সবচেয়ে ‘তাজ্জব ভেল্কিবাজি’ দেখালেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। তা-ও আবার কাব্যে। এক ভাষার কবিতা যে অন্য ভাষাতে তার আপন রূপরসগন্ধস্পর্শ নিয়ে এরকমভাবে প্রকাশ পেতে পারে এর কল্পনাও বাঙালি পাঠক এর পূর্বে কখনও করতে পারেনি। সত্যেন্দ্রনাথের পূর্বে কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার, হেম বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, এমনকি রবীন্দ্রনাথও বিদেশি কবিতার অনুবাদ করেছিলেন কিন্তু এক ‘সম্ভাবশতক’ ছাড়া অন্য কোনও বই জনপ্রিয় হতে পারেনি। স্বামী বিবেকানন্দ নাকি বলেছেন, অনুবাদ মাত্রই কাশ্মিরি শালের উল্টোদিকের মতো; মূল নকশার সন্ধান হাতে পাওয়া যায় বটে, কিন্তু আর সব সৌন্দর্য উল্টো পিঠে ওতরায় না। সত্যেন্দ্রনাথ দেখিয়ে দিলেন, ওতরায়, এবং মাঝে মাঝে উল্টোদিকটাও মূলের চেয়ে বেশি মূল্য ধরতে জানে।
যাঁরা সত্যেন্দ্র দত্তের অনুবাদ মূলের সঙ্গে মিলিয়ে পড়েছেন তাঁরাই আমার কথায় সায় দেবেন। অন্যতম বিখ্যাত অনুবাদক কান্তি ঘোষ বহুবার একথা বলেছেন। তিনি নেই। তাই আজকের দিনের সবেধন নীলমণি নরেন্দ্র দেবকে আমি সাক্ষী মানছি।
তোয়েফিল গতিয়ে, রঁসার ল্যকঁৎ দ্য লিল, ভেরলেন, বদলের, য়ুগো (Hugo), শেনিয়ে, মিস্ত্রাল, ভেরেরেন, ভালমোর, বেরাজেঁ–কত বলব?–কত না জানা-অজানা কবির কত না কবিতা দিয়ে তিনি তাঁর কুম্ভ ‘তীর্থ সলিল’ পূর্ণ করলেন, কত দেশের কত ‘তীর্থরেণু’ বাঙালির কপালে ছুঁইয়ে দিলেন।
ঋগ্বেদে আছে, হে অগ্নি, তুমি আমাদের পুরোহিত, কারণ তুমি আমাদের সর্ব আহুতি দেবতাদের কাছে নিয়ে যাও। সত্যেন্দ্রনাথ বহু দেশের বহু কবির পুরোহিত।
***
কথাসাহিত্যেও ওই সময়ে প্রচুর ফসল ফলল। গতিয়ে, য়্যুগো, মেরিমে, দোদে, মপাসাঁ, দ্যুমা, বালজাক ইত্যাদি বহু লেখকের বহু ছোটগল্প এবং উপন্যাসও বাঙলায় অনূদিত হল। এ গোষ্ঠীর কার্যকলাপ বাঙলা সাহিত্যে কতখানি স্থায়ী মূল্য ধরে তার বিচার একদিন হবে; উপস্থিত বলতে পারি এঁরা বাঙলা সাহিত্যে যে ফরাসি উদারতার আমন্ত্রণ জানালেন তার ফলে পরবর্তী যুগের বাঙালি লেখক গোড়ার থেকেই সঙ্কীর্ণতামুক্ত হয়ে সাহিত্যের আরাধনা করতে পেরেছিলেন। হঠাৎ একদিন বাঙলা সাহিত্যে শরৎচন্দ্রের আবির্ভাবের ফলে এঁদের লোকপ্রিয়তা ক্রমে ক্রমে কমে গিয়ে একদিন সম্পূর্ণ লোপ পায়। কিন্তু শরতের মোহ কেটে যাওয়ার পর আজ পর্যন্ত কেন যে কেউ এঁদের হেমন্তের সফলতা সন্ধান করে না সে এক আশ্চর্যের বস্তু।
***
বাঙলায় ফরাসি সাহিত্য প্রসঙ্গে শুধু প্রমথ চৌধুরী সম্বন্ধে পূর্ণাঙ্গ একটি প্রবন্ধ লিখতে হয়। ইনিই একমাত্র বাঙালি সাহিত্যিক যাঁকে সর্বার্থে ফরাসিস আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। একমাত্র এরই ভাষাটিতে ইভনিং ইন প্যারিসের খুশবাই পাওয়া যায়। এঁর শৈলী ফরাসি শ্যাম্পেনের মতো বুদ্বুদিত, ফেনায়িত। এমনকি এর বিষয়বস্তুও মাঝে মাঝে ফরেসডাঙার ধুতি পরে মজলিসে এসে বসে। বাংলা সাহিত্যে বহু পণ্ডিত, বহু দার্শনিক, বহু কলাবিদ এসেছেন, কিন্তু একমাত্র এঁকেই সত্য বিদগ্ধজন বলা যেতে পারে। এবং সে বৈদগ্ধ্য ফরাসি বৈদগ্ধ্য।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ফরাসিদের সঙ্গে বাঙালির চারি চক্ষের মিলন ঘটিয়েছিলেন; প্রমথনাথে দুই সাহিত্যের গভীরতম প্রণয়ালিঙ্গন।
এঁর সাহিত্যসৃষ্টি হয়তো বাঙলা দেশ একদিন ভুলে যাবে কিন্তু এই বাঙালি ফরাসিস চরিত্রকে বাঙালি কখনও ভুলবে না।
প্রমথনাথের শেষ বয়সে ভারতীয় গোষ্ঠীর মুমূর্ষ অবস্থায় রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে ফরাসি পণ্ডিত সিলভা লেভি এদেশে আসেন। তাঁর চতুর্দিকে তখন এক ফরাসি পণ্ডিতমণ্ডলীর সৃষ্টি হয়। এঁদের প্রধান ফণী বোস(৩), প্রবোধ বাগচী, মণি গুপ্ত, শশধর সিংহ, বিধুশেখর ভট্টাচার্য, ক্ষিতিমোহন সেন। এঁদের কেউই প্রচলিতাৰ্থে সাহিত্যে নামেননি কিন্তু এঁদের মাধ্যমে আমরা এদেশে সর্বপ্রথম ফরাসি পাণ্ডিত্যের সন্ধান পাই। এতদিন আমরা জানতুম, ইয়োরোপীয় ‘প্রাচ্য-বিদ্যামহার্ণব’ বলতে বোঝায় ইংরেজ। এরা প্রথম দেখিয়ে দিলেন, ফরাসি ভারতবর্ষে ব্যাপকভাবে রাজত্ব না করেও ভারতীয় শাস্ত্রের চর্চা করেছে প্রচুর।(৪) বিশেষ করে আমাদের চিত্রকলা সঙ্গীতাদি। প্রবন্ধের গোড়ার দিকেই বলেছি সাহিত্য ছাড়া অন্য রসে ইংরেজ বঞ্চিত। ফরাসিরা সেখানে যথার্থ গুণী। মণি গুপ্তের অনুবাদে বাঙালি তার সন্ধান পাবে। শান্তা দেবী এই সময়েই বিশ্বভারতীতে ফরাসি শেখেন।
এই গোষ্ঠীর বাইরে আর দু জন পণ্ডিতের নাম করতে হয়। মুহম্মদ শহীদুল্লা এবং সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। দিলীপ রায় আর কালিদাস নাগও এই যুগের লোক।
***
কিন্তু আমাদের জোড়া কুতুব-মিনার? বঙ্কিম এবং রবীন্দ্রনাথ? তা হলে দীর্ঘতম প্রবন্ধ লিখতে হয়। এ যুগের ঋষি দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, imitation-এর বাঙলা অনুকরণ; aping-এর বাংলা কী? ‘হনুকরণ’! যাঁরা ফরাসির ‘হনুকরণ’ করেন তাঁদের উল্লেখ আমি এ প্রবন্ধে করিনি। পদস্খলন সকলেরই হয়। পূর্বোল্লিখিত লেখকদের কেউ কেউ হয়তো অজানাতে মাত্রাধিক্য করেছেন কিন্তু এ দুটি লোক সম্বন্ধে অধম নিঃসংশয়।
বঙ্কিম কিঞ্চিৎ ফরাসিস জানতেন। কিন্তু তিনি ইংরেজির মাধ্যমে কঁৎ-কে চিবিয়ে খেয়েছিলেন। পূর্বসূরিগণের প্রসাদাৎ কঁৎ ফরাসি তর্কালোচনায় যে শুভবুদ্ধির (rationality-র) চরমে পৌঁছেন, বঙ্কিম সেই শাণিত অস্ত্র নিয়ে হিন্দুধর্ম রণাঙ্গনে প্রবেশ করেন। এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধে তার সবিস্তর আলোচনা অসম্ভব। তাই এই আক্ষেপ দিয়েই বঙ্কিমালোচনা শেষ করি, হায়, তাঁর এই শুভবুদ্ধির অনুসরণ আর কেউ করল না কেন? যে লোক ইস্তেক দয়াসাগরের খেলাফে তলোয়ার খাড়া করেছিল তার অনুকরণ অনুসরণ, এমনকি ‘হনুকরণ’ও কেউ করল না কেন?
