এই জ্যোতিরিন্দ্রের বাঙলা ভাষাতেই ফরাসি ভাষার কোনও প্রভাব দেখতে পাওয়া যায় না।
***
বরঞ্চ ফরাসি শৈলীর (style) প্রভাব বেশ কিছুটা আছে।
বাঙলা সাহিত্যের ঐতিহাসিকরা পাকাপাকিভাবে বলতে পারবেন, বাঙলার কোন লেখক সর্বপ্রথম ফরাসির সঙ্গে বাঙলার যোগসূত্র স্থাপন করেছিলেন; আমি শুধু সার্থক সাহিত্যিকদের কয়েকজনের কথাই তুলব।
মাইকেলের সার্থক সৃষ্টিমাত্রই গম্ভীর– সংস্কৃত এবং লাতিনের ক্লাসিকাল গুণের সঙ্গে তিনি তাঁর বীণার তার বেঁধে নিয়েছিলেন। ওদিকে তিনি আবার অতি উত্তম ফরাসি জানতেন নতুন ভাষা তিনি যে কত তাড়াতাড়ি শিখতে পারতেন, সেকথা আজকের দিনের ভাষার ব্যবসায়ীরা কিছুতেই বিশ্বাস করবেন না কিন্তু সে ‘রঙিলা ঘরানা’ তাঁর ভাষার ওপর কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি।(১) তাই কিছুতেই বুঝে উঠতে পারিনে তিনি লা ফঁতেনের ধরনে ‘ফাবল’ (ফেবল) রচনা করলেন কেন? লা ফঁতেন তাঁর অনেক গল্প নিয়েছেন ঈশপের গম্ভীর গ্রিক থেকে, কিন্তু লিখছেন অতি চটুল ফরাসি কায়দায়। অথচ তাঁরই অনুকরণে যখন মাইকেল বাঙলাতে ‘ফাবল’ রচনা করেছেন তখন তিনি গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলছেন,
‘রসাল কহিল উচ্চে স্বর্ণলতিকারে–’
দুই সুর একেবারে ভিন্ন। অথচ মাইকেলের প্রায় সবকটি ‘ফাবলে’র উৎস লা ফঁতেন।
প্রহসনেও তাই। বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ-র মূলে মলিয়ের। অথচ শৈলীতে গম্ভীর।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা পূর্বেই নিবেদন করেছি। যদিও তার আপন ভাষাতে ফরাসি প্রভাব নেই তবু তিনি অনুবাদের মারফতে যে শৈলী এবং বিষয়বস্তুর অবতারণা করে গেলেন তার প্রভাব বাঙলা সাহিত্যের দূর-দূরান্ত কোণে পৌঁছে গিয়েছে এবং আরও বহুদিন ধরে পৌঁছবে।
তোয়েফিল-গতিয়ে, এমনকি বাজাও মপাসাঁ’র পূর্বে কয়েকটি সার্থক ছোটগল্প লিখেছেন কিন্তু আজ শুধু ফরাসিস না, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড স্বীকার করে, মোসই ছোটগল্পের আবিষ্কর্তা। তিনিই প্রথম দেখিয়ে দিলেন, দীর্ঘ উপন্যাস না লিখেও পাঠককে কী প্রকারে কাহিনী-রসে আপুত করা যায় (‘কণ্ঠহার’ গল্প নিয়ে সাত-ভলুমি ‘জাঁ ক্ৰিস্তফ’ লেখা যায়)। মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জন্য ডসতেয়ফকির মতো ভলুম না লিখেও ‘সূত্ররূপে’ সেই রস পাঠকের মনে সঞ্চারিত করা যায়।
আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ছোটগল্প লেখক রবীন্দ্রনাথ যবে থেকে জ্যোতিরিন্দ্র ঠাকুরের মারফতে মপাসাঁকে চিনতে শিখলেন তবে থেকেই তাঁর গল্প ঋজু কাঠামো নিয়ে সর্বাঙ্গসুন্দর হয়ে আত্মপ্রকাশ পেল (অবশ্য প্রথম থেকেই তাঁর গল্পে থাকত প্রচুর গীতরস) এবং পরবর্তী যুগে তিনি অন্য এক মিসটিক নবরসে ছোটগল্পকে এক নবরূপ দান করেন।
***
দান্তে, শেক্সপিয়র, গ্যোটে, কালিদাস কেউই পৃথিবীর সুদূরতম সাহিত্যকে এতখানি প্রভাবান্বিত করতে পারেননি মপাসাঁ যতখানি করেছেন। এটম বম্ হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আবিষ্কার কিন্তু বাইসি ও সেলাইয়ের কল যেরকম গ্রামে গ্রামে পৌঁছেছে এটম বম্। শেক্সপিয়র সেরকম সাহিত্যে সাহিত্যে নব নব সৃষ্টির অনুপ্রেরণা দিতে পারেননি।(২)
অথচ আজও যখন কোনও মানুষের জীবনের কোনও এক অদ্ভুত বিচিত্র অভিজ্ঞতা আসে সে তখন তার প্রকাশ দেবার চেষ্টা করে ছোটগল্পের মাধ্যমে, অর্থাৎ মপাসাঁ’র কাঠামো নিয়ে। ইংরেজ, জর্মন, রুশ, বাঙলা এসব অর্বাচীন সাহিত্যের কথা বাদ দিন, অতিশয় প্রাচীন চীন-আরবির মতো ক্লাসিকাল সাহিত্যেও আজকের দিনে মপাসাঁ ছোটগল্পে আদি গল্পগুরু বাল্মীকি। সবাই তারই রাজেন্দ্র সঙ্গমে, দীন যথা যায় দূর তীর্থ দরশনে।
***
বাংলা সাহিত্যে মপাসাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ শিষ্য প্রভাত মুখোপাধ্যায়। তিনি ফরাসি জানতেন কি শৈলী-আলোচনায় সে প্রসঙ্গ অবান্তর। তিনি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তস্য শিষ্য রবীন্দ্রনাথ পড়েছিলেন এবং এদের মাধ্যমে মপাসাঁ’র শরণ নিয়েছিলেন। বাঙলা দেশের কোনও গল্পলেখকই প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের মতো মপাসাঁ’র এত কাছে আসতে পারেনি। মপাসাঁ’র মতো প্রভাতের ছিল সমাজের নানা শ্রেণি, নানা চরিত্র, নানা পরিস্থিতি নিয়ে নবীন নবীন গল্প গড়ে তোলার অসীম ক্ষমতা। মপাসাঁ’র মতো তিনিও কয়েকখানি উপন্যাস লিখেছিলেন। সেখানেও দু জনের আশ্চর্য মিল। ঔপন্যাসিক রূপে মোস ফ্রান্সে বিশেষ কোনও সম্মান পাননি; বাঙলা দেশে প্রভাত মুখোপাধ্যায়েরও সেই অবস্থা।
এ প্রসঙ্গে সর্বশেষ নিবেদন, প্রভাত-পরবর্তী যুগের প্রায় সব বাঙালি গল্প-লেখকই মপাসাঁ’র অনুকরণ করেছেন প্রভাতের মাধ্যমে।
***
এই সময়ে ‘ভারতী’কে কেন্দ্র করে শক্তিশালী এক নতুন কথাসাহিত্যিক গোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়। এ গোষ্ঠী অহরহ অনুপ্রেরণা পেত জ্যোতিরিন্দ্র এবং রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে। এঁদের ভিতর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সত্যেন্দ্র দত্ত, চারু বন্দ্যোপাধ্যায়, মণি গাঙ্গুলী ও সৌরীন্দ্র মুখোপাধ্যায়। এঁরা প্রধানত ফরাসি সাহিত্য থেকে অনুপ্রেরণা সঞ্চয় করে বাঙলা দেশে এক নতুন ফরাসিস ‘গুলস্তান’ বানাতে আরম্ভ করলেন। এঁদের একটা মস্ত সুবিধে ছিল এই যে, এঁরা রবীন্দ্রনাথের গড়া আধুনিকতম বাঙলার সম্পূর্ণ ব্যবহার করবার সুযোগ পেয়েছিলেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সে সুযোগ পাননি বলে তাঁর ভাষা ছিল বিদ্যাসাগরী। এঁরা রবীন্দ্রনাথের সাবলীল ভাষা ব্যবহার করাতে তখনকার দিনের বাঙালি পাঠকের মর্মদ্বারে দরদী আঘাত হানতে পেরেছিলেন।
