ইংরেজি বর্ণমালার কল্যাণে ‘খোজা’ কিন্তু বাঙলায় ‘হোকা’রূপে আত্মপ্রকাশ করেছেন। অধুনা তুর্কি ভাষা ইংরেজি (লাতিন) হরফে লেখা হয় বলে তার রূপ hoca; কিন্তু তুর্করা ‘এচ’ অক্ষরের নিচে একটি অর্ধচন্দ্র বা উল্টো প্রথম বন্ধনী দেয় এবং তার উচ্চারণ অনেকটা স্কচ ‘লখ’, জর্মন ‘বাখ’ বা ফারসি ‘খবরে’র মতো কিন্তু ‘হ’ ভাগটা বেশি এবং ‘সি’ অক্ষরের উপরে হুক দেয়– এবং তার উচ্চারণ হয় পরিষ্কার ‘জ’। ঠিক সেইরকম বাংলা শব্দ (আসলে আরবি) ‘খারিজ’ তুর্কি ভাষায় haic লেখা হয়, অবশ্য ‘হ’-এর নিচে পূর্বোল্লিখিত অর্ধচন্দ্র এবং ‘সি’-র উপরে হুক দেয়। ‘পররাষ্ট্রনীতি’ তাই তুর্কিতে ‘সিয়াসত খারিজ’।
রয়টারের টেলিগ্রামে এই অর্ধচন্দ্র ও হুক বাদ পড়াতে ‘খোজা’ হোকা হয়ে গিয়েছেন। খাজা নাজিমুদ্দিনের ‘খাজা’ ও আগা খানের ‘খোজা (সম্মানিত) সম্প্রদায়ের নামও একই শব্দ– এটি আমাদের সম্পূর্ণ অজানা নয়।
এই ধ্বনি পরিবর্তনে আমাদের রাগত হওয়ার কারণ নেই। ক্রিকেটার মাঁকড়ের নাম যখন আমরা হামেশাই ‘মনকদ’, ‘মানকদ’ অনেক কিছুই লিখে থাকি, এবং ফড়কর-কে ‘ফাদকর’ ‘ফদকর’ লিখি, এমনকি এই কলকাতা শহরেই গোখলে-কে ‘গোখেল’ লিখি এবং উচ্চারণ করি, তখন রসিকবর খোজা যে হোকা হয়ে আমাদের ধোঁকা দেবেন তাতে আর আশ্চর্য কী?
খোজার জন্মদিন যে-বাইশ তারিখে উদযাপিত হচ্ছিল সেইদিনই ইস্তাম্বুল থেকে রয়টার আরেকটি তার পাঠিয়েছেন; তাতে খবর এসেছে যে ওইদিন পাঁচ শ বছর পরে তুর্কিতে এক সুপ্ত অগ্নিগিরি জেগে উঠে হা-হা করে হেসে উঠেছে।(১)
তা হলে বোঝা গেল মা ধরণীর পাকা দু শো বছর লেগেছে খোজার রসিকতার মর্ম গ্রহণ করতে; তাই বোধহয় হাসতে হাসতে তার নাড়িভুড়ি এখন ভূগর্ভ থেকে ছিঁড়ে বেরিয়েছে!
.
এদেশে আরবি এবং ফারসি চর্চা একদা প্রচুর হয়েছিল। আকবর বাদশাহের আমলে ইরানের এমনই দুরবস্থা যে সেখানকার পনেরোআনা কবি দিল্লি ধাওয়া করেছিলেন। আকবরের সভাকবি আব্দুর রহিম খানাখানা নিজেই গা গণ্ডা ইরানি কবি পুষেছিলেন, আর স্বয়ং আকবর যে কবি ‘আমি’ ‘তুমি’ মিল দিয়ে ‘কবিতা’ রচনা করত তাকে পর্যন্ত নিরাশ করতে চাইতেন না।
ভারতবর্ষের ফারসি নাম হিন্দ বা হিন্দুস্তান। ‘হিন্দ’ শব্দের অর্থ কালো। তাই এক কবি তার দৈন্যের কালরাত্রি ইরানে ফেলে পূর্বাচল ভারতবর্ষ রওয়ানা হওয়ার সময় লিখলেন,
দুর্ভাবনার কালিমা ত্যজিয়া
চলিনু হিন্দুস্তান
কালোর দেশেতে কালো আমি কেন
করিতে যাইব দান?
তাই এক ইয়োরোপীয় ঐতিহাসিক ইরানের ওই যুগকে শব্দার্থে ‘ইন্ডিয়ান সামার’ বলেছেন। কারণ এরপরই ইরানি সাহিত্যের পতন আরম্ভ হয়।
তুর্কি ভাষার কিছুটা চর্চাও এদেশে হয়েছিল, কারণ বাবুর, হুমায়ুন এঁদের সকলেরই মাতৃভাষা তুর্কি। শেষ মোগল বাদশা-সালামৎ বাহাদুর শাহের হারেমেও কথাবার্তা তুর্কি ভাষাতেই হতো এবং তুর্কিসাহিত্যের সর্বোকৃষ্ট না হলেও অন্যতম অত্যুকৃষ্ট কেতাব বাবুর বাদশার আত্মজীবনী। কিন্তু এ তুর্কি ভাষা মুস্তাফা-কামালের টার্কির ওসমানলি তুর্কি নয়, বাবুরের ভাষা চুগতাই (বা জগতাই) তুর্কি। কোরমা, দোলমা এবং লড়াই-হাতিয়ারের মতো কিছু শব্দ চুগতাই তুর্কি থেকে বাঙলাতে এসেছে। ওদিকে মোগল দরবার ফারসিকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন বলে তাঁদের তুর্কি এদেশে প্রচার ও প্রসার লাভ করেনি। যদিও প্রাচীন বাঙলাতে ‘তুর্ক’ বলতে মুসলমান বোঝাত এবং তামিল ভাষাতে মুসলমান বোঝাতে হলে এখনও ‘তুরস্কম’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। বাঙালি বেকার এখনও চাকরির সন্ধানে ‘তুর্কি নাচন’ নাচে।
আমরা ইংরেজি-ফরাসি পড়ি, রাশান কথাসাহিত্যও আমাদের অজানা নয়, স্পেন পর্তুগাল দেনমার্কের লোক এদেশে এসেছিল এবং আরও অনেকেই– কিন্তু আশ্চর্য ওসমানলি তুর্কি ভাষা এবং সাহিত্যের সঙ্গে আমাদের কণামাত্র পরিচয় নেই। আমার জানামতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পূর্বে পাবনা জেলার কবি ইসমাঈল হোসেন শিরাজী নজরুল ইসলাম এর কাছে একাধিক বিষয়ে ঋণী বলে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন) তুর্কিকে সাহায্য করার জন্য একটি মেডিকেল মিশন নিয়ে সে দেশে গিয়েছিলেন এবং তুর্কি রাজনীতি, সমাজ, আচার-ব্যবহার সম্বন্ধে বাঙলায় একাধিক প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তুর্কির সভাকবি হামিদ পাশার সঙ্গে সে সময়ে তাঁর হৃদ্যতা হয়, কিন্তু তুর্কিসাহিত্যের সঙ্গে বাঙলার পরিচয় করিয়ে দেবার পূর্বেই ইংরেজের চাপে তাকে দেশে ফিরে আসতে হয়।(২)
তুর্কির বাইরে ইরান, আফগানিস্থান, উজবেক, আজারবাইজান, তথা গ্রিস, বুলগারিয়া, রুমানিয়া ইত্যাদি দেশে নসরুদ্দিন খোজা সুপরিচিত। ইরানের স্বর্ণযুগের একাধিক সুরসিক কবির ওপর তার প্রভাব সুস্পষ্ট। বন্ধানের বাইরে ইয়োরোপে তিনি জর্মনিতে সবচেয়ে বেশি ভক্ত পাঠক পেয়েছেন। ইংরেজি এনসাইক্লোপিডিয়াতে তাঁর নাম নেই, জর্মন সাইক্লোপিডিয়া আকারে ইংরেজির অর্ধেক হওয়া সত্ত্বেও সেটাতে তাঁর সম্বন্ধে কয়েক ছত্র আছে। আর একাধিক অনুবাদ জর্মন ভাষাতে তো আছেই। অবশ্য আজকের দিনের রুচি দিয়ে বিচার করলে তাঁর বহু জিনিস শুধু কুট্টনীরসাশ্রিত লাতিনেই অনুবাদ করা যায়!
খোজার জীবনী নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করার উপায় নেই। কারণ তাঁর জীবন ও তাঁর হরেক রকমের রসিকতা এমনই জড়িয়ে গিয়েছে যে তার জট ছাড়ানো অসম্ভব। তাঁর সম্বন্ধে প্রচলিত দু আনা পরিমাণ কিংবদন্তি বিশ্বাস করলে আমাদের কালিদাস সম্বন্ধে প্রচলিত সবকটাই বিশ্বাস করতে হয়। এমনকি তিনি পাঁচ শ না সাত শ বছর আগে জন্মেছিলেন সেই সমস্যারই চূড়ান্ত সমাধান এযাবৎ হয়নি। তবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে খোর্তো গ্রামে তাঁর জন্ম সম্ভবত ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এবং আকশেহিরে তাঁর মকবরহ বা সমাধিসৌধ দেখানো হয়। ইনি যে সুপণ্ডিত এবং সুকবি ছিলেন সে-বিষয়েও কোনও সন্দেহ নেই, কারণ ধর্মশাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি না থাকলে ‘ইমাম’ (ইংরেজিতে অন্ততপক্ষে বিশপ) হওয়া যায় না। অন্যান্য একাধিক ব্যাপারেও তিনি সমাজের অগ্রণীরূপে তুর্কি এবং তুর্কির বাইরে সুপরিচিত ছিলেন।
