রাজকুমারী = কবি; ফুলের তোড়া = কবিতা; ফুলের রঙ পাতার বাহার = তুলনা অনুপ্রাস, খোঁজা = প্রকাশক-সম্পাদক-ফিলিম-ডিস্ট্রিব্যুটর (তাঁরা সুগন্ধ সুবর্ণের রসাস্বাদ করতে পারেন, কিন্তু ‘বাণীটি’ বোঝেন না); এবং খলিফা = সহৃদয় পাঠক!
ফরাসি-বাঙলা
রবীন্দ্রনাথ নাকি কোনও এক স্থলে খেদ করেছেন আমরা ইয়োরোপের যেটুকু চিনলুম সেটা ইংরেজের মারফতে।
তিনি ঠিক কী বলেছিলেন মনে নেই বলে অপরাধ মেনে নিবেদন করি, ইংরেজ বরঞ্চ চেষ্টা করেছে আমরা যেন ইয়োরোপকে না চিনতে পারি।
ইংরেজ যখন এদেশে রাজত্ব করত তখন দুটি প্রচারকমে মেতে থাকতে সে বড় আনন্দ পেত। তার প্রথম, বিশ্বজনকে জানানো যে, ভারতীয়েরা ড্যাম নিগার, কালা আদমি, তাদের কোনওপ্রকারের কলচর নেই। দ্বিতীয়, ভারতীয়দের জানানো, ইংরেজ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জাত এবং তাই (আ ফর্তেরিয়রি) ইয়োরোপের সর্বশ্রেষ্ঠ নেশন তো বটেই। প্রমাণস্বরূপ শেক্সপিয়রের নাম করল।
আমরা তখন আমাদের বিদ্যাবুদ্ধি দিয়ে যাচাই-পরখ করে দেখলুম, কথাটা ঠিক শেক্সপিয়রের মতো কবি পৃথিবীতে কম– নেই বললেও চলে। ইংরেজিতেই পড়লুম, ফরাসি-জর্মন-ওলন্দাজ-দিনেমার সবাই একথা স্বীকার করেছে। তাই আমরা ইংরেজের বাদবাকি দাবিগুলোও সুড়সুড় করে মেনে নিলুম। ঘড়েল মিথ্যে সাক্ষী– কনফিডেন্স ট্রিকস্টার– এইভাবেই সরল জনকে আপন সব পচা মাল পাচার করে দেয়।
ইংরেজ কিন্তু একথা বলতে ভুলে গেল, উপন্যাসে তার টলস্টয় নেই, গল্পে তার মপাসাঁ নেই, চিত্রকলায় তার রাফায়েল নেই, ভাস্কর্যে তার মাইকেল এঞ্জেলো নেই, দর্শনে কান্ট নেই, নৃত্যে পাভলোভা নেই, ধর্মে লুথার নেই, সঙ্গীতে বেটোফেন নেই।
বিশেষ করে বেটোফেনের কথাই তুললুম।
ইংরেজ জাত সুর-কানা। তাই সে বেটোফেনের নাম করে না। তাই ইংরেজের বাড়িতে সঙ্গীত-চর্চা নেই। যদি থাকত তবে এ দেশের বড় সায়েবদের বাড়িতেও সে চর্চা আসন পেত। আমরাও ইয়োরোপীয় সঙ্গীতের সঙ্গে পরিচিত হতুম। ইংরেজ চর্চা করল এবং আমাদের শেখাল– জ্যাজু, যেটা তার খুড়তুতো ভাই মার্কিন শিখল তাদের গোলাম নিগ্রোদের কাছ থেকে।
অতি অবশ্য আমাদেরও দোষ আছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা হাজারে হাজারে ফ্রান্স-জর্মনি-ইতালি-রুশে যায়নি বটে, কিন্তু শতে শতে তো গিয়েছে। তাদের মধ্যে যে ক জন ইয়োরোপের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেবার চেষ্টা করেছেন তাঁদের সংখ্যা এক হাতের এক আঙুলে গোনা যায় (এবং আশ্চর্য, যে মহাজন আমাদের সঙ্গে ফরাসি সাহিত্যের ঘনিষ্ঠতম পরিচয় ঘটিয়ে দিলেন তিনি কখনও ফ্রান্সে যাননি তিনি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর)।
‘দেশ’ পত্রিকার এ সংখ্যা ফরাসিস সাহিত্য নিয়ে। অতএব সেই বিষয়বস্তুর ভিতরেই নিজেকে সীমাবদ্ধ করি।
ইংরেজি ভাষা গম্ভীর এবং জটিল কিন্তু তার প্রসাদগুণও আছে। ফরাসি চটুল ও রঙিন। অতিশয় গম্ভীর বিষয় আলোচনা করার সময়ও ফরাসি কেমন যেন একটুখানি তরল থেকে যায়। পক্ষান্তরে রসিকতা করার সময়ও ইংরেজি তার দার্চ সম্পূর্ণ বর্জন করতে পারে না। চার্লস ল্যাম, এমনকি জেরম্ কে জেরম্ পর্যন্ত যে ভাষা ব্যবহার করেছেন সেটা ধ্রুপদ। উড়হাউসে এসে আমরা সর্বপ্রথম চটুলতা পাই।
কিন্তু এই বাহ্য। ফরাসি ভাষার সর্বপ্রধান গুণ তার স্বচ্ছতা, তার সরলতা। ফরাসিরা নিজেই বলেন, ‘যে বস্তু স্বচ্ছ (ক্ল্যার, ক্লিয়ার) নয় সে জিনিস ফরাসি নয়।’ আমাদের দেশে আজকাল যে দুর্বোধ্য অবোধ্য পদ্য বেরোয় সে ‘মাল’ প্রথম যখন ফ্রান্সে বেরুতে আরম্ভ করল তখন গুণী আনাতোল ফ্ৰাস বলেছিলেন, ‘সে মধুর ললিত বয়সে মানুষ অবোধ জিনিস ভালোবাসে আমার সে বয়স পেরিয়ে গিয়েছে; আমি আলো ভালোবাসি।’ তাই আরেক গুণী শেষ কথা বলেছেন, ‘স্বচ্ছতা, স্বচ্ছতা পুনরপি স্বচ্ছতা।’
ফরাসি চটুলতা হয়তো অনেকেই অপছন্দ করতে পারেন কিন্তু ফরাসি স্বচ্ছতা বাঙলা ভাষা এবং সাহিত্যে যদি আসত তবে আর কিছু না হোক, আমাদের মনন-সাহিত্য যে অনেকখানি লোকপ্রিয় হত সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। শ্ৰীযুত সুধীন্দ্রনাথ দত্ত যদি আরও একটুখানি ফরাসি আওতায় আসতেন তবেই ঠিক বোঝা যেত তাঁর দেবার মতো সত্যিই কিছু ছিল কি না। এ বিষয়ে বরঞ্চ বলব, শ্ৰীযুত অন্নদাশঙ্করের লেখা অনেকখানি ফরাসিস।
শব্দতত্ত্ব এবং ভাষাতাত্ত্বিকেরা ঠিক ঠিক বলতে পারবেন কিন্তু সাধারণ পাঠক হিসেবে আমার নিবেদন, বাঙলা ভাষার ওপর ফরাসি ভাষার (Language) প্রায় কোনও প্রভাবই পড়েনি। বাঙলাতে কটি ফরাসি শব্দ ঢুকেছে সেকথা প্রায় আঙুলে গুনেই বলা যায়। অবশ্য এইটেই শেষ যুক্তি নয়; আমরা বাঙলাতে প্রচুর আরবি এবং ফারসি শব্দ নিয়েছি বটে কিন্তু ওই দুই ভাষার প্রভাব আমাদের ওপরে প্রায় নেই। কিন্তু অন্য কোনও বাবদেও ফরাসি ভাষার প্রভাব বাঙলার ওপর আমি বড় একটা পাইনি।
সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। আমার ব্যক্তিগত দৃঢ়বিশ্বাস ইনি ফরাসি সাহিত্যের যতখানি চর্চা করেছেন ততখানি চর্চা বাঙলা দেশে তো কেউ করেনইনি, অল্প ইংরেজ জর্মন ইতালীয়ই– অর্থাৎ অফরাসিস–করেছে। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাট্য, কবিতা, ভ্রমণ-কাহিনী, কত বিচিত্র বস্তুই তিনি ফরাসি থেকে অনুবাদ করে বাংলায় প্রচার করেছেন। এই যে ইংরেজি এবং ফরাসি পাশাপাশি জাতের ভাষা– সেই ইংরেজিতেই পিয়ের লোতির লেখা ‘ভারত ভ্রমণ’ অনুবাদ করতে গিয়ে ইংরেজ অনুবাদক হিমশিম খেয়ে গিয়েছেন অথচ জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অনুবাদে মূল ফরাসি যে ঠিক ঠিক ধরা পড়েছে তাই নয়, প্রাচ্যদেশীয় আবহাওয়াও সম্পূর্ণ বজায় রয়েছে।
