‘নীলদর্পণ’ সে যুগের বাঙলার বেদনা প্রকাশ করেই যে বিখ্যাত হয়েছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু আমার মনে হয়, বিদ্যাসাগরি ভাষা ও মুসলমান চাষার ভাষা এ দুয়ের সম্মেলনও তার জন্য অনেকখানি দায়ী। অবশ্য শুধুমাত্র ভাষার বাহার যদি শুনতে চান তবে ‘বুড়ো শালিকে’র মতো নাটক হয় না। হিন্দু গৃহস্থ, হিন্দু চাকর, মুসলমান চাষা, চাষার বউ, হিন্দু দাসী এদের সকলের আপন আপন ভাষার সূক্ষ্মতম পার্থক্য মাইকেল যে কী কৃতিত্বের সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন তার তুলনা বাঙলা সাহিত্যে কোথাও নেই। নাটক হিসেবে এ বই উত্তম– সাহিত্য হিসেবে ভাষার বাজারে এ বই কোহিনূর।
অবাঙালির জন্য পারসি থিয়েটার কবে প্রতিষ্ঠিত হয় আমি ঠিক জানিনে, কিন্তু বিস্তর বাঙালিও সেখানে যেত ও উর্দু-গুজরাটিতে মেশানো নাটক বুঝতে যে তাদের বিশেষ অসুবিধে হত না সে-তথ্য কিছু অজানা নয়। ‘ছি ছি এত্তা জঞ্জাল’ জাতীয় জনপ্রিয়, বাঙলা-উর্দুতে মেশানো খিচুড়ি ঠাট্টা ব্যঙ্গের ভাষা কিছুটা হুতোম আর কিছুটা পারসি থিয়েটারের কল্যাণে।
ইতোমধ্যে ভাষাসমস্যার অনেকখানি সমাধান হয়ে যায় বঙ্কিমের কল্যাণে। বঙ্কিমের ভাষানির্মাণে কোন কোন উপাদান আছে সেকথা আজ স্কুলের ছেলে পর্যন্ত জানে। ডি.এল. রায় শ্রেণি এর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেন।
এইখানে এসে আমাদের সবাইকে– বিশেষ করে রবীন্দ্র-শিষ্যদের একটু বিপদে পড়তে হয়। রবীন্দ্রনাথের চলতি ভাষা যে তার ছোটগল্প-উপন্যাসের মাধ্যমে আমাদের দৈনন্দিন কথ্য ভাষাকে প্রভাবান্বিত করেছে সেকথা আমরা সবাই জানি, এবং তার প্রভাব যে আমাদের রঙ্গমঞ্চেও পড়েছে সে-ও প্রতি মুহূর্তে কানে বাজে। কিন্তু আমার মনে হয় তার নাটকের ভাষা এত বেশি মার্জিত, এত বেশি সূক্ষ্ম যে নাট্যশালার আটপৌরে কাজ তা দিয়ে চালানো যায় না। তাই বোধহয় তাঁর নাটকের মূল্য সাহিত্য হিসেবে যত না সম্মান পেয়েছে এবং পাবে, নাট্য হিসেবে ততখানি পায়নি, পাবে কি না সন্দেহ।
***
গোড়ার দিকে ফিলিমের কোনও দুশ্চিন্তা ছিল না। কারণ সে তখন ভাষণ না করে শোভা বর্ধন করত। টকি আসার সঙ্গে সঙ্গে চিন্তাশীল চিত্ৰচালককেই মনস্থির করতে হল টকির ভাষা ও উচ্চারণ হবে কী? এ মুশকিলের একটা অতি সহজ সমাধান আছে। শরত্যাবুর ‘নিষ্কৃতি’ করতে হলে তার ডায়ালগের ভাষা দিলেই হল। এর আর ভাবনা কী?
মুশকিল আসান অত সহজ না। প্রথমত কোনও কোনও বর্ণনা ডায়ালগে প্রকাশ করতে হয়; তখন উপায়? সেটা তৈরি করে দেবে কে? সে কলম আছে কার? রবীন্দ্রনাথের বারোটি গান নিয়ে যখন দম্ভী লেখকেরা মাঝখানে মাঝখানে ‘আপন’ গদ্য জুড়ে দিয়ে কিমপিয়ার (কঁপের) করেন, এবং দুই পাকা গানের মাঝখানে সেই কাঁচা বাঙলা শুনতে হয় তখন মনে হয়, না, থাক বাবা, বাড়ি যাই?
কিন্তু সেইটেই প্রধান শিরঃপীড়া নয়। আসল বেদনা অন্যখানে। বইয়ের লেখা ডায়ালগ আর সিনেমায় উচ্চারিত কথাবার্তা এক জিনিস নয়। বই বন্ধুজনের সঙ্গে পড়ে শোনানো যায় তার পাল্লা অদূর অবধি। নাট্যে, পর্দায় সেটা অত্যধিক সাহিত্যিক। অবশ্য নিছক ফিলিমের জন্য লেখা রাবিশের কথা এখানে হচ্ছে না।
অন্যদিকে সিনেমার ভাষাতে যদি কোনও সাহিত্যিক মূল্যই থাকে তবে সে ইসথেটিক পর্যায়ে উঠতে পারবে না। এই হল আমাদের দু-মুখো সাপ, ডিলেমা, প্যারাডকস– যা খুশি বলতে চান বলুন।
প্রথম যখন মানুষ পাথরের বাড়ি তৈরি করতে শিখল তখন পূর্বতর যুগের কাঠের বাড়ির অনুকরণে পাথরের বাড়ি তৈরি করত; বাঙলা দেশে হঁট চালু হওয়ার পর প্রথমটায় সে খড়ের চাল অনুকরণ করেছে; বেতারের বয়স হয়েছে– এখনও সে নাটক করার সময় ‘থিয়েডারে’র (থিয়েটারের নয়) অনুকরণ করে– ফিলিম কেন অনুকরণ করতে যাবে?
————
১. The only thing which troubles me about the Resurrection day is this, That one will have to look once again on the faces of mankind.
২. শুনেছি সর্বপ্রথম নাকি এক রাশান এদেশে থিয়েটার করেন। তিনি তখন ইংরেজের পৃষ্ঠপোষকতা কতখানি পেয়েছিলেন, তার প্রভাব পরবর্তী যুগের বাঙলা থিয়েটারে কতখানি পড়েছিল, এসব প্রশ্ন ভাষার বিচারে অবান্তর।
বেজো না চরণে চরণে
বিখ্যাত সাহিত্যিকদের কাছে নাকি নবীন সাহিত্যিকরা তাঁদের লেখা নিয়ে গিয়ে চাইদের সার্টিফিকেট চান। বেচারিদের বিশ্বাস, চাঁইরা উত্তম সার্টিফিকেট দিলে সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতি-প্রতিপত্তি পেয়ে যাবেন।
চাঁইদের কেউ-কেউ সার্টিফিকেট দেন, কেউ লেখকদের অন্য চাঁইদের কাছে পাঠিয়ে দেন, কেউ-বা অসুখের ভান করে দেখাই করেন না। এ বাবদে পূজনীয় রাজশেখরবাবু রাজকীয় পন্থাটি বের করে আরামসে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি সবাইকে অকাতরে সার্টিফিকেট দেন– এমনকি মাঝে-মধ্যে না চাইলেও দেন। তাঁর বয়স হয়েছে। শেষের কটি দিন শান্তিতে কাটাতে চান। সোজাসুজি ‘দেব না’ বললে তাঁকে আর বাঁচতে হবে না, এবং ‘দেব-দিচ্ছি, দেব-দিচ্ছি’ করে টালবাহানা দেবার মতো শক্তিও তাঁর নেই। রবীন্দ্রনাথ অমিতবীর্য পুরুষসিংহবৎ ছিলেন, উমেদওয়ারদের ঠেকাবার মতো তাঁর সেক্রেটারিও ছিলেন– তবু তিনিও অকাতরে সার্টিফিকেট দিতেন। প্রাণের প্রতি তাঁর অহেতুক কোনও মায়াও ছিল না- ‘মরণ রে তুহুঁ মম শ্যাম সমান’, এ গান তিনি রচেছেন অল্প বয়সেই– তবু তিনি ‘না-চাহিতে যারে দেওয়া যায়’ ভাবখানা মুখে মেখে পিলপিল করে সার্টিফিকেট বিলোতেন। আমাকে পর্যন্ত তিনি একখানা দিয়েছিলেন– অবশ্য সাহিত্যের জন্য নয়, চাকরির জন্য। আমি তাঁর ‘কৃতী ছাত্র’ এ ধরনের বহুবিধ আগড়ম-বাগড়ম লিখে তিনি আমাকে শ্যামাপ্রসাদবাবুর কাছে পাঠিয়েছিলেন। শ্যামাপ্রসাদবাবু বিচক্ষণ লোক; তিনি আমাকে চাকরি দেননি। অন্যত্র চেষ্টা করার জন্য সার্টিফিকেটখানা ফেরত পেলুম না– কারণ চিঠিখানা ছিল নিতান্ত প্রাইভেট এবং পার্সনাল। শ্যামাপ্রসাদবাবু সার্টিফিকেটের মূল্য না দিলেও রবিবাবুর হাতের লেখা চিঠির মূল্য জানতেন। চিঠিখানা সযত্নে শিকের হাঁড়িতে তুলে রেখে দিয়েছিলেন।
