দূর দিগন্তে একটা বিন্দুর দিকে আঙুল তুলে দেখাল টাইগার। বলল, কুরো দ্বীপ। মনে হচ্ছে তুমি কি যেন ভাবছ। সব ঝেড়ে ফেল বন্ডো-সান। খালি ভাব, ওই নগ্ন সুন্দরীদের কথা। যাদের সাথে তুমি খুব শীঘ্র সাঁতার কাটতে পারবে। সেই জাপানি গার্বোর কথা, যার সাথে তুমি নিশি যাপন করবে। কিন্তু বন্ডো-সান, তোমার ভেবে মজা লাগছে না ওই বোকা ড্রাগনটা নিজের দুর্গে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে আর এদিকে সেন্ট জর্জ নিঃশব্দে ঢেউ পেরিয়ে চলেছে তার দিকে। খুব মজাদার গল্পের বিষয়বস্তু হতে পারে কিন্তু।
টাইগার তোমার কৌতুকবোধ ভারি বিচিত্র।
তোমাদের থেকে আলাদা এই যা। আমাদের সব মজাদার গল্পই কিন্তু মৃত্যু আর ধ্বংসকে নিয়ে। আমি খুব ভাল গল্প বলতে পারি না, তবে আমার প্রিয় গল্পটা তোমাকে শোনাই।
একবার এক তরুণী মেয়ে গিয়েছিল খেয়া ঘাটে। পারানি হিসেবে সে এক সেন ছুঁড়ে দিল কুঁদ ঘাটের লোকটাকে। দিয়ে চলে যাচ্ছিল, লোকটা তাকে পেছন থেকে ডাকল, এই যে পারাপার হতে দু সেন লাগে তুমি জান না! মেয়েটা তার উত্তরে বলে, কিন্তু আমি তো নদীটা পুরো পার হতে চাই না। আমি মাঝ নদী পর্যন্ত যাব তারপর পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ব। এই বলে টাইগার হো হো করে হেসে উঠল।
উত্তরে বন্ডও মৃদু হাসল।
দূর দিগন্তে যেটা ছোট এক বিন্দুসম ছিল সেটা আস্তে আস্তে বড় হল। তারপর দেখা গেল শিং-এর মত বাঁকানো এক দ্বীপ। প্রায় মাইল পাঁচেক তার পরিধি। উত্তর দিয়ে ছোটখাটো এক বন্দরের মত, অন্যদিকে খাড়া পাহাড় উঠেছে। উত্তাল ঢেউয়ের ওপর দিয়েই যেন উঠেছে সুবেষ্টিত দুর্গের কালো দেওয়াল। তার ওপর দিয়ে গেছে সারি সারি গাছের মাথা। কালো মাকড়শার মত ওই ভয়ংকর দুর্গের দেওয়াল টপকাতে হবে ভেবে বন্ড শিউরে উঠল।
দেখে মনে হচ্ছিল দ্বীপটা আগ্নেয়গিরির কালো পাথরে তৈরি। ওরা যখন দ্বীপটাকে বেড়দিয়ে ঘুরে আসছিল তখন নজর এল এক ঘন বসতিপূর্ণ গ্রাম এবং একটা জেটি। সমুদ্রে গোটা তিরিশেক কি তার একটু বেশি নৌকা এদিকে ওদিক ছড়ানো। সমুদ্রের ধারে ধারে কালো চকচকে অজস্র গণ্ডশিলা–জলহস্তীর মত উল্টে পড়ে আছে। জেমস্ বন্ড এই দ্বীপে থাকতে পারবে–এ অনুমতি তিনি দিচ্ছেন। সুজু কি পরিবারকে উনি ডাকবেন, যাতে বন্ডকে তারা সসন্মানে নিয়ে যায়। অন্য বয়স্ক লোকেদের কাছে বলা হবে, বন্ড হচ্ছে এক বিখ্যাত বিদেশী নৃতত্ত্ববিদ। আমাদের জীবন যাত্রা সম্পর্কে গবেষণা করতে এসেছে। সুতরাং বন্ড যে সত্যি-সত্যি এ বিষয়ে ঔৎসুক্য দেখায়। পুরোহিত আরো অনুরোধ করেছেন, বন্ডের কাজকর্মে আচার ব্যবহারে যেন সততা ও আন্তরিকতা থাকে। তার মানে টাইগার অত্যন্ত দুষ্টু হাসি হেসে বলেছে, এখানে মেয়েদের সাথে তোমার শোওয়া চলবে না।
সন্ধ্যাবেলা ওরা হাঁটতে হাঁটতে গেল জেটি পর্যন্ত। সমুদ্রের পানি তখন শান্ত ও নিস্তরঙ্গ। কুরো-দ্বীপের সমস্ত অধিবাসী–মোটমাট দুশো জন হবে হয়ত, সমুদ্র-তীরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা গেছে সেদিনকার নায়িকাদের অভ্যর্থনা করতে। বড়রা শাল এবং কম্বল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ওরা এলে গায়ে জড়িয়ে দেবে। টাইগারের কথা অনুযায়ী, মেয়েরা বাড়ি গিয়ে এরপর গরম পানিতে গোসল করবে গা থেকে লবণ ছাড়াবার জন্য, যাতে শরীরে রক্ত চলাচল আবার ঠিক হয়।
গ্রামের একদল বয়স্ক, বৃদ্ধ জেটিতে এসে দাঁড়িয়েছিল ওদের অভ্যর্থনা করতে। এমনিতে তারা সরল, সাদাসিধে কিন্তু এই বিশেষ উপলক্ষে এসেছে বলে তাদের মুখ বেজায় গম্ভীর–দাঁতে দাঁত চেপে তারা দাঁড়িয়ে আছে শিনটো পুরোহিতের পেছনে।
পুরোহিতের বাড়ি যাবার প্রধান রাস্তায় নড়ি বিছানো; ওরা সেই পথ ধরে এগিয়ে চলল। পাথর আর জঙ্গলের কাঠ কাঠ দিয়ে তৈরি ছোটখাটো বাড়ি। ওরা ভেতরে ঢুকে গোল হয়ে বসল। সুপারিনটেন্ডেন্ট এক লম্বা বক্তৃতা দিল। পুরোহিতের বিজ্ঞ চোখ কখনও বন্ডের ওপর এসে থামছিল। এরপর পুরোহিত একটা ছোটখাটো ভাষণ দিল। শেষে টাইগার জবাব দিল।
পুরোহিতকে সব সত্যি কথা বলা হয়েছে। এখন যে এক চরম ব্যবস্থা অবলম্বন করা হচ্ছে, এতে অবশ্য উনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন কিন্তু সমুদ্রের ওপারে ওই যে জায়গা, সেটা উনি স্বীকার করেছেন। ওখানকার মালিক লোকটি যে শয়তানের দোসর তাতেও তার দ্বিমত নেই। এই পরিস্থিতিতে আমাদের পরিকল্পনাকে উনি তার আর্শীবাদ দিচ্ছেন। আর, এই কাজ শেষ করতে যতটুকু সময় লাগে, সেইটুকু সময় যেন বন্ডের সম্মানের কোন হানি হয়।
এখন বাজে পঁচটা; ওরা এই রাত আটটা নাগাদ শুয়ে পড়বে আবার ভোর হতে না হতেই বেরিয়ে যাবে। টাইগারের গলায় সহানুভূতি প্রকাশ পেল; দোহাই তোমার, মেয়ের বাপ-মার সাথে খুব বিনীত ব্যবহার করবে। বিশেষ করে বাপের সঙ্গে। আর কিসীর ব্যাপারে… টাইগারের বাকি কথা বাতাসে আটকে রইল।
সকলেই হাত বাড়াচ্ছে নৌকাগুলোর দিকে, আনন্দে চিৎকার করছে, নৌকাকে টেনে কালো নুড়ির ওপর নিয়ে আসছে। এর মধ্যে হাসতে হাসতে কলকল করতে করতে মেয়েরাও এসে পড়ল। ভীড়ের মধ্যে পথ করে আসতে আসতে তারা জেটিতে দাঁড়ানো শহরের তিন আগুন্তুকের দিকে কৌতূহলের দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল সন্ধ্যের নরম আলোয় ওদের সকলকে সুন্দর আর সুখী মনে হল বন্ডের। গর্বোদ্ধত বুক, একটু রুক্ষ ধরনের স্তনাগ, গুরুনিত চকচক করছে, পাছাকে আঁকড়ে রেখেছে একটা কালো সুতলি এবং তার সাথে এক টুকরো কালো পটি। সেটা দিয়ে সামনেটা ঢাকা। কোমরে শক্ত ফিতের সাথে বাঁধা ছোট্ট এক গাঁইতি। লুটিয়ে পড়া চুলে সাদা কাপড় জড়ানো। কালো চোখ হাসিতে চকচক করছে। ওদের মধ্যে একটি মেয়ে সকলের চেয়ে লম্বা। সব কিছুকে অগ্রাহ্য করে মেয়েদের ভীড়ের মধ্যে সে যেন মধ্যমনি হয়ে চলছিল। তার চলাটা ছিল স্বতন্ত্র।
