শেক্সপিয়র জানতেন, তিনি রাজা-রাজড়া এবং শিক্ষিতজনদের জন্যই আপন নাটক লিখছেন। কিন্তু অন্য একটি তত্ত্বও বিলক্ষণ জানতেন যে তাঁদের সংখ্যা কম, এবং বেঞ্চি গ্যালারি ভরভরাট করে নাটকটাকে জম-জমাট করে তোলে টাঙাওলা-বিড়িওয়ালার দল। কাজেই তাঁর নাটকে ওদেরই মতো চরিত্র ওদেরই ভাষায় কথা কয়, বিশেষ করে ভাঁড়টি সবসময়ই রাজা-প্রজা দু দলকেই খুশি করতে জানে।
ঠিক সেইরকম গুপ্ত যুগের কালিদাসও জানতেন যে, তাঁর যুগের ‘টাঙাওলা’ ‘বিড়িওলা’ সংস্কৃত বোঝে না, অথচ রাজা-রাজড়ারা নাটক চান সংস্কৃতে। ওদিকে তিনি শেক্সপিয়রের মতো বুঝতেন যে, জনসাধারণকে খুশি না করে কোনও নাটকই বক্স-আপিস ভরতে পারে না। গোলাপফুল খাপসুরৎ জিনিস। কিন্তু পাতা-কাঁটা ওটাকে খাড়া করে না ধরলে ওটা শুধু শূন্যে শূন্যে ঝুলতে পারে না। তাই তিনি তাঁর নাটকে ব্রাহ্মণ আর রাজা ছাড়া আর সবাইকে দিয়ে কথা কওয়াতেন তখনকার দিনের চালু ভাষা প্রাকৃতে। আর শুধু কি তাই? রাজার সংস্কৃতে শোধানো প্রশ্নের উত্তর দাসী যখন প্রাকৃতে দিত তখন কালিদাস তার উত্তরের ভিতর রাজার প্রশ্নটি এমনভাবে জড়িয়ে দিতেন যে সংস্কৃত না-জাননেওলা শ্রোতাও দুই পক্ষের কথাই পরিষ্কার বুঝে যেত। দাসীর তুলনা দিয়েই যদি জিনিসটা বোঝাতে হয় তবে বলতে হবে, ‘এ যেন বাঁদীকে ঠেঙিয়ে বিবিকে সোজা রাখা’র মতো রাজা এবং প্রজা উভয় দর্শককে সোজা রাখা।
তাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস, কালিদাসের নাটক সর্বজনপ্রিয় ছিল।
তার পর প্রশ্ন উঠতে পারে, ঠিক মুসলমান আগমনের প্রাক্কালে জনসাধারণ কি কালিদাসের আমলের প্রাকৃত বুঝত? এ প্রশ্নের উত্তর দেবার মতো এলেম আমার পেটে নেই। তবে তার এক শ বছর পেরোবার পূর্বেই আমির খুসরৌ যে-হিন্দি ব্যবহার করেছেন সে হিন্দি অনেকটা ওই প্রাকৃতের মতোই। এবং এখানে আরও একটি কথা আছে। জনসাধারণ ততদিনে কালিদাসের নাটক দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে, এবং নিরক্ষর দর্শক একটা ফিলিম তিনবার দেখবার পর যে কতখানি মনে রাখতে পারে সেকথা শিক্ষিত জন জানেন না। আমার এক চাকর (বস্তুত এই গণতন্ত্রের ইনকিলাবি যুগে ‘মনিব’ বলাই ভালো) পাড়াতে নয়া ছবি এলেই একটানা সাত দিন ধরে সেই ছবি দেখতে যেত। আমি অবাক হয়ে ভাবতুম, নাগাড়ে সাতদিন ধরে একই ছবি দেখে কী করে? পরে তার গুনগুনোনি থেকে বুঝলুম, ছবির চৌদ্দখানা গানই সে রপ্ত করতে চায় এবং করে ফেলেছেও। অনেক হিন্দি গানের বিস্তর কথা না বুঝতে পেরেও! অবশ্য আমার এ মন্তব্যে ভুল থাকতেও পারে। কারণ আমি এ জীবনে তিনখানা হিন্দি ছবিও দেখিনি এবং অন্য কোনও পুণ্য করিনি বলে এই পুণ্যের জোরেই স্বর্গে যাব বলে আশা রাখি। তবে বলা যায় না, সেখানে হয়তো হিন্দি ছবি দেখতে হবে। কারণ এক ইরানি কবি মহাপ্রলয়ের পরে যে শেষ বিচার হবে তারই স্মরণে অনেকটা এই ভয়ই করেন–
‘শেষ-বিচারেতে খুদার সমুখে দাঁড়াব তো নিশ্চয়,
মানুষের মুখ আবার দেখিব। এইটুকু মোর ভয়।’
‘মরা ব রূজ-ই কিয়ামৎ গামি কি হস্ত ঈন অস্ত
কি রু-ই মরদুমে আলম দুবারা বায়দ দীদ।’(১)
যদি প্রশ্ন শোধান সে কী করে হয়?– তুমি হিন্দি ফিলিম্ বর্জন করার পুণ্যে স্বর্গে গেলে, সেখানে আবার তোমাকে ওই ‘মাল’ই দেখতে হবে কেন? তবে উত্তরে নিবেদন, কামিনীকাঞ্চনসুরা বর্জন করার ফলে আপনি যখন স্বর্গে যাবেন তখন কি ইন্দ্রসভায় ওইগুলোরই ছড়াছড়ি দেখতে পাবেন না?
তখন যদি আপনি এক কোণে মুখ গুমড়ো করে বসে থাকেন তবে কি সেটা খুব ভালো দেখাবে?
থাক্। কোথা থেকে কোথা এসে পড়লুম! মূর্খকে চটালে এই তো বিপদ! আবোল-তাবোল বকে।
মোদ্দা কথা এই, পাঠান-মোগল যুগে নাট্যাভিনয় রাজানুকম্পা পেল না বলে আমরা এখন তার খেসারতি ঢালছি। এবং দ্বিতীয় কথা– নাট্যে, ফিলিমে ভাষা জিনিসটাকে অবহেলা করলে ক্ষতি হয়। এমনকি যদিও বহু গুণী বলে থাকেন, ‘সাইলেন্স ইজ গোল্ডেন’ তবু সাইলেন্ট ফিলিম চলল না। বাঙলা ফিলিম যখন সেই সাইলেন্স্ ভাঙল তখন থেকে আজ পর্যন্ত যে ভাষা সে বলল তারই দিকে এ-প্রবন্ধের নল চালনা।
সাত শ বছর পরে ইংরেজ আমলে হল ঠিক তার উল্টো। কলাজগতে ইংরেজের প্রধান সম্পদ তার থিয়েটার। শেক্সপিয়রের মতো নাট্যকার নাকি পৃথিবীতে নেই। ইংরেজ বলল, ‘চালাও থিয়েটার।’ কিন্তু প্রশ্ন, কে করবে থিয়েটার?
ইতোমধ্যে বাঙালি বিলেত যেতে আরম্ভ করেছে। সেখানে একাধিক নেশার সঙ্গে সে থিয়েটারের নেশাটাও রপ্ত করে এল।
বাঙলা গদ্য এবং পদ্য তখন দুই-ই বড় কাঁচা।
আর জনসাধারণের ভাষা? তারও মা-বাপ নেই। একদিকে শেষ মোগলের ফারসি-উর্দুর শেষ রেশ, অন্যদিকে সুলতানুটি-গোবিন্দপুরের ঐতিহ্যহীন স্ল্যাঙ-দুয়ে মিলে তার যা চেহারা সেটা কিছুদিন পরে পাওয়া যায় হুতোমের নকশায়। অন্যদিকে বিদ্যাসাগরের অতি ভদ্র অতি মার্জিত ভাষা।
এ যুগের নাটকের ভাষা তাই শব্দতত্ত্বের স্বর্গভূমি। কিন্তু নাটকে যে স্বচ্ছন্দ ভাষার প্রয়োজন তার বড়ই অভাব। সব নাট্যকারই যেন ঠিক মানানসই ভাষাটির জন্য চতুর্দিকে হাতড়ে বেড়াচ্ছেন।(২)
মাইকেলের পৌরাণিক নাট্যে বিদাসাগরি ভাষা; তাঁর ‘একেই কি বলে সভ্যতা’তে কলকাতার স্ল্যাঙ; ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’তে গ্রামাঞ্চলের একাধিক ভাষা; এবং দীনবন্ধু মিত্রের ভাষাতে বিদ্যাসাগরি ও গ্রাম্য দুই-ই।
