প্রথম মাটিতে গড়া হয়ে গেছে শেষ মানুষের কায়
শেষ নবান্ন হবে যে ধান্যে তারো বীজ আছে তায়।
সৃষ্টি সেই আদিম প্রভাতে লিখে রেখে গেছে তাই,
বিচার-কর্ত্রী প্রলয় রাত্রি পাঠ যা করিবে ভাই।
(সত্যেন দত্ত)
পৃথ্বী হতে দিলাম পাড়ি, নভঃগেহে মনটা লীন–
সপ্ত-ঋষি যেথায় বসি ঘুমিয়ে কাটান রাত্রি দিন।
বিদ্যাটা মোর উঠলো ফেঁপে কাটলো কত ধাঁধার ঘোর–
মৃত্যুটা আর ভাগ্যলিখন ওইখানে গোল রইল মোর।
(কান্তি ঘোষ)
কিন্তু এস্থলে আমি ওমর-কাব্যের মল্লিনাথ হবার দুরাশা নিয়ে পাঠকের সম্মুখে উপস্থিত হইনি। ওমরের নামে প্রচলিত প্রায় ছ শটি রুবাইয়াৎ ইরানি বটতলাতেও পাওয়া যায়– পার্টিশনের পূর্বে কলকাতায় ফারসি বটতলা তালতলা অঞ্চলেও পাওয়া যেত। তার অতি অল্পই অনুবাদ করেছেন ফিটসজেরাল্ড এবং সেই ছ শর কটি কবিতা ওমরের নিজস্ব, তাই নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা এখনও শেষ হয়নি আমার বিশ্বাস কখনও হবে না। সেই ছ শ চতুস্পদীর টীকা পড়ার উৎসাহ ও ধৈর্য রসিকজনের থাকার কথা নয়– পণ্ডিতের থাকতে পারে। আমি রসিকের সেবা করি।
আমিও ওমরের সামান্যতম ঐতিহাসিক পটভূমি নির্মাণ করার চেষ্টা করছি এবং তা-ও শুধু ওমরের বিদ্রোহী মনোভাব দেখাবার জন্য– কারণ ওইখানেই নজরুল ইসলামের সঙ্গে তিনি সখ্যসূত্রে আবদ্ধ হয়েছেন।
ওমরের প্রধান বিদ্রোহ ধর্মগুরুদের বিরুদ্ধে :
খা’জা! তোমার দরবারে মোর একটি শুধু আর্জি এই
থামাও উপদেশের ঘটা, মুক্তি আমার এই পথেই।
দৃষ্টি-দোষে দেখছ বাঁকা আমার সোজা সরল পথ,
আমায় ছেড়ে ভালো করো, ঝাপসা তোমার চক্ষুকেই।
(কাজী সাহেবের অনুবাদ)।
O master! grant us only this, we prithee!
Preach not! But mutely guide to bliss,
we pritheel
‘We walk not straight- Nay,
it is thou who squintest!
Go, heal thy sight, and leave us in peace,
we prithee!
(কার্নের অনুবাদ)
পৌরাণিক এবং ঐতিহাসিক রাজা-রাজড়ার শৌর্যবীর্য নিয়ে যেসব কবি ফিরদৌসির ন্যায় আস্ফালন করে বর্তমানের আনন্দকে অবহেলা করতেন তাঁদের সম্বন্ধে বলছেন–
ভাগ্য-লিপি মিথ্যা সে নয়– ফুরোয় যা তা ফুরিয়ে যাক,
কৈকোবাদ আর কৈখসরুর ইতিহাসের নামটা থাক।
রুস্তম আর হাতেম-তায়ের কল্পকথা– স্মৃতির ফাঁস
সে-সব খেয়াল ঘুচিয়ে দিয়ে আজকে এসো আমার পাশ।
(কান্তি ঘোষ)
দরবেশ-সুফিরা করতেন কৃচ্ছ্রসাধন এবং যোগচর্চা। পূর্বেই নিবেদন করেছি, তাঁরা নৃত্যের সঙ্গে চিৎকার করতেন নাম-জপ, তাঁদের বিশ্বাস, ওই করেই ভগবদপ্রেম এবং চরম মোক্ষ পাওয়া যায়।
দ্রাক্ষালতার শিকড় সেটি তার না জানি কতই গুণ–
জড়িয়ে আছেন অস্থিতে মোর দরবেশি সাঁই যাই বলুন–
গগনভেদী চিৎকারে তাঁর খুলবে নাকো মুক্তিদ্বার,
অস্থিতে এই মিলবে যে খোঁজ সেই দুয়ারের কুঞ্চিকার।
(কান্তি ঘোষ)
কিন্তু সবচেয়ে বেশি চতুষ্পদী তিনি রচনা করেছেন দার্শনিক এবং পণ্ডিতদের বিরুদ্ধে। সেখানে তিনি জ্যোতির্বিদ ওমরকেও বাদ দেননি।
অস্তি-নাস্তি শেষ করেছি, দার্শনিকের গভীর জ্ঞান
বীজগণিতের সূত্র-রেখা যৌবনে মোর ছিলই ধ্যান;
বিদ্যারসে যতই ডুবি, মনটা জানে মনে (মানে?) স্থির–
দ্রাক্ষারসের জ্ঞানটা ছাড়া রসজ্ঞানে নেই গভীর।
অর্থহীন, অর্থহীন, সমস্তই অর্থহীন। তাই ওমরের বারবার কাতর রোদন, দরদী ফরিয়াদ–
হেথায় আমার আসাতে প্রভু হননি তো লাভবান
চলে যাবো যবে হবেন না তিনি কোনওমতে গরীয়ান।
এ কর্ণে আমি শুনিনি তো কভু কোনও মানবের কাছে
এই আসা-যাওয়া কী এর অর্থ– খামকা পোড়েন টান।
(লেখক)
তাই ওমরের শেষ মীমাংসা– একবার মরে যাবার পর তুমি আর এখানে ফিরে আসবে না। অতএব যতটুকু পারো, যতক্ষণ পারো দর্শন-বিজ্ঞান-সাঁই-সুফিদের ভুলে গিয়ে সাকি সুরা নিয়ে নির্জন কোণে আনন্দ করো।
মৃত্যু আসিয়া মস্তকে মোর আঘাত করার আগে
লে আও শরাব– লাও ঝটপট রাঙানো গোলাপি রাগে।
হায়রে মূর্খ! সোনা দিয়ে মাজা তোর কী শরীরখানা–?
গোর হয়ে গেলে ফের খুঁড়ে নেবে–? ছাই কী কাজে লাগে।
(লেখক)
কিন্তু একটা জিনিস ভুল করলে চলবে না। ওমর খাঁটি চার্বাকপন্থী এবং ওই জাতীয় লোকায়তীদের মতো নন। ‘ঋণ করে ঘি খাও, কারণ দেহ ভস্মীভূত হলে ঋণ তো আর শোধ করতে হবে না’, অর্থাৎ ইহসংসারে কিংবা পরলোকে অন্য কারও প্রতি তোমার কোনও নৈতিক দায়িত্ব– মরাল রেসপনসিবিলিটি নেই– এ তত্ত্বেও ওমর বিশ্বাস করতেন না। তাই তার একমাত্র উপদেশ–
কারুর প্রাণে দুখ দিও না, করো বরং হাজার পাপ,
পরের মনে শান্তি নাশি বাড়িও না আর মনস্তাপ।
অমর-আশি লাভের আশা রয় যদি, হে বন্ধু মোর,
আপনি সয়ে ব্যথা, মুছো পরের বুকের ব্যথার ছাপ।
(নজরুল ইসলাম)
গুণীরা বলেন, ‘কুরানই কুরানের সর্বশ্রেষ্ঠ টীকা’। তরুণদের আমি প্রায়ই বলি, ‘রবীন্দ্রনাথের রচনাই তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ টীকা– ওই কাব্যই বারবার অধ্যয়ন করো, অন্য টীকার প্রয়োজন নেই।’ ওমরই ওমরের সর্বশ্রেষ্ঠ মল্লিনাথ এবং কাজীর অনুবাদ সকল অনুবাদের কাজী।
নসরুদ্দিন খোজা (হোকা)
ইস্তাম্বুল থেকে রয়টারের খবরে প্রকাশ, রসিক এবং মূর্খচুড়ামণি নসূরুদ্দিন খোজার সপ্তশত জন্মদিবস মহা-আড়ম্বরে উদ্যাপিত হয়েছে।
