তা সে যাই হোক লোকমুখে ইরানের রাজা সে খুশখবর শুনে বে-এক্তেয়ার। তড়িঘড়ি লোকলশূকরসহ উজির-ই আলাকে পাঠিয়ে দিলেন খোজাকে পরম যত্নসহকারে রাজদরবারে নিয়ে আসতে। খোজা আসামাত্র তখৃত্-ই-সুলেমান ত্যাগ করে বাদশা তাঁকে আলিঙ্গন করে পাশে বসালেন। মাথায় সোনার তাজ পরিয়ে দিলেন, গায়ে কাশ্মিরি শাল জড়িয়ে দিলেন, কোমরবন্ধে দমশকি তলওয়ার ঝুলিয়ে দিলেন। চতুর্দিকে জয়জয়কার।
সভাভঙ্গের পর বাদশা নিভতে ইতি-উতি করে, আশ-কথা পাশ-কথা কাড়ার পর অতি সন্তর্পণে তাঁর জাগিরের প্রতি ইঙ্গিত করলেন। খোজা করজোড়ে ‘সে কী শাহ ইন-শাহ, আপনার যে পূত পবিত্র… ইত্যাদি(৩) বলে তিনি নিবেদন করলেন, রাজসম্মানই তাঁর পক্ষে যথেষ্ট।
বাদশাহ বিস্তর চাপাচাপি করার পর খোজা বললেন,’ হুজুরের যখন নিতান্তই এ হেন বাসনা তবে হুকুম জারি করে দিন কাল সকাল থেকে যারা বউকে ডরায় তারা আমাকে একটি করে ডিম প্রতি সকালে দেবে।’
দিন দুনিয়ার মালিক বাদশা তো তাজ্জব। ‘ওতে আপনার কী হবে? আমি খবর পেয়েছি, আপনি দান-খয়রাতে দাতাকর্ণ।’
খোজা এলবুর্জ পাহাড়ের মতো অচল অটল। তবে তাই সই। ইরানি ভাষায় বলতে গেলে আলোচনার কার্পেট তখন রোল করে গুটিয়ে ঘরের কোণে খাড়া করে রেখে দেওয়া হল।
পরদিন ফজরের নমাজের সময় থেকেই হৈ-হৈ-রৈরৈ। এস্তেক রাজবাড়িতেও মমলেট-অমলেট নেই। কী ব্যাপার? যাদের বাড়িতে মুরগি নেই তারা ফজরের আজানের পূর্বে ছুটেছে বাজারপানে। ডিম কিনে ধাওয়া করেছে খোজার ডেরার দিকে।
সেখানে ডাঁই ডাঁই হুদো হুদো আণ্ডার ছয়লাপ! আণ্ডার নবীন ব্রহ্মাণ্ড।
পাইকিরি ব্যবসায়ীরা চতুর্দিকে বসে!
সাতদিন যেতে-না-যেতে খোজা ঢাউস তেতলা হাওয়া-মঞ্জিল হাঁকালেন। পক্ষাধিককাল মধ্যেই বোখারার কার্পেট, সমরকন্দের রেশমি তাকিয়া, মুরাদাবাদি আতরদান, গোলাপ-পাশ, বিদরি আলবোলা, রাজস্থানের গোলাপি মার্বেলের ফোয়ারা, সরণ-দীপের (স্বর্ণদ্বীপ সিংহল) হাতির দাঁতের চামর, ব্যজনী!
বাদশা তো আজব তাজ্জব মানলেন।
কুলোকে বলে, দু একজন অমিতবীর্য সাহসী শের-দিল রুস্তম নাকি ডিম নিয়ে যায়নি। দেখে তাদের (অথবা তার স্ত্রী নাকি শুধিয়েছিল, ‘ও! তুমি বুঝি আমাকে ডরাও না?’ তার পর আর দেখতে হয়নি!
ইরানের বাদশা খুশিতে তুর্কির খাস খলিফাকে ছাড়িয়ে গেছেন।
এমন সময় রাজার মস্তকে বজ্রাঘাত। খোজা তিন-মাসের ছুটি চান দেশ থেকে বউ-বাচ্চা নিয়ে আসবেন বলে। খোজা মারাত্মক একদারনিষ্ঠ। রাজা আর কী করেন, অতি অনিচ্ছায় ছুটি দিলেন, অবশ্য, তিন মাস রিট্রেঞ্চ করে দু মাসের তরে। যাবার সময় বললেন ‘দোস্ত! দেরি করবেন না, আপনার বিরহে আমার’- বাদশার গলা জড়িয়ে এল। ততদিনে তাঁদের সম্পর্ক আর রাজা-প্রজায় নয়–দোস্তিতে এসে দাঁড়িয়েছে।
দু মাসের কয়েকদিন পূর্বেই খোজা রাজসভায় পুনরায় উপস্থিত। রাজা পরমানন্দে রাজোচিত ভাষায় শুধালেন, ‘তবে কি পুণ্যশ্লোকা বেগম-সাহেবা স্ব-ভবনে অবতীর্ণ হয়েছেন?’
খোজা বললেন, ‘হ্যাঁ, হুজুর! তবে কি না, ভবনটি তার উপর অবতীর্ণ হলেই হত আরও ভালো।’
তদ্দণ্ডেই সভাভঙ্গের হুকুম হল। বাদশা নিয়ে গেলেন খোজাকে অন্দরমহলে।
‘শতেক বছর পরে বঁধুয়া আসিল ঘরে–’
বাদশার তখন ওই হাল। দোস্তের সঙ্গে নিভৃতে দুঁহু দুঁহু হয়ে কুহু কুহু করবেন।
দু পাত্র শিরাজি খেয়ে বাদশা খোজার কাছে ঘেঁষে বললেন, ‘দোস্ত! রাজ্যের আর সকলের সঙ্গে আমার রাজা-প্রজার সম্বন্ধ। তারা আমার কাছ থেকে চায়; আমি তাদের দিই। কিন্তু আপনি আমার দোস্ত আপনার সঙ্গে দোস্তির সম্পর্ক। দোস্ত যখন দেশে ফেরে তখন দোস্তের জন্য– ’ বাদশা গলা সাফ করে বললেন, ‘এই, ইয়ে, মানে, কোনওকিছু একটা সওগাত আনে। আপনি তো আনেননি।’
বলে বাদশা খ্যাঁক খ্যাঁক করে বিশ্রী রকমের হাসতে লাগলেন।
না-হক বেইজ্জত হলে মানুষ যেরকম বেদনাতুর কণ্ঠে ককিয়ে ওঠে, খোজা সেইরকম বললেন, ‘জাঁহাপনা কুল্লে দুনিয়ার ইমান-ইনসাফের মালিক, এ সংসারে আল্লা-তালার ছায়া (জিল্লুল্লা) আমার ওপর অবিচার করবেন না। এনেছি, আলবৎ এনেছি। দেশে পৌঁছে সক্কলের পয়লা হুজুরেরই সওগাত সংগ্রহ করেছি। আজ সঙ্গে আনিনি। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করতে হয়। কাল সন্ধ্যায় নিয়ে আসব।’
একেই বলে দোস্ত!
উগ্রীব হয়ে রাজা শুধালেন, ‘কী? কী? আমার যে তর সইছে না। আহ্, জীবনে এই প্রথম কিছু-একটা পেলুম।’
খোজা বললেন, ‘নিজের আনা সওগাতের প্রশংসা করতে বাধছে, কিন্তু সত্যি হুজুর অপূর্ব, অতুলনীয়। একটি অপরূপ সুন্দরী তুর্কি তরুণী আপনার জন্য এনেছি হুজুর।’(৪)
ঝঙ্কারের জন্য ফারসিটা শুনুন :
‘অগর আন্ তুর্ক-ই শিরাজি
বদস্ত আরদ দিল-ই মারা
ব-খাল-ই হিন্দো ওণ বখ শম্
সমরকন্দ ওয়া বুখারারা।’ (৫)
কথিত আছে এ দোঁহা লিখে হাফিজকে তিমুর লেনের সামনে বিপদে পড়তে হয়েছিল। সেটা বারান্তরে হবে।
তার পর খোজা উচ্ছ্বসিত হয়ে সেই তরুণীর রূপবর্ণনা আরম্ভ করলেন, একেবারে আমাদের বিদ্যাপতি স্টাইলে, নখ থেকে শির পর্যন্ত– যাকে বলে নখশির বর্ণন। ‘ওহো হো হো,–একটি তন্বঙ্গী চিনার গাছ হেন! কী দোলন, কী চলন!’
বাদশা বললেন, ‘আস্তে।’
কিন্তু খোজাকে তখন পায় কে, তিনি মৌজে। গলা চড়িয়ে বললেন, ‘চিকুর কেশ তো নয়, যেন অমা-যামিনীর স্বপ্নজাল– আর্দ্র, স্নিগ্ধ, মৃগনাভি সম।’
