর্নিমার আর দুদিন বাকি। তখনই ওকে বাস্তবে ফিরতে হবে। ফিরতে হবে নোংরা, অন্ধকার জীবনে। যে জীবন ও স্বেচ্ছায় বরণ করেছে। বন্ড তাই মন থেকে ওই অসম্ভব কল্পনা তাড়াল। আজকের আর কালকের দিনটা তো চুরি করে নেওয়া দিন। শুধু কিসী আর নৌকা, পাখি আর সমুদ্রের সংস্পর্শে থাকার দিন।
কিসী বলল, আর বেশি নয়। তুমি কিন্তু খুব সুন্দর নৌকা বেয়েছে। আমাদের নিয়ম হচ্ছে যে যেমন আসবে, সে সেই রকম জায়গা পছন্দ করতে পারবে। আজ আমরা যত দূর পারি যাব। সেখানে ঝক ঝক মাছ আছে, সব আমরাই নেব। সকলে বলেছে তুমি খুব ভাল সাঁতার জান। আমি বাবার গগলস্ জোড়া নিয়ে এসেছি। পাশে পাশে এই যে বালব লাগান আছে। কিসী বন্ডকে দেখিয়ে দিল। চোখ আর কাঁচের সমতা রাখবার জন্য মাঝে মাঝে চাপ দিতে হবে। তুমি তো নতুন করছ, বেশিক্ষণ বোধহয় পানির তলায় থাকতে পারবে না। কিন্তু তুমি শিখে ফেলবে চটপট।
নৌকা টলমল করছিল, তবু কিসী সামলে উঠে দাঁড়াল। দড়িটা বেঁধে নিল কোমরে। কপালের ওপর গগলস ঠিক করে বসিয়ে রাখল মনে রেখ দড়িটা কিন্তু শক্ত করে ধরে রাখতে হবে। যখন বুঝবে দড়িতে টান পড়ছে, তখন আমাকে চটপট টেনে তুলবে। তোমার হয়ত খুব কষ্ট হবে কিন্তু আমি সন্ধ্যেবেলায় ফিরে গিয়ে তোমার পিঠ কোমর আচ্ছা করে মালিশ করে দেব। আমি এসব খুব ভাল পারি।
দাঁড় তুলে নিয়ে বন্ত নৌকাটা থামাল। পেছন থেকে ডেভিট পায়ে পায়ে এগিয়ে এল। লম্বা গলা বাগিয়ে ব্যস্ত হয়ে ফোঁস ফোঁস শব্দ করতে লাগল সে। কিসী ছোট একটা দড়ি কাঠের গামলার সাথে বেঁধে গামলাটাকে পানিতে ভাসিয়ে দিল। তারপর নিজের সাদা পোশাকটা হাঁটুর ফাঁকে ভাল করে গুঁজে সুড়ুৎ করে গলে গেল পানিতে। সাথে সাথে ডেভিডও ঝাঁপ দিল। কিসীর পাকানো দড়িটা হাতে নিয়ে ও উঠে দাঁড়াল। বেশ জোর পড়ছে মটমট করে উঠছে। শরীরের গাঁট। কিসী চোখের ওপর গগলস নামিয়ে নিয়ে পানির তলায় ডুবে গেল। উঠে এল তখনি; একটু হাসল, পানির ওপরই ভেসে রইল। তারপর হাতে একটু ঢেউ খেলিয়ে সে মাথাটা নিচু করল। পেছন দিকটা বাঁকিয়ে তুলল ধনুকের মত। তাতে বন্ড এক পলকের জন্য দেখতে পেল কোমরের কালো কারটা। পাতলা জামার ভেতর দিয়ে ফুটে বেরিয়েছে। তারপর মুহূর্তের জন্য সাদা অশরীরী ছায়ার মত সে মিলিয়ে গেল–সোজা নিচে।
বন্ড খুব তাড়াতাড়ি দড়ি ছাড়তে লাগল। এইসময় ডেভিড কে দেখা গেল পানি থেকে মুখ বার করেছে। তার মুখে আড়াআড়িভাবে ধরা আধ পাউন্ডের মত রূপালি মাছ। পানকৌড়িটা মাছটাকে ভাসমান গামলায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে কালো বুলেটের মত অদৃশ্য হয়ে গেল। বন্ড যখন প্রায় ঘাবড়ে উঠেছে সেই সময় দড়িতে হ্যাঁচকা টান পড়ল। ও তাড়াতাড়ি টেনে তুলতে লাগল। ওপরে উঠতে বন্ড দেখতে পেল ওর হাত দুটো শরীরের দু পাশে শক্ত করে ধরে রাখা, যাতে সমান করে উঠতে পারে। নৌকার পাশে এসে দুটো মোটা মোটা আওয়াবি বন্ডকে তুলে দেখাল তারপর গামলায় ফেলে দিল। বন্ড চোখ নামাতেই দেখতে পেল ওর অদ্ভুত সুন্দর বুক। পাতলা আবরণের তলায় কেমন যেন টাটিয়ে রয়েছে। অল্প একটু হেসে কিসী আবার মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।
গামলায় আওয়াবি ক্রমেই ভরে উঠেছিল। তার সাথে ডজন খানেক লাফানো মাছ। এক আধবার খুঁকে পড়ে বন্ডকে ডেভিডের মুখ থেকে মাছ তুলে নিয়ে গামলায় রাখতে হচ্ছিল।
