অথচ তাঁর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁরই নির্দেশ অনুযায়ী চলত তিনখানি ত্রৈমাসিক। প্রথমখানি আরবিতে– আরবভূমির সঙ্গে ভারতের সাংস্কৃতিক যোগসূত্র স্থাপনা ও প্রাচীন যোগ দৃঢ়তর করার জন্য, দ্বিতীয়-খানা ফারসিতে– ইরান ও আফগানিস্তানের জন্যে; তৃতীয়খানা ইংরেজিতে বৌদ্ধ জগতের সঙ্গে যোগস্থাপনা করার জন্য (বৌদ্ধভূমি এক ভাষায় আশ্রিত নয় বলে তিনি মাধ্যমরূপে ইংরেজি গ্রহণ করেছিলেন)। এই তিনটি পত্রিকাই ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস দিল্লি থেকে প্রকাশিত হয় এবং মৌলানা ছিলেন তার প্রধান। শুধু প্রধান বললেই যথেষ্ট বলা হয় না কোন দেশে কখানি পত্রিকা যাবে সেটুকু পর্যন্ত তার নির্দেশানুযায়ী হত। আজ ভাবি, এ সবকটি পত্রিকার নীতি-নির্দেশ, মানরক্ষা, তাদের সামঞ্জস্য রক্ষা করতে পারে এমন সর্বগুণ মেশানো আরেক পণ্ডিত পাওয়া যাবে কোথায়? ভারতবর্ষের ভিতরে, বাইরে?
বস্তুত আসলে এ লোকটি হৃদয় এবং মস্তিষ্কের অন্তস্তলে ছিলেন পণ্ডিত। স্বাধীন মক্কা ত্যাগ করে পরাধীন ভারতে না এলে তিনি যে রাজনীতির চতুঃসীমানায় যেতেন না, সেকথা আমি স্থিরনিশ্চয় জানি। স্বাধীনতা লাভের পরও তিনি জ্ঞানমার্গেই ফিরে যেতেন কিন্তু দেশে তখন (এবং এখনও) উপযুক্ত লোকের অভাব। মৌলানা কখনও কর্তব্য অবহেলা করতে চাইতেন না। এমনকি যখন তার বিরুদ্ধপক্ষ মুখর হয়ে উঠতেন, এবং আমরা ভাবতুম তিনি পদত্যাগ করলেই পারেন, এখনও তিনি কর্তব্যবোধের দায়েই আপন কাজ করে যেতেন- লোকনিন্দার তোয়াক্কা-পরোয়া না করে। পূর্বেই বলেছি, মাত্র একবার তিনি হিন্দিওয়ালাদের কর্কশ-কণ্ঠে ব্যথিত হয়ে, আপন কাহিনী নিবেদন করেছিলেন। এ অবসরে আরেকটি ঘটনা মনে পড়ল। সেটা কিন্তু কিঞ্চিৎ হাস্যরসে মেশানো।
বিরুদ্ধ দল শিক্ষা-দফতরের বিরুদ্ধে দুনিয়ার তাবৎ অভিযোগ-ফরিয়াদ জটল্লা করে শেষটায় বলল, ‘শিক্ষা-দফতরের দ্বারা কিছুই হবে না তাদের মগজের বাক্সটি (ব্রেনবটি ) একদম ফাঁপা।’
মৌলানা স্পর্শকাতর লোক– পণ্ডিতগণ সচরাচর তা হন। উষ্মা প্রকাশ করে তিনি কিন্তু দাঁড়ালেন হাস্যমুখে। বার কয়েক ডান হাত দিয়ে মাথার ডান দিক চাপড়ে বললেন, না জি, এখানে তো আছে’, তার পর হাত নামিয়ে নিয়ে দীর্ঘ আগুলফলম্বিত আচকানের ডান পকেটে থাবড়া মারতে মারতে বললেন, ‘এখানে নেই, এখানে কিছু নেই।’ অর্থাৎ মগজে মাল যথেষ্ট আছে, কিন্তু পকেটে কিছুই নেই। তার আরও সরল অর্থ, কেবিনেট শিক্ষাবিভাগকে যথেষ্ট পয়সা দেয় না।
পূর্বেই বলেছি, মৌলানা আসলে পণ্ডিত। কর্তব্যের তাড়নায় তিনি প্রবেশ করেছিলেন রাজনৈতিক মল্লভূমিতে অতি অনিচ্ছায়। তার সে পাণ্ডিত্যের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দিতে আমার কুণ্ঠা বোধ হচ্ছে, কারণ তার সে পাণ্ডিত্য-সায়রে সন্তরণ করার মতো শক্তি আমার নেই।
আরবি এবং সংস্কৃত জ্ঞানচর্চায় বহু সাদৃশ্য রয়েছে। তার প্রধান মিল, উভয় সাহিত্যের পণ্ডিতগণই অত্যন্ত বিনয়ী। কারও কোনও নতুন কিছু বলার হলে কোনও প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের সাহায্যে তারা সেটি প্রকাশ করেন। লোকমান্য টিলক গীতার ভাষ্য লিখে সপ্রমাণ করলেন, কর্মযোগই সর্বশ্রেষ্ঠ যোগ এবং এদেশ থেকে ইংরেজকে বিতাড়নই সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম; মহাত্মা গান্ধী তাঁর গীতাভাষ্য দিয়েই প্রমাণ করতে চাইলেন যে অহিংসাই সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম, এবং শ্রীঅরবিন্দ গীতাপাঠ লিখে প্রমাণ করতে চাইলেন যে জ্ঞানযোগের দ্বারা চিত্তসংযম আত্মজয় করতে পারলেই স্বাধীনতা লাভ অনিবার্য। মৌলানা আজাদ তাঁর ‘কুরান ভাষ্য’ দিয়ে বিশ্ব-মুসলিমকে মুক্ত করতে চাইলেন তার যুগ-যুগ সঞ্চিত অন্ধসংস্কার এবং ক্রিয়াকাণ্ডের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে। এবং তারই সঙ্গে সঙ্গে অতি কৌশলে তিনি তাকে তার কর্তব্য কোন দিকে সেইটে সহজ সরল ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন।
এ ভাষ্য তিনি অনায়াসেই আরবিতে লিখতে পারতেন, এবং আরবি ভাষার মাধ্যমে তিনি পাঠকসংখ্যা পেতেন উর্দুর তুলনায় অনেক, অনেক বেশি। দ্বিতীয়, কুরান আরবি ভাষায় লেখা, এবং তাবৎ বিশ্বমুসলিম আরবিতেই তার ভাষ্য লিখে আসছে (গীতার ভাষ্য যেরকম এক শতাব্দী পূর্বেও সংস্কৃতেই রচিত হয়েছে) তৃতীয়ত, মুসলিম-জাহানের কেন্দ্রভূমি মক্কার ভাষা আরবি, চতুর্থত, সে ভূমি আজাদের জন্মস্থল– আপন জন্মস্থলে যশ প্রতিষ্ঠা করতে চায় না কোন পণ্ডিত?
এ সমস্ত প্রলোভন উপেক্ষা করে মৌলানা তার তফসির ভাষ্য লিখলেন উর্দুতে। মক্কাতে জন্ম নিয়েছিল তাঁর দেহ, কিন্তু তাঁর চৈতন্য এবং হৃদয় গ্রহণ করেছিল তাঁর পিতৃ-পিতামহের ভূমি ভারতকে স্বদেশরূপে। তাই স্বদেশবাসীর জন্য তাঁর ভাষ্য লিখলেন উর্দুতে (টিলকও ইচ্ছা করলে তার ভাষ্য সংস্কৃতে লিখতে পারতেন। কিন্তু লিখেছিলেন মারাঠিতে। পরবর্তী যুগে আজাদ-ভাষ্য আরবিতে অনূদিত হয়, এবং তখন আরব-ভূমিতে সে ভাষ্যের যে জয়ধ্বনি উঠেছিল তা শুনে ভারতীয় মাত্রই না কী গর্ব, কী শ্লাঘা অনুভব করেছিল। পাকিস্তানিরাও এই পুস্তক নিয়ে গর্ব অনুভব করেন। তাঁরা পাকিস্তান যাবার সময় তাজমহল ফেলে যাওয়ার মতো কিন্তু এ ভাষ্য ভারতে ফেলে যাননি। ১৯১৭-এর পরও আজাদ-ভাষ্য লাহোর শহরে লক্ষাধিক সংখ্যক ছাপা এবং বিক্রি হয়েছে।
