রবীন্দ্রনাথের ওপর মপাসাঁর ছায়া পড়েছিল সেকথা পূর্বেই বলেছি। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সহকর্মীরূপে তিনি ফরাসি কবিতানাট্য এমনকি ‘শারাদ’-ও পড়েছিলেন। তারই ফলে–
Celui qui me lira, dans les
siecle, un soir,
Troublant mes vers
ইত্যাদি ইংরেজিতে শব্দে শব্দে অনুবাদ :
One who will read me, after centuries, one evening, turning over my verses
‘আজি হতে শতবর্ষ পরে’ হয়ে বেরুল। কিন্তু প্রথম কয়েক ছত্রের পরেই রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে চলে গিয়েছেন।
ঠিক সেই সময় মেটারলিঙ্কের ‘নীলপাখি’ যে কাঠামোতে(৫) লেখা রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’, ‘অরূপরতন’ সেই কাঠামো নিয়ে, কিন্তু উভয় নাটকের বিষয়বস্তু নির্বাচনে এবং রসনির্মাণে রবীন্দ্রনাথ মেটারলিঙ্ককে অনেক পিছনে ফেলে গিয়েছেন। এবং সর্বশেষ নাটকদ্বয় ‘মুক্তধারা’ এবং ‘রক্তকরবী’-র কাঠামোও রবীন্দ্রনাথের সম্পূর্ণ নিজস্ব ভাষা, শৈলী, রসনির্মাণ পদ্ধতি রাবীন্দ্রিক তো বটেই।
আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম, অরবিন্দ ঘোষ (ইনি উত্তম ফরাসি জানতেন)– এঁদের মতো প্রতিভাবান লেখকের রচনাতে এর প্রভাব, ওঁর ছায়াপাতের অনুসন্ধান করে কোনও লাভ নেই। হীনপ্রাণ লেখক সর্বক্ষণ ভয়ে মরে, ওই বুঝি লোকে ধরে ফেলল, সে অমুকের কাছ থেকে ধার নিয়েছে; তাই সে মহাজনদের বাড়ির ছায়া মাড়ায় না। বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ নিজেরাই এত বড় মহাজন যে, তারা যত্রতত্র অনায়াসে বিচরণ করেন। ক্ষুদ্রতম লেখকের বাড়িতেও পাত ফেলতে তাদের কণামাত্র ভয় নেই। তাদের ঘানিতে যাই ফেল না কেন, স্নেহঘন হয়ে বেরিয়ে আসবে।
এইবারে শেষ প্রশ্ন : ফরাসির ওপর বাঙলা কোনও প্রভাব ফেলতে পেরেছে কি?
রলাঁ যেরকম বহু বাঙালি লেখককে প্রভাবান্বিত করেছেন, ঠিক তেমনি, তিনিও বাঙালি গুণী-জ্ঞানীদের সন্ধান রাখতেন। ব্রাহ্ম আন্দোলন, শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে তার জ্ঞান এবং এঁদের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অকৃত্রিম। বহু ফরাসি এঁরই মারফতে বাঙলা দেশের অনেক কিছু চিনতে শিখেছে।
পূর্বেই বলেছি, লেভির সঙ্গ পেয়ে বাঙালি গুণী ফরাসি পাণ্ডিত্যের চর্চা করেছিল। লেভি নিজে করলেন উল্টোটা। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গ পেয়ে তাঁর সাহায্যে করলেন ‘বলাকা’র ফরাসি অনুবাদ। আজ যদি শুনি, পাণিনি কোনও এক চীনা কবির রচনা সংস্কৃতে অনুবাদ করেছিলেন তা হলে যেরকম আশ্চর্য হব।
শ্রীমতী আঁদ্রে কারপেলেজ ফরাসিতে একখানা সঞ্চয়িতা বের করেন। তার নাম ‘ফ্যই দ্যা ল্যাঁদ’—’লিভজ অব ইন্ডিয়া’। এই চয়নিকায় বাঙালি ও বাঙলা সাহিত্য নিয়েই আলোচনা ছিল প্রধানত। দুর্ভাগ্যক্রমে বইখানা আমার হাতের কাছে নেই।
এবং নেই, শান্তিনিকেতনে ফরাসি ভাষার প্রাক্তন অধ্যাপক ফের্না বেনওয়ার রচনাবলি। অমিয় চক্রবর্তীর সহযোগিতায় তিনি ‘মুক্তধারা’র ফরাসি অনুবাদ প্রকাশ করেছিলেন ‘লা মাশিন’ (দি মেশিন) নাম দিয়ে। এর পরবর্তী যুগে বাঙলা সম্বন্ধে আরও বিস্তর লেখা ফরাসিতে প্রকাশ ও প্রচার করেছিলেন।
এবং মারাত্মক নেই, রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে ফরাসি প্রেসের অভিমত, অভ্যর্থনা, অকুণ্ঠ প্রশংসা। রবীন্দ্রনাথ যতবার ফ্রান্সে গিয়েছেন, যখনই তার চিত্রকলার প্রদর্শনী হয়েছে, ফ্রান্স তখনই বাঙলা দেশ সম্বন্ধে সচেতন হয়ে তাঁকে স্বীকার করেছে। প্যারিসে স্বীকৃতি পাওয়া সহজ কর্ম নয়– এসব প্রেস-কাটিংস্ অনুসন্ধিৎসু পাঠক শান্তিনিকেতন লাইব্রেরিতে পাবেন। সে এক বিরাট ব্যাপার!
অর্থাৎ হাতের কাছে কিছুই নেই– ‘ঢাল নেই তলোয়ার নেই’—
তাই আর কেউ বলার পূর্বেই স্বীকার করে নিই, এ লেখা সম্পূর্ণ অসম্পূর্ণ।
————
১. বরঞ্চ গৌর বসাককে লেখা চিঠিগুলোতে প্রচুর ফরাসি ফ্রিভলিটি পাবেন।
২, হেমচন্দ্র বিস্তর শেক্সপিয়র অনুবাদ করেছিলেন, কিন্তু বাঙলাতে আজ পর্যন্ত কেউ শেক্সপিয়রের অনুকরণ করেননি।
৩. ইনি যৌবনেই দেহত্যাগ করেন, কিন্তু এঁর রচনা তখনই বাঙালির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।
৪. পরবর্তী যুগে ভিটারনিৎস জর্মন পাণ্ডিত্যের সঙ্গে এবং তুচ্চি ইতালির পাণ্ডিত্যের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটান। এঁদের সবাই এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে, বিশ্বভারতীতে।
৫. ‘লোয়াজো ব্ল্য’ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বাঙলায় অনুবাদ করেন।
ফিল্মের ভাষা
থিয়েটারের কপাল মন্দ, পাঠান-মোগলের আপন দেশে ওটার রেওয়াজ নেই। তাই পাঠান রাজারা এদেশে জমে বসার পর গাইয়ে-বাজিয়েদের ডেকে পাঠালেন, পটুয়াদেরও ডাক পড়ল, নাচিয়েরাও বাদ গেল না আর এমারত বানানেওলাদের তো কথাই নেই। সংস্কৃত যদি তখন এ দেশের চালু এবং সহজ ভাষা হত তা হলে সংস্কৃত নাট্যও যে বাদশার দরবারে কদর পেত সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, কারণ হিন্দি কদর পেয়েছিল এবং এ দেশে বাঙলা কদর পাওয়ার ফলে পরাগল খান, ছুটি খানের মহাভারত লেখা হয়েছিল।
সংস্কৃতে লেখা আমাদের নাট্য ঠিক মুসলিম আগমনের শুরুতে এদেশে কতখানি চালু ছিল বলা কঠিন। ইংরেজ ঐতিহাসিকেরা বলেন, সংস্কৃত তখন মৃত ভাষা, ওসব নাট্য তখন প্রায় উঠে গিয়েছে। আমি কিন্তু কিঞ্চিৎ ভিন্নমত পোষণ করি।
পূর্বেই স্বীকার করেছি, পাঠান আমলে সংস্কৃত মৃত ভাষা, কিন্তু সংস্কৃত নাটক তো সম্পূর্ণ সংস্কৃতে লেখা হয়। তুলনা দিয়ে কথাটা পরিষ্কার করি।
