এরপরের ইতিহাস ভারতীয় মাত্রই জানেন।
শ্বেত সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ এবং বিশ্ব-মুসলিম প্রেম মৌলানা আজাদের পরিবারের অবিচ্ছিন্ন অংশরূপে গণ্য করা হত। তিনি জন্মগ্রহণ করেন মক্কায়– যেখানে হজ উপলক্ষে বিশ্বের তাবৎ মুসলিম প্রতি বৎসর সম্মিলিত হয়ে প্রাচ্যভূমি থেকে কী করে শ্বেতাঙ্গ ও শ্বেত-স্বৈরাচার দূরীভূত করা যায় তার পরিকল্পনা করত এবং ভারত, মালয়, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশকে আপন কর্তব্য ও জিম্মাদারি ভাগ করে দেওয়া হত। এ পরিকল্পনা কোনও বিশেষ দেশে সীমাবদ্ধ ছিল না বলে একে ন্যাশনালিজম না বলে প্যান্ইসলামিজম (বিশ্ব-মুসলিম-সংহতি) নামে পূর্ব-পশ্চিম সর্বত্রই সুপরিচিত ছিল। দশ বৎসর বয়স পর্যন্ত মৌলানা এ মন্ত্রই অহরহ শুনেছিলেন।
কলকাতা আসার সঙ্গে সঙ্গেই মৌলানার পরিবর্তন আরম্ভ হয়। একথা সত্য যে বিশ্ব-মুসলিমের প্রতি তাঁর দরদ কখনও শুকিয়ে যায়নি, কিন্তু ক্রমে ক্রমে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় উৎসাহ ও উদ্দীপনার উৎস হয়ে উঠল স্বদেশপ্রেম। উর্দু ভারতবর্ষের ভাষা। তাঁর মাতৃভাষা আরবিকে তার জীবনাদর্শ এবং রাজনৈতিক সাধনার মাধ্যমরূপে গ্রহণ না করে তিনি সর্বান্তঃকরণে বরণ করে নিলেন উর্দুকে। এ বড় সহজ কুরবানি বা আত্মবিসর্জন নয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের যুগেই শুধু নয়, আজও দেখতে পাই বহু লোক স্বার্থলাভের জন্য স্বদেশি ভাষা বর্জন করে বিদেশি ভাষার সাধনা করেন এবং আমাদের মতো বাঙালি তাঁদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে না বলে আমাদের প্রতি রুষ্ট হন।
এবং সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি, এই উর্দু গ্রহণের জন্য জীবনসায়াহ্নে মৌলানাকে আবার অকরুণ কটুবাক্য শুনতে হল সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকমণ্ডলীর কাছ থেকে। হিন্দি ভাষা কেন রাতারাতি ভারতবর্ষের তাবৎ ভাষার কণ্ঠরুদ্ধ করে ‘জাতীয় ভাষা’ রূপে জগদ্দল প্রতিমার মতো ভারতের মন্দিরে মন্দিরে পূজা পাচ্ছেন না, অপেক্ষাকৃত অনুন্নত শিশু ভাষাগুলোকে কেন কচি কচি পাঁঠার মতো তাঁর সামনে বলি দেওয়া হচ্ছে না, তার কারণ অনুসন্ধান করে তাঁরা আপন ‘বুদ্ধি’তে আবিষ্কার করলেন ‘হিন্দি-বিদ্বেষী’ ‘হিন্দি-ভাষাকা কট্টর দুশমন’ মৌলানা আজাদকে। যেহেতু মৌলানা উর্দু-ভাষী তাই তিনি শিক্ষামন্ত্রীরূপে হিন্দির প্রচার এবং প্রসার কামনা করেন না– এই হল তখন তাদের ‘যুক্তি’। হিন্দি যে দুর্বল, কমজোর ভাষা সেকথা স্মরণ করবার অস্বস্তিকর প্রয়োজন কেউ বোধ করলেন না। পণ্ডিত নেহরুও যে উর্দুভাষী একথা বলতে তাঁরা সাহস পেলেন না– একথা বললে উভয়ের হৃদ্যতা বেড়ে যাবে যে!
মাত্র একবার মৌলানা লোকসভায় তাঁর বক্তব্য সুস্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন। এবং যাঁরা সেদিন এই সভায় ছিলেন তাঁরা সবাই দেখেছিলেন মৌলানার আবেগময়ী আন্তরিক বক্তৃতার ফলে প্রতিপক্ষ কীরকম লজ্জায় আধোবদন হয়েছিলেন- শত্রু-মিত্র কারও দিকেই মুখ তুলে তাকাবার সাহস পর্যন্ত সেদিন তাদের আর হয়নি।
জগলুল পাশা, কামাল আতাতুর্কের সঙ্গে মৌলানার পত্রবিনিময় সবসময়ই ছিল, কিন্তু মৌলানা ক্রমে ক্রমে তাঁর সমস্ত শক্তি নিয়োগ করলেন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে। সেই ইতিহাস লেখবার শক্তি আমার নেই; আমি শুধু এস্থলে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, মক্কা শরিফের প্যান-ইসলামি বালক যৌবনে পরিপূর্ণ জাতীয়তাবাদী হয়ে গেল। মৌলানার যেসব বিপক্ষ দল একদা মুসলিম জাহানের স্বপ্ন দেখতেন তাঁরা পর্যন্ত আজ কঠিন অভিজ্ঞতার স্বাদ পেয়ে বুঝতে পেরেছেন, সে স্বপ্ন গেছে– এখন তাঁরা পুরো পাকিস্তানি হয়ে গিয়ে জাতীয়তাবাদের আদর্শই বরণ করেছেন। দুঃখ এই, তাঁরা এ আদর্শটি কয়েক বৎসর আগে বরণ করে নিলেই তাদের মঙ্গল, আমাদের মঙ্গল, সকলেরই মঙ্গল হত।
এস্থলে কিন্তু আরেকটি বিষয় লক্ষ করা উচিত।
স্বরাজলাভের পর মৌলানা তাঁর জাতীয়তাবাদ বিশ্ব-মানবের কল্যাণে নিয়োগ করেছিলেন। দেশপর্যটন মৌলানা অত্যন্ত অপছন্দ করতেন, কিন্তু বিশ্বজনের সঙ্গে সক্রিয় যোগস্থাপনার জন্য তিনি কয়েক বৎসর পূর্বে পাকিস্তান-ইরান হয়ে ইয়োরোপে যান– পূর্বে বহুবার বহু দেশে নিমন্ত্রিত হয়েও যাননি। এবং সবচেয়ে বড় কথা, জাতিসজ সম্মেলন (ইউ.এন.ও.) এবং তার ভিন্ন ভিন্ন শাখার যে প্রতিনিধি ভারতে এসেছেন তাঁরা তাঁদের সর্বোত্তম সখারূপে চিনতে শিখলেন মৌলানা আজাদকে। তাঁরা আশ্চর্য হয়ে দেখলেন, যে মৌলানা ইংরেজের বিরুদ্ধে তিক্ততম লড়াই করেছেন আজীবন, তার ভিতর সে তিক্ততা আর নেই। ইংরেজ হোক, মার্কিন হোক আর রুশই হোক, যেজন বিশ্বকল্যাণের জন্য সম্মুখীন হয়, তার বহু দোষ থাকলেও সে আজাদের বন্ধুজন। এবং আরও আশ্চর্য! ইংরেজ দেখে, মৌলানা ইংরেজি না বলেও ইংরেজের মিত্র, রাশা দেখে, তার ভাষা না জেনেও অন্যের তুলনায় মৌলানা রাশাকে চেনেন অনেক বেশি। তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলতেন উর্দুতে, কিন্তু সে উর্দু তো উর্দু নয়। সে উর্দু বিশ্বপ্রেমের সর্বজনীন ভাষা, কিংবা বলব, বিশ্বপ্রেমের ভাষা উর্দুর মাধ্যমে স্বপ্রকাশ হল। একদা তিনি আরবি বর্জন করে উর্দু গ্রহণ করেছিলেন; এখন তিনি উর্দু বর্জন করে অন্য এক ভাষা গ্রহণ করেছেন, যার নামকরণ এখনও হয়নি, কারণ সে ভাষাতে কথা বলতে আমরা এখনও শিখিনি।
