স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে তাঁর নামে প্রচলিত গল্পের কটি তাঁর নিজস্ব ও কটি উদোর শিরনি বুধোর দর্গায় সে বিচার অসম্ভব। দেশ-বিদেশের পণ্ডিতগণ হার মেনে বিক্রমাদিত্যের নামে প্রচলিত গল্প যে ‘বিক্রমাদিত্য সাইকল’, খৈয়ামের নামে চলিত-অচলিত চতুষ্পদী ‘খৈয়াম চক্র’ নামে অভিহিত করেছেন, ঠিক সেইরকম এখন খোজার নামে লিখিত, পঠিত, শ্ৰত গল্পকে ‘খোজা চক্র’ নাম দিয়ে দায়মুক্ত হয়। কিন্তু গল্পগুলো বিশ্লেষণ করে সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে তার অনেকগুলোই আরবভূমি প্রাচীন ইরান ও ভারতবর্ষ থেকে গিয়েছে। সিরিয়াক এবং প্রাচীন বন্ধানেও এর অনেকগুলো প্রচলিত ছিল। অবশ্য এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে সেসব বাদ দিলেও খোজার তহবিলে প্রচুর হাস্যরসের উপাদান উদ্বৃত্ত থেকে যায়। এবং তার চেয়েও বড় কথা– সুখে-দুঃখে, উৎসবে-ব্যসনে, মসজিদে-সরাইয়ে, বাজারে-বৈঠকখানায় খোজা যেভাবে তাঁর গল্পে, আচরণে, ইঙ্গিতের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করেছেন তারই একটি অতি সুস্পষ্ট হাস্যময়, সদানন্দ, দরদী ছবি তুর্কিদের বুকের ভিতর আঁকা। আজ যদি বেহশত থেকে ফিরিশতা (দেবদূত) ইস্তাম্বুলে নেমে বিশ্বজনের কাছে সপ্রমাণ করে যান যে ইমাম নসরুদ্দিন খোজা নামক কোনও ব্যক্তি এ ধরায় জন্মগ্রহণ করেননি তবুও তুর্কির লোক অচঞ্চল চিত্তে সেই তসবিরই ধারণ করবে, বিদেশির সঙ্গে পরিচয় হওয়ার কয়েক লহমার ভিতরেই খোজার সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেবে এবং যদি সেখানে একাধিক তুর্ক উপস্থিত থাকে, এবং আপনি যে খোজাকে চেনেন না সেকথা বুঝতে পারে তবে আপসে পাল্লা লেগে যাবে কে কত বেশি খোজার গল্প বলতে পারে। এদেশে যেমন বিস্তর রবীন্দ্রভক্ত আছেন যাঁরা প্রত্যেক ঋতু-পরিবর্তন এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির রূপরসগন্ধস্পর্শ বিবর্তন রবীন্দ্রনাথের কোনও না কোনও গান, বা একাধিক গান দিয়ে প্রকাশ করতে পারেন, ঠিক তেমনি জীবনের সুখ-দুঃখ, বিপদ-আপদ, দুর্ঘটনা, লটারি লাভ– সবকিছুই খোজার কোনও না কোনও গল্প দিয়ে রসরূপে প্রকাশ করা যায়। কারণ খোজা শুধু এলোপাতাড়ি রসসৃষ্টি করে যাননি তার মারফতে খোজার পরিপূর্ণ জীবনদর্শন বা ‘ভেল্টআনশাউঙ’ পাওয়া যায়।
খোজার গল্প তিন রকমের। সহজেই অনুমান করা যায়, তিনি যেখানে চালাকি করে অন্যকে বোকা বানাচ্ছেন, কিংবা মারাত্মক উত্তর দিয়ে প্রতিপক্ষকে নিরস্ত্র করেছেন তার সংখ্যাই বেশি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এন্তের গল্প আছে যেখানে তিনি একটি পয়লা নম্বরের ইডিয়েট, গাড়লস্য কুত্ত্বমিনার। এবং তৃতীয় শ্রেণি থেকে বোঝা যায় না, তিনি বোকা না আমরা বোকা।
যেমন মনে করেন, খোজাকে অমাবস্যার রাতে শুধানো হল পূর্ণিমার চাঁদ গেল কোথায়? খোজা একগাল হেসে উত্তর দিলেন, ‘তা-ও জানো না, পূর্ণিমার চাঁদকে প্রতি রাত্রে ফালি ফালি করে কেটে নেওয়ার পর এখন সেগুলো গুঁড়ো করে আকাশের তারা করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’
খোজা বোকা বনতে চান, না বানাতে চান?
অবশ্য খোজার গীতিরস বা লিরিকরস অসাধারণ ছিল। এই কবিতৃময় ব্যাখ্যাটি দিয়ে তিনি যে গীতির সৃষ্টি করতে চাননি, বা যেসব কবি অসম্ভব অসম্ভব তুলনা দিয়ে কাব্যরস সৃষ্টি করতে চান তাদের নিয়ে মশকরা করতে চাননি একথা বলা কঠিন। কারণ আমাদের অলঙ্কারশাস্ত্রেও আছে–
‘প্রিয়ে, আকাশে চন্দ্রের মুখ দেখে
মনে হল তোমার মুখ,
তাই আমি চাঁদের পিছনে পিছনে ছুটছি।’
এ ধরনের তুলনাকে ‘অসম্ভব তুলনা’ বলে আলঙ্কারিক দণ্ডিন কাব্যাদর্শে নিন্দা করেছেন। একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায় যে এতে হাস্যরসের অবতারণা হওয়া বিচিত্র নয়। কথা নেই, বার্তা নেই, একটা লোক যদি চাঁদের পানে একদৃষ্টে তাকিয়ে তাকিয়ে হঠাৎ খোয়াই-ভাঙা মাঠ-ময়দান ভেঙে ছুটতে আরম্ভ করে আর বলতে থাকে ‘ওই আমার প্রিয়া, ওই আমার প্রিয়া’, তা হলে পাড়ার ডন জোয়ানদেরও হেসে ওঠা অসম্ভব নয়।
তবু না-হয় মেনে নেওয়া গেল, চাঁদকে গুঁড়ো করে খোজা ইচ্ছা করেই বোকা বনেছেন। কিন্তু এখন যেটা বলছি সেটাতে খোজা কী?
দোস্তের বাড়ির দাওয়াতে খোজা খেলেন এক নতুন ধরনের মিশরি কাবাব। অতি সযত্নে একটুকরো কাগজে লিখে নিলেন তার রেসিপি কিংবা পাকপ্রণালি কিংবা যাই বলুন। ততোধিক সযত্নে, ব-তরিবৎ সেটি রাখলেন জোব্বার ভিতরে গালাবিয়ার বুকপকেটে। রাস্তায় বেরিয়েই গেলেন তার প্যারা কসাইয়ের দোকানে। আজ সন্ধ্যায়ই গিন্নিকে শিখিয়ে দেবেন কী করে এই অমূল্যনিধি রাঁধতে হয়। আর খাবেনও পেট ভরে। বন্ধুর বাড়িতে মেকদারটা একটু কম পড়েছিল। গোশত কিনে খোজা রাস্তায় নামলেন।
হঠাৎ চিল এসে ছোঁ মেরে মাংস নিয়ে হাওয়া।
খোজা চিলের পিছনে ছুটতে ছুটতে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে চিলকে বলতে লাগলেন, ‘আরে কোরছ কী? শুধু মাংসটা নিয়ে তোমার হবে কী? রেসিপিটা যে পকেটে রয়ে গেছে। কী উৎপাত! দাঁড়াও না।’
কিন্তু এভাবে গল্পের পর গল্প বলতে থাকলে খোজার সম্পূর্ণ গ্রন্থ নকল করে দিতে হয়। সম্পাদক আপত্তি জানাবেন।
এবারে তা হলে যে ধরনের গল্পের জন্য খোজা সুপ্রসিদ্ধ তারই একটি নিবেদন করি।
কথিত আছে, একদা খোজা জন্মভূমি তুর্কির প্রতি বিরক্ত হয়ে দেশত্যাগ করে ইরান দেশে চলে যান। এতে আশ্চর্য হবার মতো কিছুই নেই। কারণ খোজা ছিলেন কাণ্ডজ্ঞানহীন পরোপকারী–আমাদের বিদ্যাসাগরের মতো দাগা খাওয়া বিচিত্র নয়।
