তবে তিনি যে উত্তম গুরুর কাছে শিক্ষালাভ করেছিলেন সে বিষয়ে পণ্ডিতগণ একমত। স্মরণ রাখা ভালো যে, ছাপাখানার প্রচলন না হওয়া পর্যন্ত অল্প লোকই গুরুর সাহায্য বিনা উচ্চশিক্ষা লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন।
কথিত আছে, বিখ্যাত পণ্ডিত ইমাম মুওয়াফফকের কাছে একই সময়ে তিনজন অসাধারণ মেধাবী ছাত্র শিক্ষালাভ করেন। এদের ভিতর খেলাচ্ছলে চুক্তি হয় যে, এদের কোনও একজন পরবর্তী জীবনে প্রভাবশালী হতে পারলে তিনি অন্য দু জনকে সাহায্য করবেন। এঁদের একজন কালক্রমে প্রধানমন্ত্রী বা নিজাম-উল-মুল্ক-এর পদ প্রাপ্ত হন। খবর পেয়ে দ্বিতীয় বন্ধু হাসন বিন্ সববাহ তাঁর কাছে এসে তাঁর পূর্বপ্রতিজ্ঞা স্মরণ করিয়ে দিয়ে উচ্চ রাজকর্ম চান। বন্ধুর কৃপায় আশাতীত উচ্চপদ পেয়েও হাসন তাঁকে সরিয়ে নিজে প্রধানমন্ত্রী হবার জন্য ষড়যন্ত্র করতে লাগলেন। কিন্তু শেষটায় ধরা পড়ে বাদশার হুকুমেই রাজপ্রাসাদ থেকে বহিষ্কৃত হন। হাসন প্রতিশোধ নেবার জন্য এক গুপ্ত প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে গোপন আততায়ী দিয়ে অনেক লোককে হত্যা করিয়ে প্রচুর অর্থ ও প্রতিপত্তি অর্জন করেন। ক্রুসেডের একাধিক খ্রিস্টান নেতা এইসব গুপ্তঘাতকের হস্তে প্রাণ দেন। এরা ভাঙ জাতীয় একপ্রকার হশিশু সেবন করত বলে এদের নাম হয়েছিল ‘হশিশিয়য়ুন’ এবং ইংরেজি ‘অ্যাসাসিন’– গুপ্তঘাতক– এই শব্দ থেকেই অর্বাচীন লাতিন তথা ফরাসির মাধ্যমে এসেছে। অনেকে বলেন, পরবর্তীকালে নিজাম-উল-মুল্ক যে গুপ্তঘাতকের হস্তে প্রাণ দেন, সে-ও হাসন-সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এদের সম্বন্ধে লেখকের ‘অরিজিন অব দি খোজা’ পুস্তক লেখকের বাল্যরচনা বলে দ্রষ্টব্যের মধ্যে ধর্তব্য নয়।
ওমরকে যখন নিজাম-উল-মুল্ক উচ্চ পদ দিতে চাইলেন তখন তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে নির্জনে অনটনবিহীন জীবনযাপনের সুবিধাটুকু মাত্র চাইলেন এ তো জানা কথা। যে ব্যক্তি স্বর্গসুখ বলতে বোঝে,
সেই নিরালা পাতায় ঘেরা বনের ধারে শীতল ছায়,
খাদ্য কিছু, পেয়ালা হাতে, ছন্দ গেঁথে দিনটা যায়।
মৌন ভাঙ্গি মোর পাশেতে গুঞ্জে তব মঞ্জু সুর–
সেই তো সখী স্বপ্ন আমার, সেই বনানী স্বর্গপুর।
(কান্তি ঘোষ)
কিংবা
আমার সাথে আসবে যেথায়– দূর সে রেখে শহরগ্রাম
এক ধারেতে মরু তাহার, আর একদিকে শষ্প শ্যাম।
বাদশা-নফর নাইকো সেথা– রাজ্য-নীতির চিন্তা-ভার।
মামুদ শাহ?– দূরে থেকেই করব তাঁকে নমস্কার।
(কান্তি ঘোষ)
তার রাজপদ নিয়ে কী হবে? নিজাম-উল-মুল্ক বিচক্ষণ লোক ছিলেন, বুঝতে পারলেন, ওমরের খ্যাতি-প্রতিপত্তি প্রত্যাখ্যান মৌখিক বিনয় নয় এবং তার জন্য সচ্ছল জীবনযাত্রার ব্যবস্থা করে দিলেন। কবিও কখনও তাঁর মত পরিবর্তন করেননি। বস্তুত তাঁর কাব্যের মূল সুর ওইটিই।
কিছুদিনের মধ্যে তাঁর ডাক পড়ল রাজদরবারে পঞ্জিকা সংশোধন করে দেবার জন্য। ইরানিদের ‘নওরোজ’ বা নববর্ষ আসে বসন্তঋতুতে, কিন্তু বহুশত বৎসর লিপইয়ার গোনা হয়নি বলে তখন আর নববর্ষ বসন্তঋতুতে আসছিল না। ওমর ওই কর্মটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করে দিলেন।
ভাবতে আশ্চর্য লাগে, কবিরূপে যে ব্যক্তি বিশ্বজগতে বিখ্যাত তিনি আসলে ছিলেন বৈজ্ঞানিক। শুধু তাই নয়, ফিটসজেরাল্ডের মাধ্যমে ইয়োরোপে প্রচারিত হবার পূর্বেই ওমরের বিজ্ঞানচর্চা ফ্রান্সে অনূদিত হয়ে সেখানে তাঁর খ্যাতি সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল। বর্তমানে লেখক এসব লেখা দেখবার সুযোগ পায়নি, তাই এনসাইক্লোপিডিয়ার ‘কোনিক সেকশন’ অনুচ্ছেদ থেকে ইয়োরোপে ওমরের বৈজ্ঞানিক যশ সম্বন্ধে উদ্ধৃতি দিচ্ছি :
‘Greek mathematics culminated in Apollonius. Little further advance was possible without new methods and higher points of view. Much later, Arabs and other Muslims absorbed the classical science greedily; it was the Persian poet Omar Khayyam, one of the most prominent mediaeval mathematicians, with his remarkable classification and systematic study of equations, which he emphasized, who blazed the way to the modern union of analysis and geometry. In his “Algebra” he considered the cubic as soluble only by the intersection of conics, and the biquadratic not at all.’
শেষ ছত্রটির বাঙলায় অনুবাদ মূল ইংরেজি, এমনকি আধুনিক বাঙলা কবিতার চেয়েও শক্ত হয়ে যাবে বলে গোটা টুকরোটাই অতি অনিচ্ছায় ইংরেজিতেই রেখে দিতে বাধ্য হলুম। বৈজ্ঞানিক পাঠক বিনা-অনুবাদেই এটি বুঝতে পারবেন, প্রাঞ্জল অনুবাদেও আমাদের মতো বৈজ্ঞানিকের কোনও লাভ হবে না।
ইরানের অধিকাংশ গুণীই একমত যে, ওমর তাঁর জীবনের প্রায় সব সময়টুকুই কাটিয়েছেন বিজ্ঞানচর্চায় এবং অতি অল্প সামান্য সময় ‘নষ্ট’ করেছেন কাব্যলক্ষ্মীর আরাধনায়। তাই দীর্ঘ কবিতা লেখবার ফুরসত তাঁর হয়ে ওঠেনি– এমনকি রুবাঈগুলোও গীতিরস দিয়ে সরস করবার প্রয়োজন তিনি অনুভব করেননি।
গণিত এবং বিশেষ করে জ্যোতিষচর্চার ফল ওমরের কাব্যে পদে পদে পাওয়া যায়। বস্তুত গ্রহ-নক্ষত্র যে অলঙ্ প্রাকৃতিক নিয়মে চলে তার থেকেই তিনি দৃঢ় মীমাংসায় উপনীত হন যে, মানুষেরও কোনওপ্রকারের স্বাধীনতা নেই, তার কর্মপদ্ধতি স্বেচ্ছায় নিয়ন্ত্রণ করার কোনও অধিকারই সে পায়নি। তাই–
