পুরোহিত তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তারা প্রায় আভূমি নত হল। পুরোহিত তাদের সাথে কথা বলতে লাগলেন। জেমস্ বউ বুঝতে পারল ওই লম্বা মেয়েটিই হল কিসী সুজুকি।
পুরোহিত এগিয়ে এলেন। মাথা নুইয়ে তিনি বন্ডকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন। টাইগার তার কথা তরজমা করে দিল।
উনি বলছেন কিসী সুজুকি-র বাবা-মা তাদের কুঁড়েয় তোমাকে পেয়ে ধন্য হবেন। তারা পশ্চিমী আদব কায়দা জানে না, সে জন্য তারা আন্তরিক দুঃখিত। তবে তাদের মেয়ে আমেরিকায় কাজের দৌলতে ইংরেজি ভালই জানে। সেই তোমার সুখ সুবিধার কথা তাদের জানাবে।
বন্ড মাথা নোয়াল। ওঁকে আমার শ্রদ্ধা জানিয়ে বলবেন, আমার হয়ে এই ব্যবস্থা করার জন্য আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। আমার চাহিদা খুব অল্প এবং জাপানি জীবনযাত্রি আমার খুব ভাল লাগে। আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে বাড়ির নৌকা বাইব এবং সংসারের যদি কিছু সাহায্য করতে পারি তাও করব।
টাইগার বন্ডকে বলল, ভুলে যেয়ো না এখানে তোমার নাম তারো যার মানে প্রথম পুত্র তোদোরোকি যার মানে বজ । পুরোহিতের তোমার আসল নামে আগ্রহ নেই। এই নাম তোমার কাছে আইডেনটেটি কার্ড। আর আছে ফাকুওকার যে কয়লা খনিতে তুমি কাজ কর সেখানকার শ্রমিক ইউনিয়নের কার্ডে। এখানে এইসব নিয়ে তোমার ব্যস্ত না হলেও চলবে। কারণ এখানে তুমি আমাদের বন্ধুদের সঙ্গেই থাকছে। ওপারে গিয়ে যদি দৈবাৎ ধরা পড়, তাহলে তুমি এই কার্ড দেখাবে। এতে লেখা আছে তুমি বোবা এবং কালা।
টাইগার পুরোহিতের সাথে কথা বলল। বন্ড মেয়েটির দিকে ঘুরে দাঁড়াতে মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠল। সে বলল, আমার কাছে আপনাকে মাথা নোয়াতে হবে না এবং আমিও আপনার কাছে কখনও মাথা নিচু করব না, বলে হাত বাড়িয়ে দিল সে। আমার নাম কিসী সুত্র কি।
বন্ড বলল, আমার নাম তারো তদোয়োকি। এতক্ষণ আপনাদের দাঁড় করিয়ে রেখেছি বলে আমি দুঃখিত। মেয়েটি বলল, আপনার মাননীয় বন্ধুদের সাথে কথা শেষ হলে আমরা আপনাকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারি।
বন্ড মনে মনে ভাবল যাক সৃষ্টিকর্তার কৃপায় শেষ পর্যন্ত এক সোজা সরল মেয়ের সাক্ষাৎ মিলেছে। বিদায় পর্ব খুব সংক্ষেপে চুকলো। সমুদ্রের বুকে দ্রুত সন্ধ্যা নেমে আসছে। সন্ধ্যার কুয়াশায় ইতিমধ্যে সূর্যের লাল টকটকে আভা ফিকে হয়ে গিয়েছিল। পুলিশ-লঞ্চের ইঞ্জিন ততক্ষণে ধকধক করতে শুরু করেছে। বন্ড সুপারিনটেন্ডেন্টকে ধন্যবাদ দিল। টাইগারকে দেখাচ্ছিল খুব গম্ভীর। সে বন্ডের একখানা হাত নিজের হাতের মধ্যে মধ্যে টেনে নিল। সে বন্ডকে একটা ছোট্ট উপহার দিল, যদি কোন কারণে নিয়তি বাদ সাধে তখনকার জন্য।
কৌটোটা মটমট করে উঠল। বন্ড সেটা খুলল। ভেতরে বাদামী ধাঁচের লম্বা এক বড়ি। হেসে ফেলল বন্ড। টাইগারকে সেটা ফিরিয়ে দিয়ে বলল, না, ধন্যবাদ, টাইগার। টাইগার নৌকায় নেমে গেল। তারপর ধীরে ধীরে নৌকাটা সমুদ্র দেওয়ালের ওপারে অদৃশ্য হয়ে গেল।
বন্ড ফিরে দাঁড়াল। কিসী সুজু কি অধীর হয়ে বলল, এসো তদোররাকি সান। কানুশি-সান আমাকে বলেছে তোমার সাথে যেন বন্ধুর মত ব্যবহার করি।
তারপর সবাই মিলে ওরা সমুদ্রের তীর ধরে ধরে হেঁটে চলল।
.
এক সোনালি দিন
এক অদ্ভুত সুন্দর সকাল। বন্ড বাইরে গিয়ে দরজার কাছে সিঁড়ির ওপর বসল। ঝকঝক করছে পরিষ্কার পাথর কাটা সিঁড়ি। সবচেয়ে ভাল ঘরটা বন্ডকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। বসবার ঘর সেটা। কিছু কিছু আসবাবপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আর খুব ছোট এক খাঁচায় এক ঝি ঝি। ওটা নাকি সঙ্গ দেওয়ার জন্য কিসী বলেছে। পুরোহিত ওদের বলে দিয়েছেন যে, বন্ডকে যেন পরিবারের একজন বলে মনে করা হয়। কিসী সোজাসুজি জানিয়ে দিয়েছিল বন্ডকে তার পছন্দ। তার বাবা-মা মেনে নিয়েছিল মেয়ের এই কথা।
বন্ড ভেবেছিল এই দ্বীপে তার জীবন অতিষ্ট হয়ে উঠবে। কিন্তু একে একে সে ভয় তার দূর হয়ে গেল। রাত্রে মহা আনন্দেই সে ঘুমিয়ে পড়ল।
কিসী বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। তার গায়ে সাদা একরকম রাত্রিবাস। ঘন কালো ঢেউ খেলানো চুলের ওপর জড়ানো সাদা রুমাল। সাজ-সরঞ্জাম তার গায়ের সঙ্গেই রয়েছে। শুধু তার হাত ও পা খালি। তাকে দেখে বন্ডের মুখ চোখে হয়ত হতাশার ভাব ফুটেছিল। কিসী হেসে উঠল। ওরা দু জনে রওনা হল।
বন্ড খড়টড় সরিয়ে নৌকাটাকে সমুদ্রের পানিতে এনে ফেলল। নৌকাটা ভারি কোন কাঠের তৈরি। একটু নিচু কিন্তু খুব শক্ত সমর্থ। মেয়েটি মুখে একরকম শিস দিতে লাগল, বন্ড দেখে তো অবাক। সেই শিস্ শুনে এ মর্কেড়ি তীব্র বেগে পানি থেকে ছুটে এল পাড়ে। এসে কিসীর পায়ে ঘাড় খুঁজল। কিসী ঝুঁকে পড়ে ওর পালক দেওয়া মাথায়, গলায় হাত বোলাতে লাগল। সে নৌকায় কাছে আসতে পাখিটাও এল তার কাছে। বন্ডকে পাখিটা একদম গ্রাহ্য করল না, এলোমেলোভাবে নৌকায় লাফিয়ে উঠল। উঠে তিড়িক তিড়িক করে গিয়ে বসল দাঁড় বাইবার জায়গায়, পাটাতনের খুপচিতে। কিসী চড়ে বসল নৌকায়। হাঁটু মুড়ে বসল বন্ডের ছড়ানো দুই পায়ের মাঝামাঝি জায়গায়। পাতলা কিন্তু বেশ ভারি কাঠের দুখানা দাঁড় আংটার সাথে লাগাল বন্ড। তারপর নৌকা বাইতে লাগল সজোরে কিন্তু সমান তালে। কিসীর নির্দেশ অনুযায়ী ওরা চলতে লাগল উত্তরমুখো।
