পক্ষান্তরে ফরাসি কবি-সম্রাট মলিয়ের নাকি তার তাবৎ কৌতুকনাট্য পড়ে শোনাতেন তাঁর নিরক্ষরা বাড়িউলিকে। বাড়িউলি যেসব রসিকতা শুনে হাসত, তিনি সেসব রসিকতার মাত্রা বাড়িয়ে দিতেন; যেগুলো শুনে গম্ভীর মূর্তি ধারণ করত সেগুলো তিনি নির্মমভাবে কেটে দিতেন। অথচ আজ তো গুণীমূর্খ সবাই তার নাট্য দেখে আনন্দ লাভ করে। এই কয়েকদিন মাত্র হল, জ্যোতিরিন্দ্রনাথকৃত তাঁর বাঙলা অনুবাদ কলকাতার রসিক সমাজকে যা হাসাল তা দেখে স্বয়ং মলিয়েরই অবাক হতেন।
তবে কি ওই বাড়িউলি অতিশয় সুরসিকা ছিলেন? এ পর্যন্ত কেউ তো তা বলেনি। তবে কি ওঁকে না শুনিয়ে সে যুগের নামকরা সমঝদারকে শোনালে মলিয়েরের কাব্য আরও রসোত্তীর্ণ হত? বলা অসম্ভব।
***
যে নল চালিয়েছিলুম, সে তবে এখন এসে খাড়া হল কোথায়, পাকড়ালো কাকে? অর্থাৎ হরে-দরে দাঁড়াল কী?
আমার বিশ্বাস এ নল কোথাও দাঁড়াবে না। এ আলোচনায় কস্মিনকালেও কোনও হদিস পাওয়া যাবে না।
তবে যদি শোধান, আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস কী, তবে আমি নবীন, লেখককে অকুণ্ঠ ভাষায় বলব, সার্টিফিকেট কুড়োতে যেও না। ওতে কানাকড়ির লাভ নেই। ওই যে পাঠক-সম্প্রদায় নামক কিম ভূত কিম্ আকার জীব আছে সে যে কখন কার প্রতি সদয়, কার প্রতি নির্দয়, কখন কাকে আশা-গাছের শাখায় চড়ায়, আর কখন কাকে নির্মমভাবে জিলট করে তার হদিস কেউ কখনও পায়নি।
অবশ্য আপনি যদি ভবিষ্যৎ যুগের পাঠকের জন্য লেখেন তবে আপনার কোনও ভাবনা নেই। তবে সেকথাটা পুস্তকের অবতরণিকায় বলে দিলেই সাধু আচরণ হয়। এ বছরের তাজা মাছকে আসছে বছরের শুঁটকি বলে চালানোটা জোচ্চুরির শামিল। পঞ্চাশ বছর পরে যে র মাল মেচ্যোর লিকোর হবে সেটা আজ বাজারে ছাড়া ধাপ্পা। তার জন্য আজ যে লোক সার্টিফিকেট দেয় সে-ও ধাপ্পাবাজ।
***
হালে আকাশে এক নয়া চিড়িয়া উদয় হয়েছে।
নিজের সার্টিফিকেট নিজে লিখে, কিংবা এবং চেলা-চামুণ্ডাদের সামনে নিজের লেখার গুণকীর্তন করতে গিয়ে পয়েন্ট বাতলে বিজ্ঞাপন লিখিয়ে নিয়ে কিংবা এবং সঙ্গে সঙ্গে নিজের অন্যান্য লেখাতে সে লেখা সম্বন্ধে দারুণ-দারুণ রেফরেস্ ঝেড়ে সবকিছু প্রকাশককে দিয়ে। বিজ্ঞাপনরূপে ছাপিয়ে দেওয়া।
এ সিস্টেমের সঙ্গে ‘আধুনিক বাঙলা কবিতা’র বেশ মিল আছে। বাঙলা ভাষায় লেখা দেখে পড়তে গিয়ে মালুম হল যে কিছুই মালুম হচ্ছে না– এ ভাষায় শব্দরূপ, ধাতুরূপ কৃৎ তদ্ধিত আপনি কিছুই জানেন না। অর্থাৎ বন্ধু বাঙলা ভাষার মুখোশ পরে অজানাজন এসে মেরেছে চাকু।
প্রকাশকের মুখোশ পরে এখানে আসে লেখক– হাতে চাক্কু! পাঠক সাবধান!!
রবীন্দ্রনাথ কী যেন গেয়েছেন, দুখের বেশে এসেছ বলে তোমাকে ডরাব না? এ তার উল্টো পিঠ; মিত্রের বেশে এসেছ বলে তোমাকেই যত ভয়।
এ সিসটেম পাঠক-ব্যাঙ্কারের চালানো জুয়ো-ভূমি মন্টে কার্লোর ব্যাংক ভাঙতে পারবে কি না, সেই খবরের প্রত্যাশায় আছি। এযাবৎ তো কোনও সিস্টেম পারেনি।
আর যা করুন, করুন, কিন্তু পাঠকসাধারণকে আহাম্মুখ ঠাউরে আপন আহাম্মুখির পচা ডিম হাটের মধ্যিখানে ফাটাবেন না!!
মরহুম মৌলানা
মরহুম (স্বর্গত) মৌলানা আবুল-কালাম মহীউদ্দীন আহমদ আল আজাদ সম্ভ্রান্ত বংশের যোগ্য সন্তান। এ বংশের পরিচয় এবং বিবরণ বাদশা আকবরের আমল থেকে পাওয়া যায়।
১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে এঁর পিতা জড়িয়ে পড়েন। দিল্লির ওপর ইংরাজের বর্বর অত্যাচার আরম্ভ হলে পর তিনি তার অন্যতম ভক্ত রামপুরের নবাবের সাহায্যে মক্কা শরিফে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি এক আরব কুমারীকে বিবাহ করেন। আবুল কালাম এই বিবাহের সার্থক সন্তান।
তাঁর মাতৃভাষা আরবি, পিতৃভাষা উর্দু। পরবর্তী যুগে তিনি ফারসি এবং তুর্কিতেও অসাধারণ পাণ্ডিত্য সঞ্চয় করেন। ইংরেজি থেকেও তিনি সে সঞ্চয়ে সাহায্য গ্রহণ করেছেন। তবে এদেশে ফেরার পর তিনি উর্দু সাহিত্যের এমনি একনিষ্ঠ সাধক ও প্রেমিক হয়ে যান যে শেষের দিকে আরবি বা ফারসিতে নিতান্ত বাধ্য না হলে কথাবার্তা বলতেন না।
তাঁর বয়স যখন দশ তখন তাঁর পিতা ভারতবর্ষে ফিরে আসেন। সমগ্র ভারতবর্ষেই তাঁর বহু শিষ্য ও ভক্ত ছিলেন। এই কলকাতা শহরেই তার প্রচুর অনুরাগী শিষ্য ছিলেন এবং তাদেরই অনুরোধে তিনি এখানে স্থায়ী বাসভবন নির্মাণ করেন। পুত্র আবুল কালাম এখানেই তাঁর শিক্ষা সমাপ্ত করেন। তাঁর পরলোকগমনের পর বেতারে যে একাধিকবার বলা হয়, তিনি মিশরের অল আজহর বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন সে সংবাদ ভুল। উপরন্তু মৌলানা সাহেব নিজেকে সবসময়ই কলকাতার অধিবাসী ও বাঙালি বলেই পরিচয় দিয়েছেন। বাঙলা তিনি বলতেন না, কিন্তু বাঙলা কথোপকথনের মাঝখানে তিনি উর্দুতে প্রশ্নোত্তর করতেন এবং কিছুক্ষণ পর কারওই খেয়াল থাকত না যে তিনি অন্য ভাষায় কথা বলছেন।
চৌদ্দ বছর বয়সেই তিনি ‘লিসান উল্-সিদক’ (সত্য-বচন) নামক কাগজের সঙ্গে সংযুক্ত হন এবং অতি অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর খ্যাতি ভারতবর্ষের সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়ে। চব্বিশ বৎসর বয়সে তার ‘অল্ হিলাল’ (অর্ধচন্দ্র) পত্রিকা ইংরেজের মনে ভীতির সঞ্চার করতে আরম্ভ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পর তাঁর কাগজ ইংরেজের শত্রু তুর্কি এবং মুসলিম বিশ্ব-আন্দোলনের অকুণ্ঠ প্রশংসা করার ফলে তাঁকে অন্তরীণ হতে হয়। মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি মহাত্মা গান্ধী ও অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে সংযুক্ত হন এবং সে আন্দোলনের সঙ্গে সাদ জগলুল পাশার মিশরের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং গাজী মুস্তফা কামাল পাশার তুর্কির নবজাগরণের সঙ্গে সেতু নির্মাণ করেন।
