উৎসাহের তোড়ে খোজা তখন উঠে দাঁড়িয়েছেন। যেন রাজকবি দরবারের সবাইকে শুনিয়ে কবিতা পাঠ করছেন।
বাদশা ব্যাকুল হয়ে খোজার জোব্বা টেনে কাতরকণ্ঠে বললেন, ‘চুপ, চুপ, আস্তে আস্তে– পাশের ঘরে বেগম-সায়েবা রয়েছেন।’
ঝুপ করে বসে পড়ে খোজা বিনয় কণ্ঠে বললেন, ‘হুজুর, কাল সকাল থেকে একটি করে আণ্ডা পাঠিয়ে দেবেন। আমার পাওনা।’
এইখানেই খোজা-কাহিনী শেষ করলে ঠিক হত। কিন্তু তা হলে তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে। তিনি পরলোকগমনের পূর্বে যে শেষ রসিকতাটি করে গিয়েছেন, সেটি বাদ পড়ে যায়। কারণ সেটি আজও প্রথমদিনের মতো তাজা, অতিশয় নব ফারসিতে যাকে বলে ‘তাজা ব-তাজা, নৌ-ব-নৌ’, দ্বিতীয়ত, আণ্ডার গল্পটি আমি শুনেছি আমার সর্বকনিষ্ঠা ভগিনী লুৎফুন্নিসার কাছ থেকে। আমার মতো তার পায়েও চক্কর আছে। সে শুনেছে লাহোর না পেশাওয়ার কোথায় যেন। এর থেকে এটাও বোঝা যায়, খোজার গল্প মুখে-মুখে কতখানি ছড়িয়ে পড়েছে। এখন বাঙলা দেশেও পৌঁছল। সপ্তদশ অশ্বারোহী গাঁজা; দশ বাদ দিয়ে সপ্ত শতাব্দীতেই হয়।
এবারে শেষ গল্প। এটাতে আপনি-আমি সবাই আছি।
যেমন মনে করুন, দৈবযোগে আপনি পৌঁছেছেন আশেহিরে, স্বভাবতই আপনার মনে বাসনা, দিলে ইরাদা জাগবে খোজার গোরস্তান দেখবার জন্য। একাই বেরিয়ে পড়ুন; কিচ্ছুটি ভাবনা নেই, সবাই রাস্তা চেনে।
সেখানে গিয়ে দেখবেন, সামনে এক বিরাট দেউড়ি– প্রবেশদ্বার। কোথায় লাগে তার কাছে ফতেহ-পুর-সিক্রিতে আকবর বাদশার বুলন্দ-দরওয়াজ। একেবারে শিশু। তা না-হয় হল, কিন্তু অবাক হবেন দেখে যে বন্ধ-দরজায় এক বিরাট তিন মণ ওজনের তালা!
গোরস্তানে আছেই-বা কী, যাবেই-বা কী? এই ভারতবর্ষেই লুটতরাজের ফলে যা-কিছু ইমারত বেঁচে আছে, সেগুলো হয় কবর নয় মসজিদ– ওসবে লুটের কিছু নেই বলে। তিনমণি তালা দিয়ে খোজার দেহরক্ষা–অন্যার্থে– করা হচ্ছে, মিশরি মমির মতো? কিন্তু ইসলামে তো হেন ব্যবস্থা নেই।
নাচার হয়ে তালাটা বন্ধ দোরে বারকয়েক ঠুকলেন, এদিক-ওদিক গলা বাড়িয়ে চেল্লাচেল্লি করলেন।
তখন দরাজ-দেউড়ির একপাশ দিয়ে পাঁচিল ডিঙিয়ে বেরিয়ে এল পাহারাওলা। আপনাকে সবিনয় নিবেদন করবে, ‘কী হবে ওই বিরাট তালা খুলে। ওটা কখনও খোলা হয়নি। চলুন পাঁচিল ডিঙিয়ে যাই।’
মানে?
একশ ফুট উঁচু দেউড়ি– চতুর্দিকের পঁচিল উঁচুতে এক ফুট হয় কি-না হয়।
মানে?
খোজার আখেরি-শেষ মশকরা। উইলে এইভাবে তৈরি করবার আদেশ দিয়ে গিয়েছিলেন।
বলতে চেয়েছিলেন, ‘এ জীবনে আমরা সামনের দিকটা আগলাতেই ব্যস্ত। ইতোমধ্যে আর সবদিক দিয়ে যে বেবাক কিছু চলে যায়, তার খবর রাখিনে।’
***
আমি আকশেহির যাইনি। কাজেই হলফ খেয়ে বলতে পারব না, খোজার দর্গা এই পদ্ধতিতে নির্মিত কি না। যদি না হয় তবে বুঝব খোজা আরও মোক্ষম রসিক। বিন-খর্চায় আমাদের এখনও হাসাচ্ছেন আর বোকা বানাচ্ছেন।
————
১. VOLCANIC ERUPTION AFTER FIVE CENTURIES
Istambul July 22–Mount Soutlubiyan, in the Kars Province of Turkey has burst into what is believed to be Turkey’s first volcanic eruption since the 15th century. A spokesman at the office of the Governor of Kars said the erup tion of rock and smoke had caused anxiety and excitement among people liv ing nearby, but there had been no serious damage yet.
২. সুপ্রভাত’ পত্রিকার সম্পাদিকা শ্রীমতী কুমুদিনী মিত্রকে (ইনি ‘সঞ্জীবনী’ সম্পাদক শ্রীঅরবিন্দের মেসোমশাই কৃষ্ণকুমার মিত্রের বড় মেয়ে) শিরাজী একটি কবিতা ও ছবি পাঠালে পর তিনি (কুমুদিনী) লেখেন, ‘আপনার কবিতা ও ছবি পাইয়া আমি পরম পুলকিত হইয়াছি। আপনার কবিতাটি “সুপ্রভাতে” প্রকাশিত হইবে। তুরস্কের নারীদিগের অতীত ও বর্তমান অবস্থা, স্বদেশের কার্যে ও উন্নতিতে তাহাদের সাহায্যদান, তাহাদের শিক্ষা ও স্বদেশপ্রেম প্রভৃতি সম্বন্ধে লেখা শীঘ্রই অনুগ্রহ করিয়া পাঠাইবেন। ভারতবর্ষ হইতে যে সকল যুবক আহতদিগের সেবার জন্য তথায় গমন করিয়াছেন, তাহাদের কার্যের বিবরণ লিখিবেন।’
বাঙলা একাডেমী পত্রিকা, প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, পৃ. ৫৭।
৩, ইরানে বাদশার সামনে কোন মন্ত্র দিয়ে নিবেদন আরম্ভ করতে হয়, তার পুরো বিবরণের জন্য ‘দেশে-বিদেশে’ অধ্যায় পশ্য।
৪. ইরানে তুর্কি রমণীর বড়ই কদর।
‘হে তরুণী, হে তুরস্কী, হে সুন্দরী সাকি
এমনি হৃদয় মুগ্ধ করিয়াছ তুমি,
তব কপোলর ওই কৃষ্ণ তিল লাগি
বোখারা সমরকন্দ দিতে পারি আমি।
অনুবাদটি ভালো নয়। কিন্তু হাফিজের এই কবিতাটি এতই বিখ্যাত যে, তার একাধিক ইংরেজি অনুবাদ আছে–
‘If that unkindly Shirazi Turk
would take my heart in her hand
I’d give Bukhara for the mole upon
her cheek, and Samarkand.’
কিংবা
‘Sweet maid, if thou wouldst charm my sight;
And bid these arms thy neck infold;
That rosy cheek, thy lily hand
Would give thy poet more delight
Than all Bokharas vaunted gold.
Than all the gems of Samarkhand.
৫. সত্যেন দত্তের অনুবাদ আছে।
পুষ্পধনু
রস কী?
অর্থাৎ যখন কোনও উত্তম ছবি দেখি, কিংবা রসের সঙ্গীত শুনি অথবা ভালো কবিতা পড়ি, কিংবা নটরাজের মূর্তি দেখি, তখন যে রসানুভূতি হয় সে রস কী, সৃষ্ট হয় কী প্রকারে?
