আমাদের পদাবলীতেও তাই। এবং বিস্তর সব পদ আছে যাতে মর্ত্য আর অমর্ত্য প্রেম এমনভাবে মিশে গিয়েছে যে, দুটোকে আদৌ আলাদা করা যায় না– সমস্ত হৃদয়-মন এক অদ্ভুত অনির্বচনীয় নবরসে আপুত হয়ে যায়।
তোমার চরণে আমার পরানে
লাগিল প্রেমের ফাঁসি
সব সমর্পিয়া এক মন হৈয়া
নিশ্চয় হইলাম দাসী
মর্ত্যপ্রেমই যদি হবে তো ‘পরানে’ ‘পরানে’ প্রেমের ফাঁসি লাগবে। ‘পরানে’ আর ‘চরণে’ প্রেমের বাঁধ বেঁধে দিয়ে কী এক অপূর্ব অতুলনীয় ব্যঞ্জনার সৃষ্টি হয়েছে– যার অনুভূতি এ জগতে আরম্ভ, আর পরিপূর্ণতা লাভ করবে সেই অমর্ত্যলোকে, ‘ব্যর্থ নাহি হোক এ কামনা।’
কিন্তু মাঝে মাঝে মনে দ্বিধা জাগে, সর্বত্রই কি রূপকের শরণাপন্ন হতে হবে? যথা :
অদ্যাপ-শোক-নব-পল্লব-রক্ত হস্তাং
মুক্তাফল প্রলয়চুম্বিত-চুচুকাগ্ৰাম্।
অন্তঃস্মিতেন্দুসিত পাণ্ডুর গণ্ডদেশাং,
তাং বল্লভাং রহসি সংবলিতাং স্মরামি ॥
বিদ্যাপক্ষে
অশোক-পল্লব নব সম পাণিতলে।
কুচাগ্র শোভিত হয়েছে মুক্তা ফলে।
অন্তরে ঈষৎ হাস গণ্ডে বিকসিত।
শরতের চন্দ্র যেন ত্রিলোক-মোহিত ॥
নির্জনেতে বসি করি সদ্য সম্ভাবনা।
প্রাণাধিকা প্রেয়সীকে নিতান্ত কামনা ॥
তথাপি বিদ্যার নাহি পাই দরশন।
বিদ্যা তন্ত্র মন্ত্র করি ত্যজিব জীবন ॥
দ্বিতীয়ার্থ কালীপক্ষে
রুধির-খপর হস্তে দিবানিশি যার।
রক্তবর্ণ করতল হয়েছে শ্যামার।
উচ্চ পয়োধরপরি বান্ধিত কাঁচলী।
হীরক জড়িত হারে শোভে মুক্তাবলী ॥
অন্তরে গভীর হাস্য ঈষদ্ধাস্য কালে।
কিরণে আছয়ে গণ্ড পাণ্ডুবর্ণা ভালে ॥
অন্তর জগতে দেখি আলোক বিরাজে ॥
কি শোভা প্রকাশে কুলকুণ্ডলিনী মাঝে ॥
স্ববল্লভ-সংবলিতা বিশ্বের কারিণী।
নিদানে গর্জনে স্মরি তারে গো তারিণী।
(চৌরপঞ্চাশৎ, ভারতচন্দ্র, বসুমতী সংস্করণ, পৃ. ৮)
পূর্বোল্লিখিত এইসব তাবৎ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ওমরের বিদ্রোহ।
***
গিয়াসউদ্দিন আবুল ফৎহ, ওমর ইবন ইব্রাহিম অল-খৈয়াম ইরান দেশের নিশাপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মদিন কিংবা সন ঠিকমতো জানা যায়নি, এমনকি তাঁর মৃত্যুর সনও মোটামুটি ১১২৩ খ্রিস্টাব্দ বলে ধরে নেওয়া হয়েছে।
খৈয়াম শব্দের অর্থ তাম্বু-নির্মাতা। এ ওজনের শব্দ বাঙলায় আরও আছে। ‘কত্তাল’ থেকে বাঙলা কোতয়াল, এবং ‘খম্মার’ থেকে ‘খোঁয়ারি’ (ভাঙা) শব্দ এসেছে। রান্নার মশলা বিক্রেতা অর্থে বককাল শব্দও একদা বাঙলাতে সুপ্রচলিত ছিল– আরবিতে শব্দটির অর্থ ‘মুদি’ বা ‘মশলা-বিক্রেতা’। ত্রিবর্ণের মূল ধাতুতে– যথা ‘দ-খ-ল’ ‘দখল করা’ ‘ক-ত-ল’ ‘কোতল করা’ দ্বিতীয় ব্যঞ্জনবর্ণকে দ্বিত্ব করে তাতে দীর্ঘ ‘আ’-কার যোগ করলে যে কর্তাবাচক শব্দ উৎপন্ন হয় তার অর্থ “ওই কর্ম সে পুনঃপুনঃ করে থাকে।’ তাই ‘খম্মার’ অর্থ ‘যে ঘন ঘন মদ খায়’ (বাঙলায় তাই সে সকালবেলা খম্মারি বা খোঁয়ারি ভাঙে) অর্থাৎ ‘পাইকারি মাতাল’, মদ খাওয়া তার ব্যবসা’। ‘কতল করা যার ব্যবসা সে কোতোয়াল (‘কত্তাল’), ‘জল্লাদ’ও ওই অর্থে ব্যবহার হয়। ‘খয়য়াম’ অর্থ ‘যে পুনঃপুন তাম্বু নির্মাণ করে’– ‘তাম্বু নির্মাণকারী’। বাঙলায় ‘খইআম’, ‘খইয়াম’ বা ‘খৈয়াম’ লিখলে মোটামুটি মূল উচ্চারণ আসে। অবশ্য ‘খ’-র উচ্চারণ বাঙলা মহাপ্রাণ ‘খ’র মতো নয়– আমরা বিরক্ত হলে যেরকম ‘আখ’-এর ‘খ’ অক্ষরটি উচ্চারণ করে থাকি অর্থাৎ ঘৃষ্ট্য কণ্ঠ্যব্যঞ্জন। স্কচের ‘লখ’ ও জর্মনের ‘বাখ’-এর ‘খ’-এর মতো। আসামিতে ‘অহমিয়া’র ‘হ’ অনেকটা সেইরকম।
কিন্তু কবি ওমর তাঁবুর ব্যবসা করতেন না। ওটা তাঁর বংশের পদবি মাত্র। আজকের দিনের কোনও সরকার যে-রকম রাইটারজ বিল্ডিঙে চিফ সেক্রেটারি (সরকার) নন কিংবা কোনও ঘটকপদবিধারী যেরকম সমাজে কুলাচার্যের কর্ম করেন না। ওমর কিন্তু তাঁর পরিবারের এই উপাধিটি নিয়ে তিক্ত ব্যঙ্গ করতে ছাড়েননি–
জ্ঞান-বিজ্ঞান ন্যায়-দর্শন সেলাই করিয়া মেলা
খৈয়াম কত না তাম্বু গড়িল; এখন হয়েছে বেলা
নরককুণ্ডে জ্বলিবার তরে। বিধি-বিধানের কাঁচি
কেটেছে তাম্বু– ঠোককর খায়, পথ-প্রান্তের ঢেলা।
(লেখকের এমেচারি অক্ষম অনুবাদে রসিক পাঠক অপরাধ নেবেন না। অন্য কারও অনুবাদ না পেয়ে বাধ্য হয়ে মাঝে-মধ্যে এ ধরনের ‘অনুবাদ’ ব্যবহার করতে হয়েছে।)
এস্থলে উল্লেখ প্রয়োজন রুবাঈ জাতীয় শ্লোকে প্রায়শ প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ ছত্রে মিল থাকে– তৃতীয় ছত্রান্ত স্বাধীন। ইরানি আলঙ্কারিকরা বলেন, তৃতীয় ছত্রে মিল না দিলে চতুর্থ ছত্রের শেষ মিলে বেশি ঝোঁক পড়ে এবং শ্লোক সমাপ্তি তার পরিপূর্ণ গাম্ভীর্য ও তীক্ষ্ণতা পায়। কথাটা ঠিক, কারণ আমরাও তেতাল বাজাবার সময় তৃতীয়ে এসে খানিকটা কারচুপি করলে সম মনকে ধাক্কা দেয় আরও জোরে। পাঠককে এই বেলাই বলে রাখি, তৃতীয় ছত্রে মিলহীন এই জাতীয় শ্লোক পড়ার অভ্যাস করে রাখা ভালো। নইলে নজরুল ইসলামের ওমর-অনুবাদ পড়ে পাঠক পরিপূর্ণ রসগ্রহণ করতে পারবেন না। কারণ কাজী আগাগোড়া ক ক খ ক মিলে ওমরের অনুবাদ করেছেন। কান্তি ঘোষ করেছেন বাঙলা রীতিতে, অর্থাৎ ক ক খ খ।
ভাগ্যক্রমে ওমরের জীবনী সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না। পাকাপাকি শুধু এইটুকু বলা যেতে পারে যে তিনি গণিতশাস্ত্রে অসাধারণ পণ্ডিত ছিলেন এবং অবসর কাটাবার জন্য দৈবেসৈবে চতুষ্পদী লিখতেন… তাঁর নামে প্রচলিত গজল, মসনবি বা অন্য কোনও শ্রেণির দীর্ঘতর কবিতা আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এইটুকু সংবাদ ছাড়া বাদবাকি কিংবদন্তি। এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। যার জন্মের তারিখ কেন, সন পর্যন্ত জানা নেই, যাঁর পরলোকগমনের সন পর্যন্ত পণ্ডিতদের গবেষণাধীন, তাঁর সম্বন্ধে যে প্রচুর কিংবদন্তি প্রচলিত থাকবে তাতে বিস্মিত হবার কিছুই নেই।
